আনন্দময় গ্লাসগো ও কমনওয়েলথ গেমসের অনিশ্চয়তা

সংগৃহীত ছবি
১১ দিন। ৬৭৪টি পদক। হাজার হাজার উচ্ছ্বসিত সমর্থক। তারপরও চার বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, এখন ভারতের আহমেদাবাদ শহর একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে?
২০৩০ সালে কমনওয়েলথ গেমসের শতবর্ষ উদযাপনের আয়োজক আহমেদাবাদ। টুর্নামেন্টটি আরও জমকালো করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়ামে সব টিকিট বিক্রি করা আর অলিম্পিক আয়োজক হিসেবে নিজেদের যোগ্যতা তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে তারা এ ইভেন্টকে ব্যবহার করতে চায়। তারপরও প্রশ্ন, ভিক্টোরিয়া যেমন আয়োজক হওয়ার পরও সরে দাঁড়িয়েছিল, আহমেদবাদও সেই পথে হাঁটবে না তো?
এমন প্রশ্নের জবাবে ইন্ডিয়ান অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী রঘু আইয়ার বলেছেন, ‘আমার মনে হয় না কেউ কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারবে।’ ২০২৬ সালের গেমসের পর্দা নামলেও, এর ভবিষ্যৎ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো আছে— রঘু আইয়ারের সতর্কবার্তা তারই প্রমাণ।
গ্লাসগোর সমাপনী অনুষ্ঠান অবশ্য হৃদয় কেড়েছে। এতে ছিল স্কটিশ ও ভারতীয় সংস্কৃতির সম্মিলন। ব্যাগপাইপ, স্কটিশ হুইসেল এবং ভারতীয় সেতারের যুগল পরিবেশনা তুলে ধরেছিল দুই আয়োজক শহরের সংযোগ। বলিউডের নাচ, সংগীত ও আলোকসজ্জায় তুলে ধরা হয় ২০৩০ সালের আয়োজক দেশের পরিচয়।
কমনওয়েলথ স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী কেটি স্যাডলেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন, আহমেদাবাদে ১৫ থেকে ১৭টি খেলা নিয়ে ‘রোমাঞ্চকর ও গতিশীল’ আসর দেখা যাবে। গুজরাটের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংঘভী দিলেন একই প্রতিশ্রিুতি, ‘আমরা ২০৩৬ সালের অলিম্পিক এবং প্যারালিম্পিক গেমস আয়োজনের স্বপ্ন দেখছি। আর এই কমনওয়েলথ গেমস হলো ভারতের প্রস্তুতি প্রমাণের একটি বড় সুযোগ।’ ১৩টি সোনাসহ ৩৯টি পদক নিয়ে এবার চার নম্বরে ছিল ভারত। নিজেদের মাটিতে সেরা তিনে উঠে আসতে মুখিয়ে থাকবে তারা।
২০২৩ সালে ভিক্টোরিয়া সরে দাঁড়ানোর পর গ্লাসগো এগিয়ে এসেছিল ত্রাতা হিসেবে। এ আসরে ৪ লাখ ৩৪ হাজার টিকিট বিক্রি ২০২২ সালের বার্মিংহামের (১৫ লাখ) তুলনায় কম হলেও, ভেন্যু ছোট হওয়ায় এটাই স্বাভাবিক। তারপরও গ্লাসগো শহর গত ১১ দিন উৎসবমুখরই ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া আয়োজক হিসেবে হাত গুটিয়ে নেওয়ার পর এ ইভেন্টটি প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছিল। তবে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি খনি ব্যবসায়ী জিনা রাইনহার্ট তার দেশের পদকজয়ীদের জন্য নগদ পুরস্কারের ঘোষণা দেন। এজন্য অস্ট্রেলিয়া শক্তিশালী দল পাঠায় আর ৭০টি সোনাসহ জেতে সর্বোচ্চ ১৭১ পদক। তাই অনেকের আফসোস, রাইনহার্ট কি আরেকটু আগে এগিয়ে আসতে পারতেন না?
