সি ঈগল
ডানা মেলে উড়েছিল, তারপর খোঁজ নেই

সংগৃহীত ছবি
আকাশ ছিল তার ঠিকানা। বিশাল ডানা মেলে কখনো ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূল, কখনো স্কটল্যান্ডের জলাভূমি, মাইলের পর মাইল উড়ে বেড়াত সে। বয়স মাত্র এক বছর। কিন্তু এরই মধ্যে হয়ে উঠেছিল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মসূচির এক আশার প্রতীক। সেই সি ঈগলই এখন রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। কারণ এক রাতে হঠাৎ করেই তার সব খোঁজ হারিয়ে গেছে।
এটি কোনো সাধারণ পাখি নয়। সাদা-লেজি সি ঈগল। যাকে অনেকেই ‘আকাশের দৈত্য’ বলে ডাকেন। প্রায় আড়াই মিটার ডানার বিস্তার নিয়ে এটি যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় শিকারি পাখি। একসময় ব্রিটেনের আকাশে এদের অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু মানুষের শিকার আর নিপীড়নের কারণে ইংল্যান্ড থেকে প্রায় ২৪০ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যায় এই প্রজাতি। বহু বছরের প্রচেষ্টার পর সংরক্ষণবাদীরা আবারও তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। নিখোঁজ এই ঈগল ছিল সেই স্বপ্নেরই একটি অংশ।
গত বছরের আগস্টে ইংল্যান্ডের ডরসেটে জন্ম নেয় পাখিটি। জন্মের কিছুদিন পরই তার পিঠে বসানো হয় একটি স্যাটেলাইট ট্যাগ। ছোট একটি ব্যাকপ্যাকের মতো দেখতে যন্ত্রটি প্রতি কয়েক মিনিট পরপর পাখিটির অবস্থান ও শারীরিক তথ্য গবেষকদের কাছে পাঠাত। ফলে সে কোথায় যাচ্ছে, কোথায় রাত কাটাচ্ছে কিংবা কত দূর উড়ছে সবকিছুই নজরে রাখা সম্ভব হতো।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ভ্রমণও বাড়তে থাকে। শীতকালে তাকে দেখা গেছে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে। পরে সে উড়ে যায় স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিনশায়ারের লখ অব স্ট্রাথবেগ এলাকায়। শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আবার ফিরে আসে দক্ষিণে। তারপর এপ্রিলের শেষ দিকে শুরু হয় আরেকটি দীর্ঘ যাত্রা। সেই যাত্রা তাকে নিয়ে যায় নর্থ ইয়র্ক মুরসের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও নির্জন অঞ্চলে। সেখানেই যেন গল্পের মোড় ঘুরে যায়।
২০২৫ সালের ১ মে রাত ১টা ২০ মিনিট। স্যাটেলাইট ট্যাগ থেকে শেষবারের মতো সংকেত পাওয়া যায়। তখন ঈগলটি জীবিত ছিল এবং একটি নিরিবিলি স্থানে বিশ্রাম নিচ্ছিল। তারপর হঠাৎ সবকিছু থেমে যায়। আর কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি। যেন রাতের অন্ধকারে বিশাল ডানার সেই পাখিটি পৃথিবী থেকেই মুছে গেছে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সংরক্ষণকর্মীরা। পরে তদন্তে নামে পুলিশ এবং জাতীয় বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। ঈগলটির সর্বশেষ অবস্থান চিহ্নিত করে সেখানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো মৃতদেহ, পালক কিংবা স্যাটেলাইট ট্যাগের অংশও পাওয়া যায়নি। যেন কোনো চিহ্ন না রেখেই অদৃশ্য হয়ে গেছে পাখিটি।
ঘটনাটি আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে কারণ নর্থ ইয়র্কশায়ার দীর্ঘদিন ধরেই শিকারি পাখি নিধনের জন্য কুখ্যাত। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে শিকারি পাখি নির্যাতন ও হত্যার উল্লেখযোগ্য অংশ এই অঞ্চলে ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে গুলি, বিষপ্রয়োগ কিংবা ফাঁদের ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে সংরক্ষণবাদীদের একাংশের সন্দেহ, সি ঈগলটিও হয়তো কোনো অপরাধের শিকার হয়েছে।
তবে এখনো কোনো প্রমাণ মেলেনি। শিকারি ও গেমকিপারদের সংগঠন বলছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তাদের মতে, স্যাটেলাইট ট্যাগ বিকল হয়ে যেতে পারে, আবার পাখিটি স্বাভাবিক কারণেও মারা যেতে পারে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন। প্রযুক্তির নজরদারিতে থাকা, যার প্রতিটি উড়ানের খবর জানা ছিল, সেই ঈগলটি হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল? আকাশের সেই স্বাধীন পথিক কি কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, নাকি মানুষের নিষ্ঠুরতার? তদন্ত চলছে। উত্তর খুঁজছেন পুলিশ, সংরক্ষণকর্মী ও পাখিপ্রেমীরা। কিন্তু আপাতত রহস্যই হয়ে আছে সি ঈগলটির ভাগ্য। আকাশে ডানা মেলে উড়েছিল সে, তারপর আর কোনো খোঁজ নেই।
ভাষান্তর: মনির হোসেন রনি






