রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
পুরো রংপুর বিভাগে এক হাসপাতালে ডায়ালাইসিস
- ৩৯ ডায়ালাইসিস মেশিনের ১৬টিই অচল
- কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিসের যন্ত্র ছাড়া কোনো উপকরণ নেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রংপুর বিভাগের আট জেলার কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবার একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ২০১০ সালে ৩৯টি মেশিন নিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটে বর্তমানে ১৬টি মেশিনই অচল। ১৬ বছরের পুরনো বাকি ২৩টি দিয়ে মেশিন দিয়ে প্রতিদিন ৭২ রোগীকে ডায়ালাইসিস করানো হচ্ছে। অথচ প্রতিদিনই এ সেবা নিতে আসছেন শতাধিক রোগী। কিন্তু সীমিত সক্ষমতার কারণে অনেক রোগী এই সেবা পাচ্ছেন না।
এ ছাড়া বর্তমানে এই হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের উপকরণ সরবরাহ না থাকায় রোগীদের তা কিনতে হচ্ছে।
কিডনি রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পুরনো হওয়ায় অনেক সময় ডায়ালাইসিস শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যেই মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। তখন সেদিনের জন্য ওই রোগীর আর এই সেবা নেওয়া সম্ভব হয় না। তা ছাড়া হাসপাতালে মেশিন ছাড়া ডায়ালাইসিসের আর কোনো উপকরণ নেই। উপকরণ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে রোগীদের। এ নিয়ে বারবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলেও কাজ হয়নি।
উপকরণ কিনতে না পেরে সপ্তাহে দুই বারের পরিবর্তে মাসে একবার ডায়ালাইসিস করছেন দরিদ্র রোগীরা। যারা প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে পারছেন না, তাদের চিকিৎসা চলছে না। টাকার অভাবে অনেকের ডায়ালাইসিস বন্ধ রয়েছে।
ডায়ালাইসিস বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সরা বলছেন, এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে বারবার লিখিতভাবে জানানোর পরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে ডায়ালাইসিস সেবা চলছে অনেকটা না চলার মতো।
সরেজমিনে ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডে ঘুরে ও কিডনি রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সময়মতো ডায়ালাইসিস করাতে না পেরে অনেকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। রোগী ও তাদের স্বজনরা বলছেন, কেউ কেউ ডায়ালাইসিসের উপকরণ কিনতে না পারায় বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন। অনেকে এসব উপকরণ বাইরে থেকে কিনতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন। অথচ এসব উপকরণ হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করার কথা ছিল।
ঠাকুরগাঁও থেকে এই হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করাতে এসেছেন ৬০ বছর বয়সী নাজমা আক্তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘উপকরণ কিনতে না পারায় আমার ডায়ালাইসিস হচ্ছে না। শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারছি না।’
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ থেকে আসা সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘উপকরণ কিনতে না পারায় মাসে আটবারের পরিবর্তে চারবার ডায়ালাইসিস করছি। এতে আমার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। এভাবে আরও কিছুদিন চললে মারা যাব।’
লালমনিরহাটের সফুরা বেগম ও গাইবান্ধার অহেদ আলী জানালেন, গরু-ছাগলসহ সংসারের জিনিসপত্র বিক্রি করে ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন। এরপর আর কোনো উপায় নেই। পরিবারের সক্ষমতাও নেই এত টাকা ব্যয় করে চিকিৎসা করানোর।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একজন কিডনি রোগী ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে সপ্তাহে দুদিন করে মোট ৪৮ বার ডায়ালাইসিস করাতে পারেন। এটি রোগীদের প্যাকেজ সুবিধা দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যাদের দুটি কিডনি বিকল, একমাত্র তাদের সপ্তাহে দুবার ডায়ালাইসিস করানো হয়। আগে ডায়ালাইসিসের সব ধরনের উপকরণ হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হতো। তবে এখন প্রত্যেক রোগীকে ডায়ালাইসিসের সব উপকরণ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। একবার ডায়ালাইসিস করার উপকরণ কিনতে প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ হয়। মাসে আটবার ডায়ালাইসিস করতে খরচ হয় ২৪ হাজার টাকা। সব রোগীর পক্ষে এই ব্যয় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডের নার্স মো. রানা জানিয়েছেন, বর্তমানে এখানে ২৩টি ডায়ালাইসিস মেশিন সচল রয়েছে। কিন্তু উপকরণ সরবরাহ না থাকায় অনেকের পক্ষে ডায়ালাইসিস করানো সম্ভব হচ্ছে না। আগে রোগীদের জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হতো, এখন উপকরণ সরবরাহ না থাকায় দরিদ্র রোগীর সংখ্যা কমে গেছে। যারা আসছেন তারা বাইরে থেকে সব উপকরণ কিনে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ডায়ালাইসিস ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমানের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের পুরনো যন্ত্রপাতি ও নানা সংকটের মধ্যেই সেবা দিতে হচ্ছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানালেন, ডায়ালাইসিস করাতে সিরিঞ্জ, পাইপ, ওষুধ, পানিসহ নানা উপকরণের প্রয়োজন হয়। প্রতিবার ডায়ালাইসিস করাতে এসব উপকরণ বাবদ খরচ পড়ে প্রায় ৩ হাজার টাকা। বর্তমানে সরবরাহ না থাকায় এসব উপকরণ রোগীদেরই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে রোগীদের ব্যয় কমবে।




