খেলায় সম্প্রীতি-২
রোহিঙ্গাদের বিশ্বকাপ আনন্দ
- আগস্টে পূর্ণ হলো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢল নামার ৯ বছর। নানা অপরাধে জড়িয়ে রোহিঙ্গারা হুমকি হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনগণের জন্য। তবে খেলাধুলার মাধ্যমে সম্প্রীতি বাড়ছে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের। এ নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব আজ। কক্সবাজার ঘুরে এসে লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখছে রোহিঙ্গা শিশুরা। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ ফুটবলের আনন্দে মেতেছিল পুরো বিশ্ব। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো তাহলে বাদ পড়বে কেন? বেসরকারি সংস্থা ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর ‘স্পোর্টস ক্লাব’ ব্যবস্থা করেছিল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিশ্বকাপ ফুটবল প্রদর্শনের। তবে বাংলাদেশের শহর কিংবা গ্রামে টেলিভিশন বা প্রজেক্টার লাগিয়ে যেভাবে খেলা দেখা হতো— রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সেটা করা যায়নি।
দেখানো হত রেকর্ড করা ম্যাচ
নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ দেখিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সরাসরি বিশ্বকাপের ম্যাচ সম্প্রচারের অনুমতি দেয়নি। তাই রেকর্ড করে ম্যাচগুলো দেখানো হতো পরদিন। সেই রেকর্ড করা ম্যাচও আগ্রহ নিয়ে দেখেছে হাজারো রোহিঙ্গা।
স্পোর্টস ক্লাব পরিচালনা করা বেসরকারি সংস্থা ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর সিনিয়র সমন্বয়কারী মোল্লা শিহাব উদ্দিন এ নিয়ে বলেছেন, ‘৬ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুরাই ম্যাচ দেখতে বেশি সেন্টারে এসেছিল। আর দর্শকদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ছিল মেয়েশিশু। ১৯ নম্বর ক্যাম্পে বড় টেলিভিশন স্ক্রিনসহ একটি ভিউয়িং হল রয়েছে, যেখানে আমরা রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছিলাম। আমরা সব ফিফা বিশ্বকাপ ম্যাচ রেকর্ড করে রাখতাম আর পরদিন সকালে সেটা স্ক্রিনে দেখাতাম।’
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘুরে বেড়ানো একটি ‘মোবাইল স্পোর্টস লাইব্রেরি’ থেকে নিজেদের প্রিয় দলের জার্সি বিশ্বকাপের সময় পেত শিশু-কিশোররা। সেই জার্সি পরেই খেলা দেখত তারা।
১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজার জেলার ৩৪টি ক্যাম্পে গাদাগাদি করে থাকছে। সেখানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা তাদের মেধা ও দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করতে পারে এমন কার্যক্রম সীমিত। বঞ্চনার এমন প্রেক্ষাপটে, ক্যাম্প ১৯-এর ক্লাবটি সেসব শিশুকে সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে যারা খেলাধুলা চালিয়ে যেতে চায়।
উৎসাহি মেয়েরাও
বিশ্ব জুড়ে শরণার্থীশিবিরগুলোতে খেলাধুলার প্রসারে কাজ করা ডাচ সংস্থা ‘ক্লাবু’র সহযোগিতায় চালু হয়েছিল এটি। এ প্রকল্পের মূল অর্থায়ন এসেছিল ফরাসি ফুটবল ক্লাব পিএসজি থেকে। এ ক্লাবে এখন ১ হাজার ৬০০ রোহিঙ্গা শিশু নিয়মিত সদস্য হিসেবে নিবন্ধিত, যার ৬০০ জনই মেয়েশিশু। ফুটবলের পাশাপাশি তারা ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল খেলারও সুযোগ পায়। এ নিয়ে মোল্লা শিহাব উদ্দিন বললেন, ‘বেশিরভাগ মেয়েশিশুই সপ্তাহে অন্তত একবার ক্লাবে আসে। এসব শরণার্থীশিবিরে মেয়েদেরও খেলাধুলার জন্য এগিয়ে আসতে দেখাটা দারুণ। শিশুদের পাশাপাশি কিশোররাও খেলছে বিভিন্ন ক্যাম্পে। তারা কক্সবাজারের স্থানীয়দের সঙ্গেও খেলে, যা সম্প্রীতি ধরে রাখতে দারুণ একটা উদ্যোগ।’
