এশিয়াডের ছোঁয়া খুব একটা লাগেনি নাগোয়ায়

সেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ততা বাড়ছে ধীরে ধীরে
“ইমাজিন ওয়ান এশিয়া”– নাগোয়া টার্মিনালে বাস থামতেই নজর কাড়ে বড় লেখাটা। এই স্লোগানকে সামনে রেখে আজ বাদে কাল পর্দা উঠবে ২০তম এশিয়ান গেমসের। স্টেশনের প্রবেশ করতেই নীল পোশাক পড়া একদল বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হাতে নানান রঙ-এর প্লেকার্ড উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। এশিয়ান গেমসের অভ্যাগতদের বরণ করে নেওয়াই তাদের দায়িত্ব। তাদের চোখজোড়া খুঁজে ফিরছে অ্যাথলেট, অফিসিয়াল, নানা খেলা পরিচালনাকারী, ম্যাচ অফিসিয়াল ও মিডিয়াকর্মীদের। নিজ নিজ দায়িত্ব শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে করতে পারাতেই তাদের আনন্দ। ভাষাগত সমস্যা আছে, তারপরও সেই অান্তরিকতায় কমতি নেই। যদিও নাগোয়া শহর পথে-ঘাটে বোঝার উপায় নেই আর দু’দিন বাদে এ শহরে পর্দা উঠবে এশিয়ান গেমসের। প্রচার বাড়াবাড়ি নেই একেবারেই। নাগোয়াবাসীর গেমস নিয়ে আগ্রহর মাত্রাটাও বোঝা গেলো না।
বিশ্বের সবচেয়ে সভ্য ও সুশৃঙ্খল জাতি বলা হয় জাপানিদের। এর পেছনে আছে তাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামাজিক মূল্যবোধের গভীর ভূমিকা। তারা আইনের প্রতি ভীষণভাবে শ্রদ্ধাশীল। সামাজিক নিয়ম-আচার পালনে কঠোর। সময় সচেতনতার জন্যও জাপানিদের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। শোনা যায়, জাপানের বিশ্বখ্যাত বুলেট ট্রেন শিনকানসেনের বছরে মাত্র কয়েক সেকেন্ড দেরিতে চলার রেকর্ড আছে। কোনো কারণে সামান্য বিলম্ব হলে তারা যাত্রী সাধারণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
নাগোয়ার বিখ্যাত বন্দর পোর্ট মেসেতে অবস্থিত বিশাল মেইন মিডিয়া সেন্টার। বিশাল টোকাই সেতু পাড় হয়ে সেখানে পৌঁছাতেই অতি আগ্রহী এক ঝাঁক সেচ্ছাসেবকের দেখা মিলল। জাপানিদের গড় আয়ু অনেক বেশি। সম্প্রতি এক জরিপে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা লাখ ছাড়ানোর কথা জানা গেছে জাপানে। বয়সকে সংখ্যায় রূপ দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করাটা তাদের অভ্যাস। এমনই একজন বৃদ্ধা মেইন মিডিয়া সেন্টারে কাজ করছেন লকার বিভাগ। বিশাল হলের চারপাশে শত শত লকার সারি করে দাঁড় করানো। পছন্দসই একটা লকার তার কাছে চাইতেই সেই বৃদ্ধা ছুটলেন সেখানে। ত্বরিত সেটা দেখে এসে জানালেন, লকারটা ফাঁকা আছে- ‘আপনার পছন্দের লকারটা আমি নিজে পরিষ্কার করে রেখে এসেছি। এই পরীক্ষার সময়টা আপনাকে অপেক্ষা করতে হওয়ায় ক্ষমাপ্রার্থী।’
এমন ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তার সম্পর্কে জানতে চাইলে জানালেন, তিনি নাগানো শহর থেকে এসেছেন ভলেন্টিয়ার হতে। ৪০ হাজার ভলেন্টিয়ার বাছাইয়ের কঠিন প্রক্রিয়া পেরিয়ে এসে তিনি সুযোগ পেয়েছেন এশিয়ান গেমসে মিশে যেতে। খেলাধুলার প্রতি টানটা ছোটোবেলা থেকেই। যে কারণে সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাননি। ২০২১ সালে টোকিও অলিম্পিকেও সেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। সেবারই অভিজ্ঞতাই তাকে ফের এই কাজে ফিরে আসতে অনুপ্রাণিত করেছে। ৭৭ বছরের সেই নারী জানালেন, ‘অলিম্পিক গেমসে কাজ করতে গিয়ে সবার মাঝে যে ভ্রাতৃত্ববোধ দেখেছিলাম, তাতে আমি অভিভূত ছিলাম। এবারও যখন সুযোগটা আসলো, লুফে নিয়েছি। এখন তো খুব বেশি কাজ করতে পারি না। এখানে কাজের সুযোগ পেয়ে ভালো লাগছে। এই গেমসটা সফল করার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের। এতে দেশেরই সম্মান বৃদ্ধি পায়।'
এরকম আরও অনেকেই আগামী দুই সপ্তাহ ব্যস্ত থাকবেন নানারকম কাজ নিয়ে। তবে তাদের মাঝে একটা আক্ষেপও আছে। মেইন মিডিয়া সেন্টারের পাশে জিমন্যাস্টিকস ট্রেনিং সেন্টারে এক ষাটোর্ধ্ব সেচ্ছাসেবক কামেকো ইউকিহিরো হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘ধীরে ধীরে আমরাও জানি কেমন হয়ে যাচ্ছি। মেট্রো বা বাসে চড়লে দেখবেন, সবাই কতটা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। সারাক্ষণ তাদের চোখ মোবাইলের স্ক্রিনে। আধুনিক বিশ্বে অবশ্যই ডিভাইসের প্রয়োজন আছে। তবে ডিভাইস মাঝে মাঝে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে। এটা ভবিষ্যতের জন্য মোটেই ভালো নয়। ডিভাইসের কারণে তো এখন আগের মতো খেলাধুলাও করতে দেখা যায় না ছোট ছোট বাচ্চাদের।’
জাপানের মতো দেশ ডিভাইসের নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। তবে ঠিকই তারা একটা বিকল্প পথ বের করে ফেললে এই কড়াল গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে। অলিম্পিক, এশিয়ান গেমসের মতো বহুজাতিক খেলাধুলার আসর আয়োজন মোবাইলের ঝলমলে দুনিয়া থেকে সবুর প্রান্তরে যুবসমাজকে ফিরিয়ে আনার বড় পদক্ষেপ।



