লাইব্রেরি অব কংগ্রেস
যে লাইব্রেরি হার মানায় রূপকথাকেও

লাইব্রেরি অব কংগ্রেস
১৭ কোটিরও বেশি বই। ৪৭০টি ভাষা। অন্তত সাড়ে তিন কোটি পাণ্ডুলিপি ও পুঁথি। মানচিত্র আছে ৪০ লাখের ওপর। ৬০ লাখ গানের স্বরলিপি, চিঠিপত্র, বাদ্যযন্ত্র, রেকর্ড, ক্যাসেট। প্রায় ১ কোটি ছবি এবং ১ হাজার ২০০ পত্রিকার নিয়মিত সংখ্যা। আড়াই লাখের ওপর সিনেমা ও ডকুমেন্টারি ফিল্ম। এত সংগ্রহ নিয়েই বিশ্বের বৃহত্তম গ্রন্থাগার লাইব্রেরি অব কংগ্রেস।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ও প্রধান গবেষণা গ্রন্থাগার এটি। তিনটি ভবন নিয়ে গড়ে ওঠা এই লাইব্রেরি দাঁড়িয়ে ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিলে। ১৮০০ সালে যাত্রা শুরু করেছিল এটি। তখন প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস ফিলাডেলফিয়া থেকে রাজধানী মাত্রই ওয়াশিংটন ডিসিতে স্থানান্তর করেছেন। ১৮১৪ সালে যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনী ক্যাপিটল হিল পুড়িয়ে দিলে পুড়ে যায় গ্রন্থাগারটি।
পরের বছর কংগ্রেস সদস্য টমাস জেফারসনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বাছাই করা বই এনে সাজানো হয় লাইব্রেরিটি। জেফারসন যখন ফ্রান্সে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন, তখন তিনি সেখানকার দোকানে ঘুরে ঘুরে আমেরিকা সম্পর্কে বহু দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত ১৮৫০ সালে এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুড়ে গিয়েছিল প্রায় ৩৫ হাজার বই।
গৃহযুদ্ধের আগ পর্যন্ত লাইব্রেরিটি শুধু কংগ্রেসের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৮৬৪ থেকে ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত লাইব্রেরিয়ান আইনসওয়ার্থ র্যান্ড স্পফোর্ড এটি সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। প্রচলিত রয়েছে, এটি বিশ্বের বৃহত্তম লাইব্রেরি, যা হার মানায় রূপকথার রাজপ্রাসাদকে।
টমাস জেফারসন বিল্ডিং
লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের প্রধান ভবনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নান্দনিক ও ঐতিহাসিক টমাস জেফারসন বিল্ডিং। একে অনেকেই বলেন—‘আমেরিকার জনগণের বইয়ের প্রাসাদ’। যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রধান রচয়িতা টমাস জেফারসন।
১৮৯৭ সালে উদ্বোধন হওয়া এই ভবনে রয়েছে মার্বেলের দৃষ্টিনন্দন কলাম, শিল্পসমৃদ্ধ ভাস্কর্য এবং দেবদূতের নকশা। সিঁড়ির রেলিংয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতীকী টুপি পরা শিশু আকৃতির ভাস্কর্য নজর কাড়ে। কাচের ছাদ এবং শিল্পী এলিহু ভেডার নির্মিত জ্ঞানের দেবি মিনার্ভার মোজাইক এই স্থাপনার অন্যতম আকর্ষণ।
দেয়াল জুড়ে অসংখ্য ম্যুরাল ভবনটির শিল্পময়তা আরও সমৃদ্ধ করেছে। তিনতলায় আছে বিশাল গম্বুজাকৃতির ‘প্রধান পাঠকক্ষ’, যেখানে ঢুকতে গবেষকদের লাগে বিশেষ কার্ড। এই পাঠকক্ষের উঁচু গম্বুজ, চারপাশের ভাস্কর্য ও শিল্পকর্ম একে অনন্য করে তুলেছে। এখানে একসঙ্গে প্রায় ২১২ জন পাঠক বসে করতে পারেন পড়াশোনা।
জন অ্যাডামস বিল্ডিং
জন অ্যাডামস ভবন লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের দ্বিতীয় প্রধান ভবন, নির্মিত হয় ১৯৩৯ সালে। ভবনটি আর্ট ডেকো শৈলীর স্থাপত্যে গড়ে ওঠা এক অনন্য নিদর্শন। টমাস জেফারসন ভবনে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অতিরিক্ত সংগ্রহ সংরক্ষণের জন্য নির্মাণ করা হয় এটি। এতে আছে প্রায় ১৮০ মাইল দীর্ঘ বইয়ের শেলফ, যা সক্ষমতা দেয় বিপুল সংগ্রহ ধারণের।
