খেলায় সম্প্রীতি-৪
ক্যাম্পের অপরাধপ্রবণতা কমেছে খেলার প্রসারে
- আগস্টে পূর্ণ হলো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢল নামার ৯ বছর। নানা অপরাধে জড়িয়ে রোহিঙ্গারা হুমকি হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনগণের জন্য। তবে খেলাধুলার মাধ্যমে সম্প্রীতি বাড়ছে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের। এ নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিকের চতুর্থ পর্ব আজ। কক্সবাজার ঘুরে এসে লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

বছর জুড়েই ‘চিনলোন’ খেলার উৎসবে মেতে থাকেন রোহিঙ্গারা। ছবি: আগামীর সময়
সিনথেটিকের বল নিয়ে ৪ নম্বর ক্যাম্পে ব্যাডমিন্টন আকৃতির ছোট্ট মাঠে জনা পঞ্চাশেক রোহিঙ্গার জটলা। তারা মেতে আছে নেট ভলিবল বা কিক ভলিবলের মতো একটি খেলায়। মিয়ানমার জুড়ে জনপ্রিয় খেলাটার নাম ‘চিনলোন’। আধুনিক হয়ে সেটাই এখন সেপাক টাকরো। এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমসের মতো আসরেও জায়গা পেয়েছে এটা।
রোহিঙ্গাদের তো আর এসব গেমসে যাওয়ার উপায় নেই। দিনভর ছোট্ট ঘরে বদ্ধ না থেকে তারা বিনোদন খুঁজে নেয় এ খেলার নিজস্ব রূপ ‘চেলুং’-এ। ক্লান্ত হয়ে কোর্ট থেকে ফেরা রাসেল মিয়া খেলাটা নিয়ে আগামীর সময়কে বললেন, ‘ওপারে থাকতে এ খেলাটা খেলতাম। জীবন হাতে নিয়ে বাংলাদেশে এসে এভাবে খেলতে পারব কখনো কল্পনাও করিনি। এ দেশের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন (আরআরআরসি) পর্যন্ত আগ্রহী খেলাটা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। কারণ ৩৪টি ক্যাম্পের ছোট জায়গায় একসঙ্গে অনেকের বসবাস। তাদের মধ্যে কিশোর আর যুবকই বেশি। এজন্য দ্বন্দ্ব-সংঘাত হওয়া স্বাভাবিক। ক্যাম্পে বাড়তে থাকা অপরাধপ্রবণতা আর স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা আতঙ্ক দূর করতে চিনলোন, সেপাক টাকরো বা চেলুংকে কাজে লাগানোর কথা জানালেন ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (উপসচিব) মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা, ‘নিজেদের প্রিয় খেলাটা খেললে অন্তত অপরাধ থেকে দূরে থাকবে উঠতি বয়সীরা। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর জোর চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার, কিন্তু একজনকেও পাঠানো যায়নি। যতদিন ওরা এখানে থাকে ততদিন আমরা চাইব ওরা যেন অপরাধী না হয়ে ওঠে।’
আয়োজন হচ্ছে চিনলোন টুর্নামেন্ট
হত্যা, অপহরণ, মাদকের মতো ভয়াল অপরাধ জগৎকে পাস কাটিয়ে শিক্ষা, খেলাধুলা ও বিনোদনে নিজেদের পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করছে রোহিঙ্গাদের বড় একটা দল। তাদের সাহায্য করছে স্থানীয় ক্যাম্প প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থা।
এরই অংশ হিসেবে বছর জুড়েই ‘চিনলোন’ খেলার উৎসবে মেতে থাকেন রোহিঙ্গারা। চিনলোনের জন্য বড় মাঠের প্রয়োজন নেই। নির্দিষ্ট উচ্চতার নেটের দুই প্রান্তে তিনজন করে খেলোয়াড় থাকেন। বাঁশ বেতের তৈরি গোলাকার হালকা বল নিয়ে পায়ে ও হেডে (মাথা দিয়ে) খেলাটি চলে। কোনো খেলোয়াড় হাত দিয়ে বল ছুঁতে পারেন না। জয়ী হয় আগে ১৫ পয়েন্ট পাওয়া দল।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে শরণার্থী জীবন শুরুর পর বিভিন্ন ক্যাম্পে চিনলোন খেলত রোহিঙ্গারা। তবে টুর্নামেন্ট আয়োজনের উপায় ছিল না। ২০২৪ সালে দূর হয়েছে সেই আক্ষেপও। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ‘চিনলোন’ টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। প্রথম আসর সফল হওয়ায় ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হয়েছিল আন্তঃক্যাম্প চিনলোন টুর্নামেন্ট।
এ বছর উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বলিবাজার মাঠে ‘চিনলোন’ টুর্নামেন্টের আয়োজন করে ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধীন পানবাজার এপিবিএন ক্যাম্প। এতে অংশ নিয়েছে ৮, ৯ ও ১০ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১২টি দল।
উখিয়ার ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধিনায়ক মো. আমির জাফর বলেছেন, ‘আমরা চিনলোন টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছি মাদককে না বলতে। রোহিঙ্গা যুবকরা খেলায় সম্পৃক্ত থাকলে তারা অপরাধ থেকে দূরে থাকবে। তাদের শরীর-মন ভালো থাকবে, ক্যাম্পের শৃঙ্খলা স্বাভাবিক থাকবে। এ ধরনের আয়োজনে সবসময় তাদের পাশে থাকবে এপিবিএন।’
