ইরান যুদ্ধের মাশুল গুনছে যুক্তরাষ্ট্র
- মার্কিনিদের কাঁধে বাড়তি ৬০ বিলিয়ন ডলারের বোঝা
- হরমুজে জাহাজ চলাচলে কঠোর হুঁশিয়ারি ইরানের

ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসরায়েল-মার্কিন যুদ্ধের মাশুল গুনছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট খাতে প্রতিটি মার্কিন পরিবারকে ব্যয় করতে হয়েছে গড়ে অতিরিক্ত ৪৪৭ দশমিক ১৯ ডলার। সব মিলিয়ে ৬০ বিলিয়ন ডলার খরচের বোঝা মার্কিনিদের কাঁধে। ২৮ মে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মুডিজ অ্যানালিটিকসের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন তথ্য। সিএনবিসি।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেট্রলের দাম বৃদ্ধি ও বিমান ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কারণে গত তিন মাসে মার্কিন ভোক্তাদের সম্মিলিতভাবে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৬০ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এ আর্থিক চাপ বাড়তে পারে আরও। মুডিজের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জ্যান্ডির ভাষ্য, ‘যদি শিগগিরই যুদ্ধ শেষ না হয়, তাহলে আর্থিক চাপে থাকা ভোক্তাদের ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না, যা দুর্বল অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।’
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জ্বালানির দাম বর্তমান পর্যায়ে অপরিবর্তিত থাকলে যুদ্ধের প্রথম বার্ষিকী নাগাদ প্রতিটি পরিবারকে গড়ে অতিরিক্ত প্রায় দুই হাজার ডলার ব্যয় করতে হতে পারে। এ সংখ্যাগুলো তুলে ধরেছে সংঘাতের ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রভাব, যা জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রের অনেক বাইরে পর্যন্ত ভোক্তাদের ব্যয় দিয়েছে বাড়িয়ে।
হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনর্ব্যক্ত করে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজগুলোর উদ্দেশ্যে আবারও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর (খাতাম আল-আম্বিয়া) শনিবার জারি করেছে এ নির্দেশনা।
শনিবার আলজাজিরা জানায়, ইরানি গণমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সদর দপ্তরটি বলেছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ কর্তৃত্বের অধীনে। তাই সব বাণিজ্যিক জাহাজ, তেলবাহী ট্যাংকার এবং অন্যান্য নৌযানকে নির্ধারিত রুট অনুসরণ করে চলাচল করতে হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যাত্রার আগে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর অনুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক। নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলেও করা হয়েছে সতর্ক। এসব বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করলে তার ফল হতে পারে ভয়াবহ। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি এলাকায় অবস্থানরত বিদেশি সামরিক বাহিনীগুলোকেও সতর্ক করেছে তেহরান। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সামুদ্রিক চলাচল বা প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা হলে দেওয়া হবে তার উপযুক্ত জবাব।
টাকা দিয়ে হরমুজ পার হয়েছে কাতারের জাহাজ: মাশুল দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে কাতারের কিছু জাহাজ। এসব জাহাজের বেশিরভাগই কাতার থেকে তেল ও গ্যাস নিয়ে পূর্ব এশিয়া (মূলত ভারত ও চীন) বা ইউরোপের দিকে যাত্রা করে। কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাতে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ইসরায়েল হাইয়োম’ জানিয়েছে এ খবর।
গত এক সপ্তাহে এসব জাহাজ পার হয়েছে হরমুজ প্রণালি। এর মধ্যে কিছু ট্যাংকারের পাহারায় ছিল খোদ মার্কিন নৌবাহিনী। ইরান ও তাদের বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) অনুমতিও নিয়েছে এগুলো।
এদিকে শুক্রবার হোয়াইট হাউজের সিচুয়েশন রুমে অনুষ্ঠিত বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের হওয়া চুক্তিতে বেশ কিছু সংশোধন চেয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন এমন তথ্য। তাদের ভাষ্য, ট্রাম্প দ্রুত এ চুক্তি চূড়ান্ত করতে আগ্রহী। তবে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু বিষয়, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক উপকরণের বিষয়সংক্রান্ত ধারাগুলো আরও জোরালো করতে তিনি আগ্রহী। ট্রাম্পের এ সংশোধনের অনুরোধের ফলে দুপক্ষের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরুর গুঞ্জন পাওয়া গেছে।
১২০০ কোটি ডলার ফেরতের কথা প্রস্তাবিত চুক্তিতে রয়েছে: ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি শনিবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে অবরুদ্ধ ১ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদ মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে অন্তর্ভুক্ত। স্মারকের ‘অনানুষ্ঠানিক’ একটি খসড়ার বরাত দেওয়া হয়েছে। তবে চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত একই ধরনের একটি বিষয়কে ‘বানোয়াট’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল হোয়াইট হাউজ।
দুপক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে ট্রাম্পের বিস্তারিত বিবৃতির ঠিক এক দিন পর সামনে এলো এ তথ্য। তবে তার দেওয়া বিবৃতির মূল বিষয়গুলোও একইভাবে খণ্ডন করেছেন ইরানি কর্মকর্তারা।
শনিবার রাষ্ট্রীয় টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ৬০ দিনের মধ্যে ইরানকে তার ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সম্পদে পূর্ণ প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যাতে এসব সম্পদ কোনো বাধা ছাড়াই ইরানের পছন্দের গন্তব্যের ব্যাংকগুলোয় স্থানান্তর এবং খরচ করা যায়।
এদিকে, চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে এক কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছিলেন, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কাতার সফরকারী একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ছিলেন। ‘অবরুদ্ধ তহবিলে’র বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে সেখানে যান তিনি। চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে সমঝোতা স্মারকে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।






