অস্ট্রেলিয়ায় নারী এমপিকে দুইবার গাড়িচাপা, হারালেন এক পা

অস্ট্রেলিয়ার স্বতন্ত্র এমপি হেলেন হেইন্স। ফাইল ছবি / সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার স্বতন্ত্র এমপি হেলেন হেইন্সকে গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার পর আবার পেছনে এসে দ্বিতীয়বার চাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন হেইন্স। দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি ‘ইচ্ছাকৃত হামলা’ বলেই মনে হচ্ছে।
স্থানীয় সময় সোমবার বিকেলে ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের ওয়াঙ্গারাটায় হেইন্সের নির্বাচনী কার্যালয়ের বাইরে এ ঘটনা ঘটে। শহরটি মেলবোর্নের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত।
হেইন্সকে হেলিকপ্টারে করে মেলবোর্নের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার অস্ত্রোপচার হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (এবিসি) জানিয়েছে, চিকিৎসকেরা তার অন্য পা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটের দিকে মারফি স্ট্রিটের একটি কার্যালয়ের বাইরে সাদা রঙের টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার দিয়ে হেইন্সকে ধাক্কা দেওয়া হয়।
অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক জানিয়েছেন, চালক পরে গাড়িটি পেছনে নিয়ে হেইন্সকে দ্বিতীয়বার ধাক্কা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘চালক ইউটার্ন নিয়ে গাড়ি পার্কিং এলাকায় ঢোকেন এবং হেলেনকে একটি গাড়ির সঙ্গে চাপা দেন। এরপর গাড়িটি পেছনে নিয়ে আবারও একই কাজ করেন।’
স্থানীয় নাপিত রিকি জেফারিস জানিয়েছেন, প্রচণ্ড শব্দ শুনে তিনি ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। চালকের কাছ থেকে একটি ছুরি কেড়ে নিয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীকে থামাতে সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন এগিয়ে আসেন।
ভিক্টোরিয়া পুলিশ গাড়ির চালক ৪৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি কাছের ট্যারাউইঙ্গি শহরের বাসিন্দা।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সন্দেহভাজকের নাম ব্রেন্ডান নুজেন্ট বলে জানিয়েছে। তবে পুলিশ তার নাম নিশ্চিত করেনি। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি বন উজাড়ের বিরোধিতাসহ বিভিন্ন পরিবেশগত ইস্যুতে প্রচার চালিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, একজন পথচারী তাকে ঘটনাস্থলে আটকে রাখেন। পরে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। একটি ছুরিও জব্দ করা হয়েছে।
হেইন্স ও সন্দেহভাজক আগে থেকে একে অপরকে চিনতেন কি না, তা এখনো জানা যায়নি। হামলার উদ্দেশ্যও পরিষ্কার নয়।
মঙ্গলবার সকালে আলবানিজ বলেছেন, সন্দেহভাজক প্রথমে হেইন্সকে পাশ কাটিয়ে চলে যান। পরে ইউটার্ন নিয়ে তিনি যেখানে ছিলেন, সেখানে ফিরে এসে গাড়ি দিয়ে তাকে ধাক্কা দেন।
আলবানিজ বলেছেন, ‘এটা স্পষ্ট যে এটি ইচ্ছাকৃত কাজ।’ ঘটনাটি ‘দুর্ঘটনা’ নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তবে হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা তদন্তে বের করার চেষ্টা চলছে।
এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশও তদন্তে যুক্ত হয়েছে।
৬৫ বছর বয়সী হেইন্স ভিক্টোরিয়ার ইন্ডি আসনের স্বতন্ত্র এমপি। তিনি ভিক্টোরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি দুগ্ধ খামারে চার ভাইয়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠেন। পরে নার্স ও ধাত্রী হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন।
২৬ বছর বয়সে ভিক্টোরিয়ার চিলটার্ন বুশ নার্সিং হাসপাতালের প্রধান নার্স হন তিনি। তিন সন্তানকে বড় করা ও চাকরির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরিবারের সঙ্গে ওয়াঙ্গারাটার বাইরে একটি ছোট গবাদিপশুর খামারে বসবাস করেন তিনি।
২০১৯ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন হেইন্স। এরপর ২০২২ ও ২০২৫ সালেও পুনর্নির্বাচিত হন।
আলবানিজ হেইন্সকে ‘অত্যন্ত পরিশ্রমী’ এবং ‘অসাধারণ মেধাবী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান একজন মানুষ। পার্লামেন্টজুড়ে এবং যারা তার সংস্পর্শে এসেছেন, সবার কাছেই তিনি সম্মানিত।’
হেইন্সের এলাকার মানুষের জন্য ঘটনাটি ‘ভয়াবহ ধাক্কা’ হয়ে এসেছে বলেও জানিয়েছেন আলবানিজ।
এবিসির একটি সরাসরি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে রাজনীতিকদের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় আলবানিজকে আবেগাপ্লুত দেখা যায়। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক পরিবেশে ‘উত্তেজনা বেড়েছে’ এবং ‘আলোচনার চেয়ে চিৎকার বেশি হচ্ছে’।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক জানিয়েছেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আইনপ্রণেতাদের বিরুদ্ধে হয়রানি ও হুমকিমূলক আচরণের অভিযোগ বেড়েছে। আগের অর্থবছরে এমন ৯৫১টি ঘটনার তথ্য ছিল।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং ঘটনাটিকে ‘ভয়াবহ ও গভীরভাবে উদ্বেগজনক হামলা’ বলেছেন। ভিক্টোরিয়ার প্রিমিয়ার বেন ক্যারল বলেছেন, এই ‘সহিংস হামলায়’ তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেলরও হামলায় গভীর দুঃখ ও উদ্বেগ জানিয়েছেন।
টেলর বলেছেন, ‘এটি আমাদের দেশের জন্য ভয়াবহ একটি দিন। কাউকেই এভাবে লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।’
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমপিরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। কেউ কেউ জনসমক্ষে ছদ্মবেশ ব্যবহার, কার্যালয়ের দরজা বন্ধ রাখা এবং জনসমাগমে সম্ভাব্য হুমকির দিকে সতর্ক নজর রাখার কথাও বলেছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় রাজনীতিকদের লক্ষ্য করে সহিংসতা তুলনামূলক বিরল। ১৯৬৬ সালে লেবার নেতা আর্থার ক্যালওয়েলকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টার ঘটনাটি এর অন্যতম পুরোনো উদাহরণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও হুমকি বাড়তে থাকায় রাজনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছিলেন।
সূত্র : বিবিসি






