চাকরি কেড়ে নেওয়া থেকে ফেক কনটেন্ট তৈরি— আরও যা যা করছে এআই

এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে ব্যবহারকারীরা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় তাল মেলাতে পারছে কি না, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। ছবি : রয়টার্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন কাজের অংশ। লেখা তৈরি থেকে শুরু করে ছবি বানানো, কোড লেখা ও জটিল বিশ্লেষণ–অনেক কাজই মুহূর্তে করে দিচ্ছে এই প্রযুক্তি। এতে তৈরি হয়েছে কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ার সম্ভাবনা। একই সঙ্গে চাকরি কেড়ে নেওয়া, ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া এবং বিপুল বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।
এআইয়ের এই দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে ব্যবহারকারীরা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় তাল মেলাতে পারছে কি না, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। তাই এআইয়ের সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিগুলো নিয়েও বাড়ছে আলোচনা।
উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, সহজ করে কাজ
এআইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো দ্রুত কাজ শেষ করার সক্ষমতা। শিক্ষা, লেখা ও সম্পাদনা, তথ্য সংগ্রহ এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে ব্যবহার হচ্ছে এআই।
যুক্তরাজ্য সরকারের প্রকাশিত ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এআই সেফটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিভিন্ন কাজে এআই ব্যবহার করছেন প্রায় ১০০ কোটি মানুষ।
এআইয়ের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রমাণও মিলেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসের এক গবেষণায় দেখা যায়, জেনারেটিভ এআই ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে ১০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত। সময় সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়তে পারে প্রায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ।
কোডিং, পরামর্শ সংক্রান্ত কাজ ও পেশাদার লেখালেখিতে এ সুবিধা দেখা গেছে বিশেষভাবে। ভারতের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান উইপ্রো জানিয়েছে, এআই ব্যবহারে তৈরি হয়েছে ২০ হাজার কর্মীর সমপরিমাণ কাজের সক্ষমতা। ফলে এসব কর্মীকে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে অন্য কাজে।
নতুন কাজ ও দক্ষতার সুযোগ তৈরি করছে
এআই কিছু চাকরি বিলুপ্ত বা পরিবর্তন করলেও সুযোগ তৈরি করছে নতুন ধরনের কাজের। এআইয়ের প্রভাবে চাহিদা বাড়ছে মেশিন লার্নিং প্রোগ্রামিং ও চ্যাটবট তৈরির মতো দক্ষতার।
সফটওয়্যার নির্মাতারাও এআই ব্যবহার করে তৈরি করছেন কোড। পরে তারা সেই কোড করছেন পরীক্ষা ও সংশোধন। ফলে কর্মীদের প্রচলিত পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি অর্জন করতে হচ্ছে এআই ব্যবহারের দক্ষতাও।
উইপ্রোর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা সন্ধ্যা অরুণ জানান, প্রতিষ্ঠানটি এক লাখের বেশি কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে উন্নত এআই দক্ষতার। প্রতিষ্ঠানটি এ পরিবর্তনকে হিউম্যান-এআই অপারেটিং মডেল হিসেবে দেখছে।
চাকরির জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে
এআই দিয়ে অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা সম্ভব। এতে বাড়ছে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক এআই সেফটি রিপোর্ট বলছে, উন্নত দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং উদীয়মান দেশের ৪০ শতাংশ চাকরি এআইয়ের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে এ ঝুঁকি নির্ভর করবে কর্মক্ষেত্রে এআই কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
এআইয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে কিছু বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ছাঁটাইও করেছে কর্মী। চলতি বছরের শুরুতে অ্যামাজন তিন মাসের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় ছাঁটাই করে ১৬ হাজার কর্মী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম পিন্টারেস্টও ঘোষণা দেয় ৭৮০টি পদ কমানোর। এআইয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে সম্পদ পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে নেওয়া হয় এসব সিদ্ধান্ত।
তরুণ ও নতুন চাকরিপ্রার্থীদের নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। প্রতিবেদনের প্রধান লেখক স্টিফেন ক্লেয়ার বলেছেন, এআইয়ের প্রভাবে যেসব পেশায় বেশি পরিবর্তন আসছে, সেসব ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে উঠতে পারে নতুন কর্মীদের চাকরি পাওয়া।
অপব্যবহার করে ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি করা যায়
জেনারেটিভ এআই তৈরি করতে পারে তথ্যের ভিত্তিতে লেখা, কণ্ঠ, ছবি ও ভিডিও। এই সক্ষমতার অপব্যবহারও সম্ভব। এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেক ব্যবহার করে প্রতারণা করা হচ্ছে মানুষের সঙ্গে। সাইবার হামলাতেও ব্যবহার করা হচ্ছে এআই।
ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে নকল করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের পরিচয়।
এই সুযোগে অপরাধীরা কৃত্রিম কণ্ঠ ও ভিডিও ব্যবহার করে মানুষকে বাধ্য করতে পারে সংবেদনশীল তথ্য দিতে। এর মাধ্যমে ঘটানো সম্ভব কম্পিউটার সিস্টেমে প্রবেশ বা অর্থ স্থানান্তরের মতো অপরাধও।
বিপুল বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদ প্রয়োজন
এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজন বড় বড় ডেটা সেন্টার। এসব কেন্দ্রে থাকে শক্তিশালী কম্পিউটার চিপ। সেগুলো চালাতে বিপুল বিদ্যুৎ এবং ঠান্ডা রাখতে লাগে প্রচুর পানি।
ডেটা সেন্টারের সংখ্যা বাড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। বড় এআই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সরকারগুলো দিতে পারবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যে প্রস্তাবিত একটি ডেটা সেন্টার চালাতে প্রয়োজন হবে পুরো রাজ্যের ব্যবহারের চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, পানি ব্যবহার নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এলাকায় খরা পরিস্থিতির মধ্যে ডেটা সেন্টারের সার্ভার ঠান্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করছেন পরিবেশবাদীরা।
ডেটা সেন্টারের শব্দ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। মার্চে গ্যালাপের এক জরিপে দেখা যায়, ৭১ শতাংশ আমেরিকান বিরোধিতা করেছেন নিজেদের এলাকায় এআই ডেটা সেন্টার স্থাপনের।
এই উদ্বেগ শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়। কেনিয়াতেও মাইক্রোসফট ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জি৪২-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টার নিয়ে চলছে আলোচনা।
কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটোও এর বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তার সতর্কতা, এত বড় অবকাঠামো চালাতে প্রয়োজন হবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের।
এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি যেমন মানুষের কাজ সহজ করছে, তেমনি তৈরি করছে নতুন ঝুঁকিও। উৎপাদনশীলতা ও নতুন দক্ষতার সুযোগের বিপরীতে চাকরি হারানো, প্রতারণা, সাইবার হামলা এবং পরিবেশের ওপর চাপ নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন।
এ কারণেই এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়েও জরুরি হয়ে উঠেছে আলোচনা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই এআইয়ের উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এআইয়ের অগ্রগতি থামবে না। তবে এই সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে হবে এআইকে আরও নিরাপদ করার।
সূত্র : আলজাজিরা