ভবনটির সামনের অংশ মার্বেল পাথরে মোড়া, যা বাড়িয়েছে এর গাম্ভীর্য। প্রধান প্রবেশপথে আছে বিশাল ব্রোঞ্জের দরজা, যেখানে খোদাই করা আছে বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতায় লিখন পদ্ধতির বিকাশে অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রতীকী ১২টি চিত্র।
জেমস ম্যাডিসন মেমোরিয়াল বিল্ডিং
জেমস ম্যাডিসন মেমোরিয়াল বিল্ডিং লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় ভবন, যা নির্মিত হয় ১৯৮০ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ রাষ্ট্রপতি জেমস ম্যাডিসন স্মরণে এই আধুনিক স্থাপনাটি প্রায় দ্বিগুণ করে দেয় লাইব্রেরির পরিসরকে।
টমাস জেফারসন বিল্ডিং, জন অ্যাডামস বিল্ডিং এবং ম্যাডিসন বিল্ডিং—এই তিনটি মিলেই গড়ে উঠেছে লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের বিশাল কমপ্লেক্স। এখানে সাধারণ পাঠক ও গবেষকদের জন্য রয়েছে ২১টি পাঠকক্ষ এবং বিপুল সংগ্রহশালা। এই ভবনগুলো একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। মাটির নিচে নির্মিত সুড়ঙ্গপথ, নিউম্যাটিক টিউব এবং কনভেয়ার বেল্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে এক ভবন থেকে আরেকটিতে দ্রুত স্থানান্তর করা যায় বই ও নথি।
বইয়ের রাজ্যে রাজনীতি
২০১৬ সালে প্রথম নারী এবং প্রথম আফ্রো-আমেরিকান হিসেবে লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের লাইব্রেরিয়ান পদে শপথ নেন কার্লা হেইডেন। গত মে মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ‘ওক’ এজেন্ডা ছড়ানোর অভিযোগে বরখাস্ত করেন। তার জায়গায় নিয়োগ পান প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আইনজীবী টড ব্ল্যাঞ্চ, যিনি স্টর্মি ড্যানিয়েলস মামলায় লড়েছিলেন ট্রাম্পের হয়ে।
ঐতিহাসিকভাবে টমাস জেফারসনের আমলে পাস হওয়া একটি আইনের মাধ্যমে ‘লাইব্রেরিয়ান অব কংগ্রেস’ নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে, যা প্রমাণ করে এই পদের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক।
তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়, যখন ট্রাম্প মনোনীত আরও দুজন প্রতিনিধি কপিরাইট অফিসে ঢোকার চেষ্টা করলে লাইব্রেরির কর্মকর্তারা তাদের বাধা দেন। শান্ত স্বভাবের লাইব্রেরিয়ানদের এমন প্রতিরোধ সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু এমন সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটির নীতিগত অবস্থান।
এই টানাপড়েনের প্রতীক যেন খোদ টমাস জেফারসনের গ্রেট হলের কয়েকটি শিল্পকর্ম। অসংখ্য ম্যুরালের মধ্যে সুশাসন ও কুশাসনের প্রতীকী চিত্রগুলো দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিশেষভাবে। এর মধ্যে এনার্কি নামের একটি ম্যুরাল যেন এক শক্তিশালী সতর্কবার্তা বহন করে। চিত্রটিতে দেখা যায়— একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে দিচ্ছে, আর তার সহযোগীরা আইনের শাসন ও সভ্যতার ভিত্তি ধ্বংসে মেতে উঠেছে। এখানে বার্তা স্পষ্ট— জ্ঞান ও আইনের শাসন ভেঙে পড়লে সভ্যতা দ্রুতই অরাজকতা ও ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। তাই জ্ঞান শুধু সংগ্রহের বিষয় নয়, থাকে এটি রক্ষা করার দায়ও।
শেষের আগে
জেমস ম্যাডিসন মেমোরিয়াল ভবনের ষষ্ঠ তলার ক্যাফেটেরিয়া থেকে একনজরে দেখা যায় পুরো ওয়াশিংটন ডিসি। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে তিন হাজারেরও বেশি কর্মী কাজ করছেন, আর প্রতিদিনই ক্যাটালগে যুক্ত হচ্ছে প্রায় ১২ হাজার নতুন আইটেম।
এখানে নিয়মিত হয় কনসার্ট, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং নানা আলোচনা সভা। বড়দিন ও নববর্ষ ছাড়া বছরের প্রায় প্রতিটি দিনই খোলা থাকে লাইব্রেরিটি। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য ভেতরে রয়েছে বিশ্রামাগার এবং ক্যাফেটেরিয়া।




