অভ্যর্থনা-আতিথেয়তা সবই লোকদেখানো, দিনশেষে শূন্য হাতে শি
- ইরানকে চীনের সহায়তা দেওয়া অগ্রহণযোগ্য: ট্রাম্প

হোয়াইট হাউজের রেড রুমে গতকাল চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও তার স্ত্রী পেং লিউয়ানের সঙ্গে চা চক্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প -রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রে তিন দিনের ঐতিহাসিক সফরে আছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এক দশক পর সেখানে পা রেখেই পেলেন রাজকীয় অভ্যর্থনা। লালগালিচা বিছিয়ে খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গিয়েছিলেন শিকে স্বাগত জানাতে। হোয়াইট হাউজে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে বক্তব্য দিয়েছেন বিশ্বরাজনীতির বড় এই দুই নেতা। একই দিনে জমকালো নৈশভোজ। অভ্যর্থনা-আতিথেয়তা দেখে ‘অন্তত এবার ভালো কিছু হবে। জট খুলবে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর’— এমন ধোঁয়াই উড়ছিল বিশেষজ্ঞ মহলের চায়ের টেবিলে! কিন্তু দিন শেষে সেই ‘শূন্য হাত’। উষ্ণ মতবিনিময় হলেও খুব একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে অগ্রগতির।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হোয়াইট হাউজের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে স্বায়ত্তশাসিত তাইওয়ান ইস্যুতে (যার ওপর বেইজিং নিজেদের দাবি জানিয়ে আসছে) ‘সঠিক অবস্থান’ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন শি। তবে উত্তরে কী বলেছেন ট্রাম্প, তা এখনো অজানা। দুই দেশের মধ্যকার মতপার্থক্য প্রকাশ্যে তুলে ধরার বিষয়ে কোনো আগ্রহই দেখাননি ট্রাম্প। চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড আলফ্রেড পার্ডু জুনিয়র অবশ্য জানিয়েছেন, বৈঠকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে শিকে কড়া বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। বলেছেন, ‘ইরানকে চীনের সহায়তা দেওয়া অগ্রহণযোগ্য।’
বিবিসি জানিয়েছে, হোয়াইট হাউজে বক্তব্যে ট্রাম্প ও শি দুজনই দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার করা নিয়ে দেখিয়েছেন আগ্রহ। তাদের আলোচনার অংশে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য, শুল্ক, ইরান ও তাইওয়ান। শি জোর দিয়ে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অবশ্যই রাখতে হবে ‘মানুষের নিয়ন্ত্রণে’। ট্রাম্প উভয় দেশের জন্য ব্যক্ত করেছেন ‘সম্প্রীতি, শান্তি ও সাফল্যময়’ এক ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। তবে রয়টার্সের গতকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য বিরতির মেয়াদ দুই মাস বাড়ানোই শির সফরের সবচেয়ে দৃশ্যমান ফলাফল বলে মনে হয়েছে। আগে এই মেয়াদ মূলত শেষ হওয়ার কথা ছিল নভেম্বরে। তবে কূটনৈতিক সৌজন্যমূলক আচরণের মধ্যেও রয়ে গেছে উত্তেজনা। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে।
তাইওয়ান ও ইরান ইস্যু: তাইওয়ান ইস্যুতে শি আবারও স্পষ্ট করেছেন, তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি চীনের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা অলঙ্ঘনীয় সীমা। বিবিসির গতকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মে মাসে শি ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন, এই বিষয়টি সঠিকভাবে সামলানো না হলে দুই দেশের মধ্যে বেধে যেতে পারে ‘সংঘাত বা সরাসরি সংঘর্ষ’।
এরপর ট্রাম্প স্থগিত রাখেন তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজের অনুমোদন। বেইজিংয়ের সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষেত্রে এটিকে তিনি একটি ‘অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনাকালে শি সম্ভবত সেই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন সীমিত রাখলে সংঘাতের ঝুঁকি কমবে। গত বৃহস্পতিবার শি আবারও আশা প্রকাশ করেছেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার ‘সঠিক অবস্থান’ মেনে চলবে বলে। তবে চীনের প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্যে এখনো কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া জানাননি ট্রাম্প।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে চীন হয়তো ইরানকে সহায়তাও করেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনজন ব্যক্তি এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমটির গতকালের প্রতিবেদন সাত মাস ধরে চলা এই সংঘাতের শুরুর দিকে স্টিলথ বিমান শনাক্ত করার সুবিধার্থে চীন হয়তো ইরানকে প্রদান করেছিল রাডার-সংক্রান্ত সক্ষমতা। এমনটাই জানিয়েছেন ওই ব্যক্তিদের একজন এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন মার্কিন কর্মকর্তা। ইরানকে চীনের সহায়তা দেওয়া অগ্রহণযোগ্য— শিকে এমনটাই বলেছেন ট্রাম্প। চীনে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডু গতকাল সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, হোয়াইট হাউজে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের প্রতি চীনের সহায়তা প্রদান অগ্রহণযোগ্য।
নৈশভোজে ছিলেন ইলন, স্যাম: শির জন্য আয়োজিত ট্রাম্পের নৈশভোজে উপস্থিত অন্যদের মধ্যে ছিলেন হোয়াইট হাউজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, চিফ অব স্টাফ মনিকা ক্রাউলি এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন দেশটির বড় ব্যবসায়ীরা।
ট্রাম্প ও শির সঙ্গে একই টেবিলে বসেছিলেন অ্যাপলের টিম কুক ও এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং। সেই একই টেবিলে ছিলেন ইলন মাস্কও, যিনি এর আগে ট্রাম্পের প্রশাসনে সরকারি আকার ছোট করার উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন ওপেনএআইর স্যাম অল্টম্যান, গুগলের সুন্দর পিচাই এবং অ্যামাজনের জেফ বেজোস। সেই সঙ্গে ছিলেন মার্ক জাকারবার্গ এবং জেফ ইয়াস, তিনি ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটকের আংশিক মালিক।