চালু হয়েছে আরও কিছু খেলা
যেকোনো জাতির মতো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীরও নিজস্ব কিছু খেলাধুলা ও ক্রীড়া সংস্কৃতি রয়েছে। এর অন্যতম ‘বলীখেলা’ যা রোহিঙ্গাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ইতিহাস বলে, বার্মার স্বাধীনতার জন্য জাপানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের সময় অনেক রোহিঙ্গা বলী (কুস্তিগীর) যৌথবাহিনীকে সহায়তা করেছিলেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও প্রায় অনুষ্ঠিত হয় এই বলীখেলা।
ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গারা আরও খেলেন কুঁদা (বড় গোল পাথর দিয়ে ভারোত্তোলন), দান (ক্রিকেটের মতোই একটি খেলা), মলফাত (অনেকটা দাবার মতো), বসগ্যা বুড়ি (বস্তা লাফ), সউস সা রানি (কাদায় পিছলে যাওয়া), রসি ফাল দোনি (দড়ি লাফ) ও গিলা (শিমের বিচি ছুড়ে মারার খেলা)। তাদের এসব খেলাও ছড়িয়ে পড়ছে উখিয়ার গ্রামগুলোতে। উখিয়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক, আব্দুল্লাহ আল মামুন শাহীন বললেন, ‘রোহিঙ্গারা ফুটবল খেলতে স্থানীয় মাঠগুলোতে এলে সঙ্গে আসেন প্রচুর দর্শক। তাদের কাছ থেকেই রোহিঙ্গাদের খেলাগুলো শিখছে স্থানীয়রা। এতে যেমন সম্প্রীতি বাড়ছে তেমনি শান্তিও বজায় থাকছে এলাকায়।’
দিনে খেলা রাতে পাহারা
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অভিযান চালিয়ে প্রায়ই বিদেশি ভারী অস্ত্র উদ্ধার করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) দলগুলো। রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহসহ আরও কয়েকজন খুন হওয়ার পর ক্যাম্পে বিদেশি অস্ত্র পাওয়াটা অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ৮ এপিবিএনের কমান্ডিং অফিসার (পুলিশ সুপার) মোহাম্মদ সিহাব কায়সার খান বললেন, ‘এখন রাতে প্রায় চার হাজার স্বেচ্ছাসেবক ক্যাম্পের বিভিন্ন পয়েন্টে পাহারা দেয়। তাই আগে যখন একটি অভিযানেই তিন লাখ ইয়াবা পাওয়া যেত, এখন সেখানে পাওয়া যায় মাত্র ৩০০-৫০০ ইয়াবা।’
হালিম, জিকরুল, কামরুলদের মতো পাহারা দেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের অনেকে দিনে খেলেন ফুটবল, সেপাক টাকরো, ভলিবলের মতো খেলাগুলো। আর রাতে দেন পাহারা। তাতে কমেছে ক্যাম্পের অপরাধপ্রবণতা।
টেকনাফ বিশেষ জোন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানও সে কথা বলছে। ২০২১ সালে রোহিঙ্গাদের মাদক মামলা ছিল ১২টি, আসামি ১৪ জন আর ইয়াবা জব্দ হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজারটি। ২০২২ সালে মামলা কমে হয় ৫টি, আসামি ৭ জন আর ইয়াবা জব্দ ৩৬ হাজারটি। ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৩টি, আসামি ৪ জন আর ইয়া জব্দ হয়েছে ১২ হাজারটি।
এজন্য কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানালেন শুভকামনা, ‘খেলাধুলার মাধ্যমে অপরাধ থেকে দূরে থাকা সম্ভব। রোহিঙ্গা শিবিরে খেলার প্রসারে শুভকামনা রইল।’
শেষ চাওয়া
২০১৭ সাল থেকে ঢল নামলেও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে নব্বইয়ের দশক থেকে। কিন্তু দেশে ফিরে যাচ্ছেন না কেউই। ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ পবিত্র রমজান মাসে তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজারের উখিয়ায় প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সঙ্গে ইফতার করেন। সেখানেই মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা যেন আগামী বছর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে জাতিসংঘের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছি।’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বদলে উল্টো যোগ হয়েছে আরও কয়েক হাজার!
১৯৯২ সাল থেকে কুতুপালং শিবিরে থাকা হেলাল উদ্দিন এসব দেখে হতাশ। এএফসি ও বাফুফে যে ৭৫ জন কোচকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, হেলাল তাদের টিম লিডার। ক্যাম্পে দেখা হওয়ার পর তার আকুতি, ‘খেলাধুলার মাধ্যমে বিনোদনের ব্যবস্থা করায় বাংলাদেশিদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তবে অনেক হলো, এবার দেশে ফিরতে চাই। কবে ফিরব আমরা?’
হেলালের মতো সবার একটাই প্রশ্ন, রোহিঙ্গারা ফিরবে কবে?






