বিদ্যুৎ উৎপাদনে আবারও কয়লার যুগে ফিরছে জার্মানি?

জার্মানিতে বর্তমানে উৎপাদিত মোট বিদ্যুতের প্রায় ২০ শতাংশের উৎস কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
জার্মানির জ্বালানি নীতিতে বড় প্রতিশ্রুতি ছিল ‘কোহলোউসস্টাইগ’। অর্থাৎ ধীরে ধীরে কয়লা থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা। লক্ষ্য ছিল ২০৩৮ সালের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ করা কয়লা ব্যবহার। এখন এই পরিকল্পনা নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
ইউরোপে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী দেশ জার্মানি। বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে দেশটি। ২০৩৮ সালের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে কয়লা ব্যবহার বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দেশটির সরকার। বিশেষ করে ২০৩০ সালের মধ্যে বেশি দূষণকারী লিগনাইট কয়লার ব্যবহার বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
বর্তমানে জার্মানির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ আসে কয়লা থেকে। তবে দেশটি বায়ু ও সৌরশক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়াতে চায়। এরইমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসছে দেশটির মোট বিদ্যুতের ৫৯ শতাংশ।
বিকল্প হিসেবে কয়লার পরিবর্তে প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কয়লার তুলনায় প্রায় অর্ধেক কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে গ্যাস। বর্তমানে জার্মানির বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১৩ শতাংশ আসে গ্যাস থেকে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পর বিশ্ববাজারে বেড়ে গেছে গ্যাসের দাম। এতে করে আবারও কয়লার দিকে ঝুঁকছে অনেক দেশ। তবে কয়লা ব্যবহারের কিছু নিয়ম শিথিল করেছে জাপান। ইতালিও তাদের কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধের সময়সীমা পিছিয়েছে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত। আর কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ বিলম্ব করেছে ভারত।
জার্মানির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠেছে। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বলেছেন, ‘আমাদের এই দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পখাতকে ঝুঁকিতে ফেলার মতো বাস্তবতাবিচ্ছিন্ন পরিকল্পনায় আমি যেতে পারি না।’
জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ এই দুই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে জার্মানি। প্রচুর সহজলভ্য ও সস্তা লিগনাইট কয়লার মজুত রয়েছে দেশটির কাছে। এতে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি এবং বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম। ফলে জার্মানি এই জ্বালানিতে প্রায় সম্পূর্ণ স্বনির্ভর।
অন্যদিকে দেশটিকে আমদানি করতে হয় প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৯৫ শতাংশই। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়লে তুলনামূলক সস্তা কয়লার দিকে ফেরাটা অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
নিউক্লিয়ার শক্তিও আর বিকল্প নয়, কারণ ২০২৩ সালে শেষ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ করে দিয়েছে জার্মানি।
জার্মানির জ্বালানি কোম্পানি এলইএজি বলেছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনাকে স্বাগত জানায় তারা।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে লিগনাইট সরবরাহ বাড়িয়ে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল তারা।
তবে পরিবেশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওকোর গবেষক হাউকে হারমান মনে করেন, কয়লা নয়, বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও বাড়ানোই সমাধান।
অন্যদিকে জার্মান শিল্পখাতের অনেকে স্পষ্ট নীতি চান। জার্মান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক উলফগ্যাং গ্রোসে এন্ত্রুপ বলেছেন, ‘শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি জরুরি। কারণ কেবল নবায়নযোগ্য শক্তি এখনো সেই নিশ্চয়তা দিতে পারে না।’
বর্তমানে একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। ছয়টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সম্ভাব্য নতুন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করছে কমিটিটি। এখন শুধু ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই কেন্দ্রগুলো।
বিদ্যুৎ কোম্পানি স্টিগ ইকোনি গ্রুপ বলেছে, এগুলো নিয়মিত চালু রাখা হলে কয়েক মিলিয়ন পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
জার্মান জোট সরকারে মতপার্থক্যও রয়েছে। কেন্দ্র-ডানপন্থি সিডিইউ/সিএসইউ কয়লা ব্যবহারে শিথিলতার পক্ষে। আর এর বিরোধিতা করছে বামপন্থি এসপিডি।
সরকার চলতি বছরে সিদ্ধান্ত নেবে ২০৩০ সালের লিগনাইট বন্ধের লক্ষ্য বহাল থাকবে কি না। নাকি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু কেন্দ্র চালু রাখা হবে। কয়লা বন্ধের নীতিমালা নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা প্রকাশ করা হবে আগামী আগস্টে। সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ, নিরাপত্তা ও দামের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হবে। এতে বন্ধের গতি বাড়ানোর বদলে রয়েছে শিথিল হওয়ার সম্ভাবনাও।
সূত্র: বিবিসি