তিনি আরও যোগ করেছেন, ‘রোহিঙ্গা তরুণরা আশাহীন এক জীবনযাপন করছে, এ বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। তাদের প্রত্যাবাসনও অনিশ্চিত। তাদের আত্মিক শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে খেলাধুলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
ক্লাবু, পিএসজি ও বাংলাদেশের স্বনামধন্য এনজিও ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর যৌথ উদ্যোগে গড়া ১৯ নম্বর ক্যাম্পে পাহাড়ের চূড়ায় ক্লাবহাউজটি অনন্য এক স্থাপনা। সেখানে খেলার মাঠ, স্পোর্টস লাইব্রেরি আর রোহিঙ্গা শিশুদের খেলাধুলা, শিক্ষা, যোগাযোগের নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ অসাধারণ। এখন পুরো প্রকল্পটি দেখভাল করছে ফ্রেন্ডশিপ। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ গাড়ি কক্সবাজারের স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাতায়াত করে অনন্য সম্পর্কের সেতু হিসেবে কাজ করছে। কক্সবাজারের স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোতে যাওয়া কিংবা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আঁকাবাঁকা পথ অতিক্রম করা— যেকোনো জায়গায় রঙিন ও সম্ভাবনাময় এ গাড়ি সবার নজর কাড়ে।
এটি খেলার সরঞ্জাম নিয়ে যায়, ম্যাচ দেখায় আর পুরো অঞ্চলের শিশুদের জন্য প্রশিক্ষণ সেশনের আয়োজন করে। ১৯ নম্বর ক্যাম্পের মূল ক্লাব সেন্টার থেকে যারা দূরে থাকেন, তাদের কাছে খেলাধুলার জন্য এটিই ভরসা। অনেক মেয়ের জন্য এটিই প্রথম মাঠে নামার সুযোগ।
মাসে গড়ে ৮ হাজার ৫০০-এরও বেশি শিশুর অংশগ্রহণ
যেখানেই এই গাড়ি যায়, সেখানেই নিশ্চিত করে যেন প্রতিটি শিশু-স্থানীয় বা শরণার্থী, ছেলে বা মেয়ে খেলতে পারে, মন খুলে শ্বাস নিতে পারে আর নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারে।
শিশুদের অদম্য উদ্দীপনা উদযাপন করতে ২০২৩ সালের আন্তর্জাতিক শিশু দিবসে ‘কক্সবাজার স্পিরিট শার্ট’ চালু করা হয়েছিল। শিবিরের ভেতরের ও বাইরের খেলোয়াড়দের এক করতেই ডিজাইন করা হয় এটি। এ প্রকল্পে প্রতি মাসে গড়ে ৮ হাজার ৫০০-এরও বেশি শিশুর অংশগ্রহণ নথিভুক্ত হয়েছিল। ক্লাব সেন্টারে আসা শিশুদের প্রায় অর্ধেকই ছিল কমবয়সী মেয়ে। সমাজের সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তারা কক্সবাজারের খেলার মাঠে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছে।
স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোর একটি বালিকা দল এ কর্মসূচির অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়ে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে জেলা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে! দলটির অন্যতম সেরা খেলোয়াড় সঞ্চিতা বড়ুয়া নিজের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এখন রেফারি হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার পথে।
রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাংলাদেশি উৎসাহী কোচদের সরাসরি যুক্ত করা হয়েছিল এ প্রকল্পে, তাদের অনেকে ফ্রেন্ডশিপের মাধ্যমে চাকরিও করছেন কক্সবাজারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। এ নিয়ে ফ্রেন্ডশিপের সিনিয়র সমন্বয়কারী মোল্লা শিহাব উদ্দিন বললেন, ‘খেলাধুলাই পারে শিশু-কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে। রোহিঙ্গা আর স্থানীয়দের মেলবন্ধনেও ভূমিকা রাখতে পারে খেলাধুলা। আমরা সে চেষ্টাটাই করছি। এবার বিশ্বকাপ ফুটবল রেকর্ড করে দেখিয়েছে রোহিঙ্গা শিবিরে। ভবিষ্যতে অন্য খেলাও দেখানো হবে তাদের।’






