ফুটবলের সামগ্রিক অবক্ষয়ের ২৩ বছর

২০১৩ সাফে পাকিস্তানের বিপক্ষে হারের হতাশা নিয়ে ফিরছেন মামুনুল-জামালরা
দেশের ফুটবলে সোনালি সময়ের গল্পে শিরোপার মুকুট নেই। যখন দক্ষিণ এশীয় ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরেছে, তখন আবার রঙ হারাতে থাকে ফুটবল। বাংলাদেশ ফুটবলের উত্থান-পতনকে সাফের আয়নায় দেখার চেষ্টা করেছেন সুদীপ্ত আনন্দ। তারই তৃতীয় পর্ব আজ
২০০৩ সালে জানুয়ারির শীতের রাতটা প্রতিটি ফুটবলপ্রেমী বাংলাদেশির জন্য উপস্থিত হয়েছিল এক অনাবিল আনন্দ নিয়ে। তবে কে জানত, সেটাই হবে শেষ রাত। এরকম সাফল্য আর ফিরবে না দেশের ফুটবলে। ফিরবে না ওরকম বুনো উদযাপনের উপলক্ষ। দীর্ঘ ২৩ বছর কেটে যাবে অপেক্ষা আর না পাওয়ার আক্ষেপে। ৯টি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশকে ফিরতে হবে শূন্য হাতে।
অভিজ্ঞ কোচ মারুফুল হকের ভাষায়— ‘এই সময়ে অন্যরা এগিয়েছে। আমরা নিজেদের জায়গা থেকে অনেক পিছিয়ে গেছি। বলতে পারেন পুরো ফুটবল সিস্টেমেই আমাদের গলদ।’ তবে কি সময়ের স্রোতে পথ হারিয়েছে দেশের ফুটবল? সাফ জয়ের সেই রাতে সবার আশা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে এশিয়ার ফুটবলে পা রাখবে বাংলাদেশ। সেই আশার গুড়ে বালি। ২০০৫ সালে করাচি সাফে ফাইনালে ভারতের কাছে হারার পর দেশের ফুটবল যেন অন্ধকার পথে যাত্রা শুরু। ২০০৩ সাফে শিরোপা জয়ের পর ৯ আসরে একবার ফাইনাল ও দুবার সেমিফাইনাল খেলেছে। বাকি ছয়বার বিদায় নিয়েছে গ্রুপ পর্ব থেকে।
মারুফুল হক দীর্ঘদিন ধরে দেশের ঘরোয়া ফুটবলে কাজ করছেন। তার অধীনে বাংলাদেশ ২০১৫ সালে সাফ খেলে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল। বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে এই কোচের বিশ্লেষণ হলো, ‘আপনি খেলতে খেলতে হঠাৎ করে একসময় চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু আপনি বারবার যখন চ্যাম্পিয়ন হবেন বা চ্যাম্পিয়নের মতো খেলবেন, তখন বুঝতে হবে আপনার একটা পরিবর্তন এসেছে, উন্নতি হচ্ছে। কখনোই বাংলাদেশের ফুটবলে এই লক্ষণটা দেখিনি।’
৯ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ভারত আর সাফকে অগ্রাধিকারে রাখছে না। মালদ্বীপে লিগ হয় না, জনসংখ্যাও কম অথচ ২০১৮ সালে ঢাকায় এসে শিরোপা জিতেছে তারা। নেপাল-ভুটান-শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এখন বাংলাদেশকে জোর লড়াই করতে হয়, কখনো জেতে, কখনো হারে। দীর্ঘ সাফল্য খরায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, এখন ঘুরে না দাঁড়ালে এই ফুটবল নিয়ে গর্ব করার মতো কিছুই থাকবে না।
ফুটবলের যে পথে বাংলাদেশ হাঁটছে, তা দেখে ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে সন্দিহান অস্কার ব্রুজোন। টানা ছয় মৌসুম তিনি ছিলেন বসুন্ধরা কিংসের কোচ। এখন ইন্দোনেশিয়ার একটি ক্লাবে কোচিং করানো স্প্যানিশ ভদ্রলোকের অধীনে বাংলাদেশ ২০২১ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন তিনি, ‘আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার জন্য শুধু কোনো একজন কোচ বা খেলোয়াড় দায়ী নন। মূল সমস্যা আসলে কাঠামোগত। ঘরোয়া লিগে লড়াইয়ের মান যথেষ্ট ভালো নয়, ভালো খেলোয়াড় তৈরির সুযোগ সীমিত, দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেই এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো— বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো স্থায়ী ফুটবল পরিচয় তৈরি হয়নি।’
মারুফুলের কথাও মিলে যাচ্ছে ব্রুজোনের সঙ্গে, ‘দক্ষিণ এশিয়ার অন্যরা পরিকল্পনা করে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানিং আছে, প্লেয়ার ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানিং আছে, ছোট্ট দেশ হওয়া সত্ত্বেও নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ফুটবলে সঠিকভাবে বিনিয়োগ করছে। ফেডারেশনগুলো ভালোমানের অ্যাডেমি করছে। আর আমাদের এখানে কিছুই হয়নি। একমাত্র লিগ হয় জেনতেনভাবে। একটা করে লিগ শেষ করছি, আর তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি। অথচ লং টার্ম প্লেয়ার ডেভেলপমেন্টের কোনো জায়গায়ই তৈরি হয়নি।’
তারপরও এ দেশের মানুষ ফুটবলকে ভালোবাসেন, ফুটবলারদের বিশ্বাসের জায়গায় রাখেন। প্রতিবার সাফের আগে প্রত্যাশার বেলুন ফুলিয়ে আকাশে পৌঁছে দেন। স্বপ্ন দেখেন ২০০৩-এর পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আরেকবার দক্ষিণ এশিয়ার মসনদে বসবেন ফুটবলাররা। তবে সেই বেলুন ফুটো হতে সময় লাগে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জানে না সাফ শিরোপা জয়ের আনন্দ কী জিনিস।
৯৯ সাফ গেমস জয়ের নায়ক জুয়েল রানা এখন পরিবার নিয়ে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখান থেকেই তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমাদের সংগঠকরা কখনোই ফুটবল ও ফুটবলারদের উন্নয়নের কথা ভাবেননি। ৯৯ সাফ গেমসের সাফল্যের পর পুলপ্রথার প্রতিবাদ করে অবসর নিয়েছিলাম। এখন পুলপ্রথা নেই। তবে লিগের যে মান, মনে হয় বাংলাদেশের ফুটবল সেই ২৬ বছর আগেই পড়ে আছে। ক্লাবগুলোকে শক্তিশালী না করা হলে, জেলার ফুটবল জাগাতে না পারলে আমরা কখনো ফুটবল নিয়ে গর্ব করতে পারব না।’ এরপরও মানুষ স্বপ্ন দেখে, আরেকটা সাফ কড়া নাড়ছে দুয়ারে।



