বিমর্ষ ইরানিদের দীর্ঘশ্বাস
এখন আর কিছুই স্বাভাবিক মনে হয় না

পোষা প্রাণীগুলোর মায়ায় ঘর ছাড়েননি আজাদেহ
ফেব্রুয়ারি মাসে যখন শুরু হলো তেহরানে বোমাবর্ষণ, সবাই তখন মেতেছিল বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে আলোচনায়। খামেনির মৃত্যুর খবরে এসেছিল বড় পরিবর্তন। তখন আমরা শুনেছিলাম কেবল বড় বড় নেতার খবর। কিন্তু কেমন আছেন সেই শহরের সাধারণ মানুষ? ইরানি-আমেরিকান সাংবাদিক মরিয়ম রহমানিয়ান তুলে ধরেছেন সেইসব ঘরবন্দি মানুষের যাপিত জীবনের গল্প।
সালেমেহ কাজ করেন একটি অফিসের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার হিসেবে। হামলার সময় তিনি ছিলেন কর্মস্থলে। সেই দিনের আতঙ্কের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, চিরচেনা ৪০ মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিতে সেদিন লেগেছিল তিন ঘণ্টা। এখন যেকোনো ছোট শব্দ শুনলেও তিনি আঁতকে ওঠেন। তার মতে, স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ হারিয়ে গেছে শহর থেকে।আকরামের বয়স ৬৩ বছর। এই ধ্বংসলীলা দেখে তার মনে পড়ে যায় আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের কথা। ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তি দেখে তিনি ব্যথিত। তবে প্রযুক্তির কারণে এখন খবর দ্রুত ছড়াচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। নিজের দেশের এই লড়াইকে তিনি দেখছেন সম্মানের চোখে।
কোরিয়ান ভাষার শিক্ষক রেজভানেহ হারিয়েছেন তার কাজ। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে তার সব অনলাইন ক্লাস। একদিকে আয়ের পথ বন্ধ, অন্যদিকে বিমান হামলার ভয় সব মিলিয়ে রাতগুলো তার কাটে প্রচণ্ড উদ্বেগের মধ্যে। বই পড়ে বা সিনেমা দেখে তিনি চেষ্টা করছেন নিজেকে শান্ত রাখতে।
সারা নামের ৩৯ বছর বয়সী এক নারী এখনো তেহরানেই আছেন। তিনি তখন যাচ্ছিলেন তার প্রিয়জনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতে। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে তিনি ফিরেছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। শহর ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি রয়ে গেছেন শেকড়ের টানে। দেশের একতা আর স্বাভাবিক জীবনের প্রত্যাশা করেন তিনি নিজের শহরকে ভালোবেসে।
শিল্পী সাদরা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন বিস্ফোরণের সেই তীব্র শব্দ তরঙ্গ। তার কাছে যুদ্ধ মানে এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত। তবে রোজ সকালে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম তাকে দেয় বেঁচে থাকার শক্তি। তিনি বিশ্বাস করেন ইরান টিকে থাকবে ইতিহাসের সব চড়াই-উতরাই পেরিয়ে।
আজাদেহ ব্যস্ত ছিলেন নিজের পোষা পাখিদের খাবার দিতে। হঠাৎ আসা এক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল তার পুরো ঘর। আত্মীয়দের খোঁজ নিতে তিনি ব্যবহার করেন মোবাইল মেসেজ। নিজের স্মৃতি ঘেরা ঘর আর অবলা প্রাণীদের ছেড়ে তিনি কোথাও যেতে চান না।
মবিনার স্বামী পাড়ি জমিয়েছেন জার্মানিতে, আর তিনি গুনছিলেন যাওয়ার দিন। কিন্তু যুদ্ধের শুরু ওলটপালট করে দিল সব পরিকল্পনা। স্বামীর আংটিটা শক্ত করে ধরে তিনি খুঁজে পান ভরসা। যুদ্ধের এই খবর আদান-প্রদানে তিনি কাজ করছেন মানুষের মাঝে যোগসূত্র হিসেবে।
বিদেশের ভিসা হাতে পেয়েও মাহতাব আটকে গেছেন যুদ্ধের বেড়াজালে। প্রথম দিকে ভয় পেলেও এখন তিনি চিনে গেছেন বিভিন্ন গোলার শব্দ। ভয় যখন হয়ে গেছে নিত্যসঙ্গী, তখন তিনি নওরোজের কেনাকাটা করে খুঁজছেন একটুখানি আনন্দ। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ক্ষতি তাকে কাঁদায় ভীষণভাবে।
লেখক সামা মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের ভাগ্যই যেন কষ্টের গল্পে লেখা। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আর যুদ্ধের চাপে তিনি হয়ে পড়েছেন দিশেহারা। তেহরান থেকে অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তার। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়ে তিনি আছেন গভীর হতাশায়।
সবচেয়ে মর্মান্তিক গল্পটি বাহারেহর। মার্চ মাসে এক হামলায় তিনি হারিয়েছেন পরিবারের ১২ জন সদস্যকে। তার ১৭ বছরের ছোট ভাইটি হতে চেয়েছিল মহাকাশচারী। আজ তার পরিবারের কোনো ছবি বা স্মৃতি চিহ্নটুকুও অবশিষ্ট নেই। শোক পালন করার জন্য একটা জায়গা পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই তার স্মৃতিবিজড়িত সেই ভিটায়।
৪০ বছর ধরে ইরানে থাকা আফগান নাগরিক আলী দেখছেন আবারও যুদ্ধের বীভৎসতা। পড়শীরা পালিয়ে গেলেও তিনি যত্ন নিচ্ছেন তাদের ফেলে যাওয়া গাছগুলোর। থমথমে তেহরানের মসজিদে গিয়ে তিনি প্রার্থনা করেন সবার নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য। এক চিলতে শান্তির আশায় তিনি এখনো বুক বেঁধে আছেন।





