নিজেকে পুড়িয়ে আলো ছড়ান ‘খোকা মামা’

এখনো সুযোগ পেলেই প্রিয় ভাগ্নেদের সঙ্গে বেড়াতে যান খোকা মামা - আগামীর সময়
পাবনা শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার ছোট্ট একটি দোকান। যেখানে বিত্ত বা ক্ষমতা না থাকলেও, মাটির প্রদীপের মতো নিজেকে পুড়িয়ে গত সাড়ে তিন দশক ধরে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন এক নিভৃতচারী— নাজিমুদ্দিন খোকা। শহরবাসী তাকে চেনেন ‘খোকা মামা’ নামে। সাধারণ এক স্টেশনারি দোকানদার হয়েও যিনি তিন শতাধিক তরুণ-যুবককে আগলে রেখেছেন পরম মমতায়।
নব্বইয়ের দশকে পাবনা শহরে যখন মাদকের ছড়াছড়ি, তখন মেধাবী তরুণদের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নাজিমুদ্দিন খোকা। পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তার দোকান ‘রুমা স্টেশনারি’ শুধু খাতা-কলম বিক্রির জায়গা ছিল না; ছিল মেধাবীদের স্বপ্ন বুননের কেন্দ্রবিন্দুও। ১৯৯০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাবনার সেরা মেধাবীরা স্কুল-কলেজ শেষে আড্ডা জমাত তার দোকানে। সেই আড্ডা বিপথে যাওয়ার নয়, বড় হওয়ার। স্বপ্নবাজ এ কিশোরদের তদারক করতে করতে সাধারণ নাজিমুদ্দিন কখন যে সবার প্রিয় ‘খোকা মামা’ হয়ে উঠলেন, তা জানেন না তিনি নিজেও। অসচ্ছলতার কারণে খোকার খুব বেশি পড়াশোনা করা হয়নি। কিন্তু দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রতি প্রবল মোহ ছিল তার। ১৯৯১ সাল থেকে যাতায়াতের পথে পাবনা জিলা স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের থামিয়ে পরিচিত হতে শুরু করেন তিনি। কিশোরদের মনে বুয়েট-মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন বুনে দিতেন।
শিক্ষার্থীদের ভালো ফলের খবর পেলেই দিতেন কলম, পেনসিল বক্সসহ নানা উপহার। কেউ খারাপ আড্ডায় পড়ছে কি না— সেদিকে ছিল তার কড়া নজর। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফি, বইয়ের খরচ জোগাতেন সামান্য আয় থেকে। নিজের দোকান বন্ধ রেখে গাঁটের পয়সা খরচ করে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে চলে যেতেন ঢাকা বা রাজশাহীর ভর্তি পরীক্ষাকেন্দ্রে।
খোকার পরিশ্রম বৃথা যায়নি। তার স্নেহধন্য সেই কিশোররা আজ দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কেউ মাইক্রোসফটের গবেষক, কেউ বুয়েটের অধ্যাপক, কেউবা প্রথিতযশা চিকিৎসক বা সাংবাদিক।
তাদের একজন বুয়েটের অধ্যাপক ফেরদৌস সারোয়ার সৈকত। বললেন, ‘মামা সবসময় আমাদের ভালো পরামর্শ দিতেন। তার আঙিনায় ধূমপায়ীদের প্রবেশাধিকার ছিল না। তিনি আমাদের মনে এমনভাবে রোমাঞ্চ জাগাতেন, বুয়েটকে মনে হতো যেন এক স্বপ্নের জগৎ। তিনি আজও ঢাকায় এলে বুয়েটে আমাদের দেখতে আসেন। শতচেষ্টা করেও তাকে কিছুই দিতে পারি না; আমাদের দেখেই তিনি শান্তি পান।’
একইরকম কথা গণমাধ্যমকর্মী শোভন আরেফেরও, ‘খোকা মামা নিজে আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন না, থাকতেন ভাইয়ের বাড়িতে। কিন্তু নিজেকে নিয়ে ভাবেননি, নিঃস্বার্থভাবে বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের আগলে রেখেছেন এবং সাফল্যের বন্দরে পৌঁছে দিয়েছেন।’
২০০৫ সালের পর স্টেশনারি ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে মোবাইল রিচার্জের ব্যবসা শুরু করেন খোকা। বর্তমানে মোবাইল-ইন্টারনেটে ব্যস্ত প্রজন্ম খুব একটা আসে না তার দোকানে। তবে, এখনো বড় ভাইদের কাছে গল্প শুনে অনুজদের কেউ কেউ আসেন মামার খোঁজে।
পাবনা জিলা স্কুলের ২০২২ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী জামিউল হাসান সোহান বললেন, ‘অনেক দিন আগে কথা প্রসঙ্গে হোস্টেলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার অনিশ্চয়তা নিয়ে আমার ভয়ের কথা খোকা মামাকে বলেছিলাম। তিনি তা মনে রেখেছিলেন। ২০২৫ সালে আমার এইচএসসি পরীক্ষার আগে তিনি আচমকা ফোন করে শুভকামনা জানান। প্রতিটি পরীক্ষার দিন সকাল ৮টায় ফোন দিয়ে আমার ঘুম ভাঙাতেন তিনি।’
জীবনের এ পড়ন্ত বেলায় নাজিমুদ্দিন নিয়েছেন নতুন এক দায়িত্ব। শহরের যেকোনো গুণী বা পরিচিত মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ামাত্র তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকবার্তা জানান, জানাজায় উপস্থিতি হন।
খোকার বয়স এখন ৬৫ ছুঁইছুঁই। শহরের কালাচাঁদপাড়ায় ভাইয়ের বাড়িতে থাকেন। টানাপড়েনের সংসারে দুই সন্তানের লেখাপড়াসহ নানা খরচ মেটাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়। তবে তা নিয়ে এতটুকুও আক্ষেপ নেই তার। প্রতিষ্ঠিত ভাগ্নেরা যখন তাদের সাফল্যের পেছনে খোকার নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা স্মরণ করে শ্রদ্ধায় অবনত হয়, তখন তার চোখ ভিজে ওঠে গর্বের অশ্রুতে।






