সম্পর্ক জোরদার করছে চীন-কাতার, কী বার্তা দিচ্ছে

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সম্পর্ক জোরদার করছে কাতার ও চীন। চলতি সপ্তাহে চীন সফর করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। দুই দিনের এই সফরকে দেশটির কর্মকর্তারা সম্পর্কের নতুন ‘সোনালি দশকে’ প্রবেশের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
একই ধরনের মন্তব্য এসেছে বেইজিং থেকেও। কাতারকে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে দেশটি। কাতারের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে জ্বালানি, বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ইরানে বিরুদ্ধে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতায় কাতারের চলমান প্রচেষ্টা।
সফর প্রসঙ্গে গত মঙ্গলবার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক ইব্রাহিম বিন সুলতান আল-হাশমি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘যুদ্ধ নেই, শান্তিও নেই, এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি এই অঞ্চল, এই অঞ্চলের দেশগুলো এবং জনগণের জন্য উপকারী নয়।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘চীনসহ অন্য অংশীদারদের নিয়ে কাজ করছে কাতার। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে এবং নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।’
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে সহায়তার জন্য দোহার সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং। নানা সংকটের মধ্যেও বেইজিংকে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকারের আশ্বাস দিয়েছে দোহা।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চীন ও কাতার উভয়ই পড়েছে ঝুঁকিতে। একদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার, অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারক চীন। হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দুই দেশেরই বড় ধরনের স্বার্থ রয়েছে।
ফলে দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্কের মূল ভিত্তি যে জ্বালানি খাত, সেটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে ১ কোটি ৯৪ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করা কাতার ছিল চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী। কাতারএনার্জি চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি কোম্পানি সিএনপিসি ও সিনোপেকের সঙ্গে ২৭ বছর মেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করেছে। এসব কোম্পানি কাতারের বিশাল নর্থ ফিল্ড গ্যাস সম্প্রসারণ প্রকল্পেও অংশীদার হয়েছে।
তবে অভিন্ন স্বার্থ থাকলে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশ দুটির পদ্ধতি আলাদা। যুদ্ধ বন্ধে কাতারের মধ্যস্থতার চেষ্টাকে বারবার সমর্থন জানিয়েছে চীন। তবে কাতারে ইরানের হামলা বা হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের বিষয়ে সমালোচনা থেকে বিরত থেকেছে বেইজিং। বরং এই সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকেই দায়ী করে আসছে চীন। দেশটির কর্মকর্তারা বলে আসছেন, এই সংঘাত ‘কখনোই হওয়া উচিত ছিল না’।
ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদারদের মধ্যে চীন অন্যতম। বহু বছর ধরে ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। দেশটি ইরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞারও বিরোধিতা করে আসছে।
অন্যদিকে কাতার নিজের ভূখণ্ড এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে তেহরানের হামলার প্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়েছে। সংকট সমাধানের বারবার ব্যর্থ হওয়ায় ক্রমেই হতাশ হয়ে উঠছে দোহা। তবুও সংলাপের সুযোগ তৈরি করে চলেছে তারা।
দোহার দৃষ্টিতে, এই সংঘাত বন্ধের প্রচেষ্টায় বেইজিং একটি প্রভাবশালী পক্ষ। তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বেশ শক্তিশালী তাদের। এমন একটি দেশকে পাশে পেতে চায় তেহরান।
বেইজিংয়ের কাছে এটা স্পষ্ট, কাতারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে চীনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি অবস্থিত কাতারেই। ৩ মার্চ এখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল ইরান। এর পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা সম্পর্কের আহ্বান জানায় দোহা।
এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের জায়গায় নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে বেইজিং নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় না বলে মনে করেন বেইজিংয়ের সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের গবেষক জুন আহমেদ খান।
তার ভাষ্য, ‘আমরা দেখছি, এমন এক সময়ে বেইজিং নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে, যখন এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ অতিরিক্ত বিকল্প খুঁজছে।’ তবে ইরানের ক্ষেত্রে বেইজিং তার নিজস্ব প্রভাব কতটা কাজে লাগাতে প্রস্তুত, সেটিই এখন প্রশ্ন।
কাতারের প্রধানমন্ত্রীর দুই দিনের এই সফর শুধু ইরানকে ঘিরেই ছিল না। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং প্রচলিত ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অর্থ খাতে আরও গভীর সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে আল থানি উচ্চপ্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন খাতকে গুরুত্ব দেন।
ইনভেস্ট কাতারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ৫২০টি চীনা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত এক দশকে চীনা বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোতে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে।
কাতার যখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে, তখন উপসাগরীয় কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প মিত্র খুঁজছে। আগস্টে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় দেশ সৌদি আরব। মক্কা চুক্তি নামে ওই চুক্তির লক্ষ্য, যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সকলের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।





