তাহলে প্রাণ আছে লাল গ্রহ মঙ্গলে?

২০২০ সালে নিজের তোলা সেলফিতেই কিউরিওসিটি রোভার। ছবি: নাসা
নাসার মঙ্গলযান কিউরিওসিটি রোভার মঙ্গলগ্রহে এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় জৈব অণুর বিশাল একটি সংগ্রহ শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে এমন অন্তত সাতটি কার্বন-ভিত্তিক যৌগ রয়েছে যেগুলো আগে কখনো লাল গ্রহে পাওয়া যায়নি।
সিএনএনে শনিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।
এই আবিষ্কারকে বিজ্ঞানীরা মঙ্গলগ্রহের রাসায়নিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন, কারণ এসব জৈব অণু পৃথিবীতে জীবনের উদ্ভবের সঙ্গে সম্পর্কিত মৌলিক রাসায়নিক গঠনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ন্যাচার কমিউনিকেশনস-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় জানা গেছে, কিউরিওসিটি রোভার যে পাথরের নমুনা বিশ্লেষণ করেছে সেখানে মোট ২১ ধরনের কার্বন-সমৃদ্ধ জৈব অণু শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নাইট্রোজেন-সমৃদ্ধ জটিল যৌগ, যাকে বলা হয় নাইট্রোজেন হেটেরোসাইকেল, যা আরএনএ ও ডিএনএ তৈরির পূর্ববর্তী রাসায়নিক গঠন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এছাড়া পাওয়া গেছে বেনজোথিওফিন নামের একটি যৌগ, যা সাধারণত উল্কাপিণ্ডে পাওয়া যায় এবং কার্বন ও সালফার সমৃদ্ধ জৈব কাঠামোর অংশ।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই জৈব অণুগুলো মঙ্গলগ্রহে প্রায় ৩৫০ কোটি বছর ধরে সংরক্ষিত অবস্থায় থাকতে পারে। মঙ্গলের কঠিন বিকিরণপূর্ণ পরিবেশেও এসব অণুর টিকে থাকা ইঙ্গিত দেয় যে প্রাচীন মঙ্গলগ্রহে এমন পরিবেশ ছিল যা জৈব পদার্থ সংরক্ষণে সক্ষম ছিল।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার ভূতত্ত্ববিদ ড. অ্যামি উইলিয়ামস বলেন, এই ফলাফল প্রমাণ করে যে মঙ্গলে জটিল জৈব পদার্থ দীর্ঘ সময় ধরে অক্ষত থাকতে পারে, যা গ্রহটির প্রাচীন বাসযোগ্য পরিবেশের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।
কিউরিওসিটি রোভার ২০১২ সালে মঙ্গলের গেইল ক্রেটারে অবতরণ করে মূলত এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যে, মঙ্গলগ্রহ কখনো বাসযোগ্য ছিল কি না। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর রোভারটি মাউন্ট শার্প নামের পাহাড়ি অঞ্চলে পৌঁছে, যেখানে ক্লে বা কাদামাটি সমৃদ্ধ স্তর পাওয়া যায়।
এই কাদামাটি জৈব অণু সংরক্ষণে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। ওই অঞ্চলে পাওয়া পাথরের স্তর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেখানে একসময় হ্রদ ছিল এবং সেখানে পানির প্রবাহ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আসা-যাওয়া করেছে। এই পরিবর্তনশীল পরিবেশ জৈব যৌগ সংরক্ষণের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২০ সালে কিউরিওসিটি রোভার ‘ম্যারি এনিং’ নামে একটি এলাকায় পাথর খনন করে নমুনা সংগ্রহ করে। এই নমুনাটি রোভারের ভেতরে থাকা স্যাম (স্যাম্পল অ্যানালাইসিস এট মার্স) যন্ত্রে বিশ্লেষণ করা হয়। যন্ত্রটি পাথরকে উচ্চ তাপে উত্তপ্ত করে এবং বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর ভেতরের গ্যাস ও যৌগ শনাক্ত করে।
এই প্রক্রিয়ায় টেট্রামিথাইলঅ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড (টিএমএএইচ) নামের একটি রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা জটিল জৈব অণুকে ভেঙে সহজভাবে শনাক্তযোগ্য উপাদানে রূপান্তর করে। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো নতুন ধরনের জৈব অণুগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মঙ্গলের নমুনায় পাওয়া কিছু যৌগ পৃথিবীর উল্কাপিণ্ডেও পাওয়া যায়। বিশেষ করে পৃথিবীর বিখ্যাত মুরচিসন উল্কাপিণ্ডের সঙ্গে মিল থাকা যৌগ শনাক্ত করা হয়েছে। এই উল্কাপিণ্ডটি চারশো কোটি বছরের বেশি পুরোনো এবং এতে জৈব যৌগের উপস্থিতি রয়েছে।
গবেষকরা মনে করছেন, প্রাচীন সৌরজগতে উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে জৈব উপাদান বিভিন্ন গ্রহে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার মধ্যে পৃথিবী ও মঙ্গল উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
এই আবিষ্কার কি মঙ্গলে জীবনের প্রমাণ?
বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই আবিষ্কার সরাসরি জীবনের প্রমাণ নয়। কারণ জৈব অণু বিভিন্ন প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেও তৈরি হতে পারে, কিংবা উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে মঙ্গলে পৌঁছাতে পারে। তাই এই ফলাফল শুধু মঙ্গলের জৈব রসায়নের উপস্থিতি ও জটিলতা প্রমাণ করে, কিন্তু জীবনের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে না।
মঙ্গলের অতীতে জীবন ছিল কি না- এই প্রশ্নের উত্তর পেতে বিজ্ঞানীরা একমত যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো মঙ্গলগ্রহ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। উন্নত ল্যাবে বিশ্লেষণ ছাড়া এই জটিল প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। কিউরিওসিটি এবং পার্সিভেরেন্স রোভারের আবিষ্কারগুলো এখন সেই বড় লক্ষ্যের দিকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করছে।
ইউনিভার্সিটি অব পারডিউ-এর অধ্যাপক ড. ব্রায়নি হর্গান বলেন, এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে এসব জৈব অণু জীবনের কারণে তৈরি হয়েছিল কি না, তবে আমরা সেই উত্তর খোঁজার পথে অনেক দূর এগিয়েছি।
অন্যদিকে কিউরিওসিটি মিশনের বিজ্ঞানী অ্যাশউইন ভাসাভাদা বলেন, মঙ্গল শুধু একসময় বাসযোগ্য ছিল না, বরং এটি ছিল অবিশ্বাস্যভাবে বাসযোগ্য একটি গ্রহ, যেখানে জীবনের উপযোগী পরিবেশ দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যমান ছিল।