গ্লাসগো শেষ রক্ষা করেছে। কিছু আসন খালি থাকলেও বড় ইভেন্টগুলোর টিকিট সব বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এ গেমসের রূপরেখা কম টাকায় নতুন করে সাজানো হয়েছিল। গ্লাসগোর আয়োজকরা হাসিমুখেই নিজেদের বাজেট অনুযায়ী নিখুঁতভাবে সব সামলে নিয়েছেন।
সমর্থকদের জন্য রোমাঞ্চের অভাব ছিল না। স্কটসটোনে জশ কারের জন্মভূমিতে সোনা জয়, সুইমিং পুলে অঙ্গারাদ ইভান্সের পারফরম্যান্স বা স্যার ক্রিস হোয়াই ভেলোড্রোমে ফিরেই নীল ফ্যাচির আবেগী জয়।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জ্যামাইকার নেটবল দলের ঐতিহাসিক জয়ও গ্যালারির মানুষকে মাতিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এর মধ্যেও প্রশ্ন, গ্যালারির বাইরে থেকে কি টেলিভিশনে আদৌ কেউ এটি দেখছেন?
আয়োজকরা অবশ্য জানিয়েছেন, প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে তাদের সোশ্যাল মিডিয়া ভিউ বার্মিংহামের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে ফ্রি-টু-এয়ার টিভিতে রেকর্ড মানুষ সম্প্রচার দেখেছেন। তারপরও বিশ্বব্যাপী ফুটবল বিশ্বকাপের মতো ব্যাপক সম্প্রচার না থাকায় এ গেমস নীরবেই কেটে গেছে একপ্রকার।
অ্যাথলেটিকসে কিলি হজকিনসন, কাতারিনা জনসন-থম্পসন এবং দিনা অ্যাশার-স্মিথের মতো বড় বড় তারকার অনুপস্থিতি গ্লাসগোর উত্তাপ কমিয়ে দিয়েছিল। বেশিরভাগ খেলার জন্যই এটা পরের বড় আসরের প্রস্তুতি মাত্র।
অনেক আলোচনাতেই তাই শুধু ছিল ‘আগামী প্রজন্ম’। ১৮ বছর বয়সী জার্সির সাঁতারু ফিলিপ নোয়াটকি হয়তো এ আসর থেকে উঠে আসা সবচেয়ে রোমাঞ্চকর নাম। প্যারিস অলিম্পিকে তিনটি সোনা জেতা সাইক্লিস্ট এমা ফিনুকেন গ্লাসগোতে জেতেন চারটি সোনা। তাদের সবার চোখ এখন ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে। কিন্তু কমনওয়েলথ গেমসের ভবিষ্যতের জন্য এই সবকিছুর অর্থ কী?
২০৩০ সালের আহমেদাবাদ আসর অক্টোবরে পিছিয়ে নেওয়ায় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের সঙ্গে সূচির সংঘাত ঘটবে না। তবে এটি খেলোয়াড়দের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর মৌসুমকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। তাতে নাম প্রত্যাহার করে নিতে পারেন অনেকে।
তারপরও ৭৪টি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের হাজার হাজার অ্যাথলেট এ মঞ্চে আসতে চান এখনো। ২১৬টি সোনার মধ্যে ৭০টি জেতা অস্ট্রেলিয়ার ৫০০০ মিটার দৌড়বিদ রোজ ডেভিস যেমন বলেছেন, ‘ছোট থেকেই আমি কমনওয়েলথ গেমসের দিকে চেয়ে থাকতাম আর এখানে অংশ নিতে চাইতাম। এটি আমাদের গড়ে ওঠার একটি বড় অংশ।’
একইভাবে, টুভালুর হয়ে ইতিহাসের প্রথম কমনওয়েলথ পদক জেতা তারোনা তাফাকি বলেছেন, ‘এর অর্থ একটি নতুন সূচনা হলো। ভবিষ্যতে টুভালু কোথায় পৌঁছাতে পারে, এটি তার কেবল শুরু।’
এ অদম্য ইচ্ছা বজায় থাকলেই শুধু কমনওয়েলথ গেমসের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা বেঁচে থাকবে।
পদক তালিকা (সেরা ৫)
দেশ সোনা রুপা ব্রোঞ্জ মোট
অস্ট্রেলিয়া ৭০ ৪৫ ৫৬ ১৭১
ইংল্যান্ড ২৯ ৪৫ ৩৬ ১১০
কানাডা ১৯ ২০ ২৩ ৬২
ভারত ১৩ ১৭ ৯ ৩৯
স্কটল্যান্ড ১৩ ৯ ১৭ ৩৯





