খেলায় সম্প্রীতি-৩
বিশ্বকাপজয়ী ওজিলের সঙ্গে আনন্দময় দিন
- আগস্টে পূর্ণ হলো রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢল নামার ৯ বছর। নানা অপরাধে জড়িয়ে রোহিঙ্গারা হুমকি হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনগণের জন্য। তবে খেলাধুলার মাধ্যমে সম্প্রীতি বাড়ছে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের। এ নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্ব আজ। কক্সবাজার ঘুরে এসে লিখেছেন রাহেনুর ইসলাম

৪ নম্বর ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ফুটবল খেলছেন ওজিল। ছবি: সংগৃহীত
সময় পেলেই ফুটবল নিয়ে মেতে থাকে তারা। কারও কারও চোখে বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। তাই বলে বিশ্বকাপজয়ী কোনো ফুটবলার সরাসরি দেখা করতে আসবেন— এমন কিছু কল্পনার বাইরে ছিল রোহিঙ্গাদের। সেই স্বপ্নই বাস্তব হয়েছিল এ বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি। সেদিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসেছিলেন জার্মানির হয়ে ২০১৪ বিশ্বকাপ জেতা মেসুত ওজিল। কয়েকটি ক্যাম্প পরিদর্শনের পাশাপাশি ওজিল খেলেন প্রদর্শনী ফুটবল। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে করেন ইফতারও।
এসেছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্টের ছেলের সঙ্গে
তুরস্ক সরকারের সহযোগী সংস্থা ‘টার্কিশ কো-অপারেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন এজেন্সির’ (টিকা) একটি প্রকল্পের অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মুর্তজা মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়নের কাজ চলছিল তখন। এই প্রকল্পে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সহায়তা দিয়েছে তুর্কি সরকার। প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ছেলে নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান। তার সফরসঙ্গী হয়ে এসেছিলেন রিয়াল মাদ্রিদ ও আর্সেনালের মতো ক্লাবে খেলা জার্মান সাবেক মিডফিল্ডার মেসুত ওজিল।
১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকতা সেরে পরদিন তারা যান কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে তুরস্ক সরকারে অর্থায়নের ৯টি স্কুল চালু রয়েছে। দাতাগোষ্ঠীর অর্থসহায়তা বন্ধ থাকায় কয়েক মাস ধরে উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে অন্তত দুই হাজার লার্নিং সেন্টার (শিশুশিক্ষাকেন্দ্র) বন্ধ হয়ে গেছে। জাতিসংঘের ইউনিসেফের অর্থায়নে চালু আছে দুই হাজারের বেশি শিক্ষাকেন্দ্র। তুরস্ক সরকারের অর্থায়নে আরও কয়েকটি স্কুল চালু করার ঘোষণা দিয়েছিলেন নেকমোদ্দিন বিলাল এরদোয়ান।
ফুটবল খেলেছেন ওজিল
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার শুরুর দিকে ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা নিয়ে ছিল কড়াকড়ি। সেটা এখন অনেকটাই ঢিলেঢালা। বিশ্বকাপজয়ী মেসুত ওজিল আসায় ক্যাম্পগুলোতে বাড়ানো হয় নিরাপত্তা। তাই স্থানীয়রা চাইলেও আসতে পারেননি ওজিলকে এক নজর দেখতে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানও ছিলেন ওজিলের সঙ্গে।
কক্সবাজার সফরে প্রতিনিধিদলটি স্থানীয় শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে সমন্বয় সভায় অংশ নিয়েছিলেন। এরপর তারা পরিদর্শন করেন উখিয়ার ৪, ৫, ৯, ১৬ ও ১৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প। বিকালে মেসুত ওজিল প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নেন ৪ নম্বর ক্যাম্পে।
সেই ম্যাচ খেলা তরুণ ইয়াসিন আলী স্মৃতিচারণা করলেন এভাবে, ‘বিশ্বকাপ জিতলেও ওজিলের মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। তিনি সাধারণ মানুষের মতো খেলেছেন আমাদের সঙ্গে। আমাকে তো ফ্রিকিক নেওয়ার একটা টিপসও দিয়েছেন। তার সঙ্গে খেলাটা স্বপ্নপূরণের মতো। আমরা যে কক্সবাজারের স্থানীয়দের সঙ্গেও ফুটবল খেলি, এটা জেনে খুশি হয়েছেন তিনি। আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন মাদক থেকে দূরে থাকার।’
ম্যাচ শেষে ঘুমধুম ইয়াহিয়া গার্ডেনের টিকা কিচেন সেন্টারে ইফতার করে ফিরে যান ওজিল। তারকা এই ফুটবলারকে পেয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিত ছিলেন রোহিঙ্গা তরুণরা। তাদের সঙ্গে হাসিমুখে সেলফি তুলেছিলেন ওজিল। নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে অবশ্য দূর থেকেই ওজিলকে একনজর দেখতে হয়েছে অনেককে।
এ নিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে এখন। ১৪ লাখ রোহিঙ্গার খাদ্যসহায়তাও কমে যাচ্ছে। তহবিল সংকটে রোহিঙ্গা শিশুদের স্কুলগুলো বন্ধ। রোহিঙ্গা মেয়েশিশুরা আছে পাচারের ঝুঁকিতে। এমন সময়ে মেসুত ওজিলের ক্যাম্প পরিদর্শন করাটা হাসি ফুটিয়েছে রোহিঙ্গাদের মুখে। এমন ছোট ছোট আনন্দময় মুহূর্তও বিশেষ কিছু তাদের জন্য।’
‘মাদককে না বলুন, ক্রীড়াকে হ্যাঁ বলুন’
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে মাদকের বিস্তার বাড়ছে দিন দিন। সেখানকার তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। এজন্য ক্যাম্পে বেড়েছে নানা অপরাধ। তরুণদের মাদকমুক্ত রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হয় মিয়ানমারের জাতীয় খেলা চিনলোন এবং ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের।
উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮-এপিবিএনের উদ্যোগে ‘মাদককে না বলুন, ক্রীড়াকে হ্যাঁ বলুন’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে নেওয়া হয় এমন উদ্যোগ। এর আগে আরআরআরসির তত্ত্বাবধানে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১২টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ফুটবল টুর্নামেন্ট। কোনো কোনো ম্যাচে দর্শক থাকত ৩০ হাজারের বেশি। খেলা উপভোগ করতে আসতেন উখিয়ার স্থানীয়রাও।
৮-এপিবিএনের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আমির জাফর বললেন, ‘খেলাধুলা শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটায়। তাই ক্যাম্পে যুবসমাজকে খেলাধুলার মাধ্যমে মাদক থেকে বিরত থাকার উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পে তরুণরা যাতে মাদক থেকে দূরে থাকে, সেজন্য এই খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও বাড়িয়ে দিয়েছেন সহায়তার হাত। এটা ইতিবাচক। আর মেসুত ওজিল আসার পর তো রোহিঙ্গাদের ফুটবল নিয়ে উৎসাহ বেড়েছে কয়েকগুণ।’






