বয়স ৮৩, দাঁড়িয়ে বিলি করলেন ১০ হাজার কেজি মাংস!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বয়স ৮৩ বছর। এ বয়সে পৌঁছেও প্রবীণের যেন একটুও ক্লান্তি নেই। অবসাদ তাকে কাবু করতে পারেনি। কোরবানির ঈদের দিন টানা আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বিতরণ করেছেন ১০ হাজার কেজি মাংস। জনপ্রতি পেয়েছেন পাঁচ কেজি করে। আবার মাংস রান্নার মসলার জন্য প্রতিজনকে দিয়েছেন ৫০০ টাকা। সেই হিসেবে দুই হাজার জন পেয়েছে ১০ লাখ টাকা। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত গরিব-অসহায়দের মধ্যে এ ঈদ উপহার দিয়েছেন তিনি।
১০ হাজার কেজি মাংসের জন্য তাকে কোরবানি দিতে হয়েছে ২০টি গরু। এসব গরুর দাম কত? এমন প্রশ্নে একগাল হেসে বৃদ্ধের এক ছেলে বললেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে কোরবানি দেওয়া। এখানে গরুর দাম জানা কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ!’
দুপুর ১২টায় শুরু করেন মাংস বিতরণ। শেষ হয় রাত ৮টায়। টানা মাংস বিতরণ হয়েছে সুশৃঙ্খলভাবে। মাঝে জোহর, আসর ও মাগরিবের নামাজ আদায় করেছেন। ২০টি বিশালাকৃতির গরু। একেকটি গরুর ওজন ৭০০-৮০০ কেজি, প্রতিটি গরুর ওজনের ৪০ শতাংশ চামড়া, হাড়, নাড়িভুঁড়ি বাদ দিয়ে মাংস পাওয়া গেছে প্রায় ১০ হাজার কেজি। এ মাংস কাটার জন্য ছিল ২০০ জনের কসাইয়ের দল। ঈদের নামাজের পরেই কসাইরা বনরুটি, কলা, পানি খেয়ে শুরু করেন কাজ। তারপর কসাইসহ অন্তত দুই হাজার মানুষের দুপুরে খাওয়ার জন্য রান্না করা হয় মাংস।
দান করতে পারলেই যেন তার রাজ্যের আনন্দ। শুধু আনন্দ নয়, আট ঘণ্টা ধরে এ বয়সে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে পরিশ্রম করেছেন, সেটা তাকে ক্লান্ত-শ্রান্ত করেনি। বরং অন্যরকম এক সুখ অনুভব করেছেন। হাসিমুখে সবার হাতে মাংস ও টাকা তুলে দিয়েছেন। মাংস নেওয়ার জন্য বাবা-মার সঙ্গে আসা ছোট বাচ্চাদের হাতে তুলে দিয়েছেন ২০০ টাকার ঈদ বকশিশ।
নিজের এ দানের কথা কিছুতেই প্রচার করতে চান না তিনি। নীরবেই চলে তার গরিব-অসহায়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তার বড় ছেলে বাবার এ মহান উদ্যোগের ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, ‘অফুরান প্রাণশক্তি বাবার। ধৈর্য হারান না। গরিবের প্রতি এমন মমত্ববোধ আমাদেরও নাড়িয়ে দেয়। মানুষের প্রতি দয়া-দান-মায়া-ভালোবাসায় অনুপ্রাণিত করতে চান তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি নাতিদের। তাই তাদেরও সম্পৃক্ত করেন এতে। সত্যি আমরা সৌভাগ্যবান ও গর্বিত।’ নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে এমন শর্তেই ছেলে রাজি হলেন। জানালেন বাবার মমত্ববোধের সেই অজানা গল্প।
ধর্মপ্রাণ, দানশীল, পরহেজগার এ ধনাঢ্য ব্যক্তিকে দেশের অসংখ্য মানুষ চেনেন ও জানেন। লোকদেখানো দান-খয়রাতে তার অনাগ্রহ। সহানুভূতির দীক্ষা দেওয়ার জন্য কৌশলে গরু কেনার দায়িত্ব দেন নাতিদের। বাজেট বলে দেন আগে থেকে। সঙ্গে পরিকল্পনার কথাও জানান। সেভাবে নাতিরা সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন। কত কেজি মাংস, কতজনকে বিলাতে হবে, সে হিসাব করে গরু কেনেন বাজার ও খামার থেকে।
এই কোরবানির মাংস বিলাতে গিয়ে যেন কোনো দুর্ঘটনা বা বিশৃঙ্খলা না হয়, সে ব্যাপারে আগে থেকে পরিবারের সবাই থাকেন বেশ সতর্ক। তৎপর থাকেন স্বেচ্ছাসেবকরা। একজনও যাতে বাদ না পড়ে সেদিকে মনোযোগ থাকে তাদের। তাই ঈদের পরদিনও দুটি গরু কোরবানি দিয়ে মাংস বিতরণ করেছেন।
চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানার একটি আবাসিক এলাকায় ধনাঢ্য এ প্রবীণের বাড়ি। সংগীত অনুরাগী মানুষটি অতিথি আপ্যায়নের জন্যও পরিচিত। নিজের হাতে খাবার তুলে দেন সবার মুখে। অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের যে ঐতিহ্য, সেটি মনেপ্রাণে লালন করেন তিনি। অথচ তিনি চট্টগ্রামের ভূমিপুত্র নন।
এবার আসা যাক আসল কথায়। গল্পের শেষপ্রান্তে। রহস্যে ভরা সেই কাহিনি। দফায় দফায় ফোন করে তথ্য জানতে গিয়ে নাম-পরিচয় দিয়ে প্রতিবেদন লেখার আকুতি-অনুনয়-বিনয় এ সাংবাদিকের। অবশেষে সহৃদয় হলেন। অনুমতি দিলেন নাম প্রকাশের!
এবার জেনে নিন নাম-পরিচয়। ৮৩ বছরের এই প্রবীণ হলেন দেশের নামকরা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পিএইচপি ফ্যামিলির প্রতিষ্ঠাতা সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। ১৯৪৩ সালের ১২ মার্চ নারায়ণগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। স্থায়ী আবাস গড়েন চট্টগ্রামে নাসিরাবাদে। যার সূত্রে খবর পাওয়া গেছে, যাকে প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করা হয়েছে, তিনি বড় ছেলে ও পিএইচপি ফ্যামিলির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন।






