‘চ্যাম্পিয়নদের অভিশাপ’ তত্ত্বের ইতি

বিশ্বকাপ জয় করা কার না স্বপ্ন। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি জিততে খেলোয়াড়দের কত পরিশ্রমই না করতে হয়। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি লিওনেল মেসিকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ নাকি একটি বিশ্বকাপ, তিনি বিনা দ্বিধায় বলে দিয়েছিলেন একটি বিশ্বকাপ। তার এই উত্তরেই বোঝা যায় কিংবদন্তি থেকে তরুণ খেলোয়াড় সবার মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বকাপ। কিন্তু যদি বলা হয়, বিশ্বকাপ জয়ই কখনো কখনো হয়ে ওঠে অভিশাপ? অবাক হওয়ার মতোই কথা। কিন্তু এই শতাব্দীর চ্যাম্পিয়ন দলগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
বিশ্বকাপের বিগত কিছু আসরে একটি কথা খুব প্রচলিত হচ্ছে— ‘চ্যাম্পিয়নস কার্স’ বা চ্যাম্পিয়নদের অভিশাপ। এ কথাটি মোটেই অযৌক্তিক নয়। বরং দেখা গিয়েছে যে, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকেই দলগুলোর অধঃপতন শুরু। এ তালিকায় রয়েছে ব্রাজিল, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানির মতো দলের নাম।
এই ‘চ্যাম্পিয়নদের অভিশাপ’ তত্ত্বের শুরুটা হয়েছিল ফ্রান্সকে দিয়ে। ১৯৯৮ সালে প্রথম শিরোপা জয়ের চার বছর পর জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপেও তাদের ফেভারিট মানা হচ্ছিল। ২০০০ সালের ইউরো জয় করা ফ্রান্স ছিল ফর্মের তুঙ্গে। জিনেদিন জিদান, থিয়েরি অঁরির মতো তারকাদের নিয়েও ফ্রান্স সেবার গ্রুপ স্টেজ পার হতে পারেনি। প্রথম ম্যাচে সেনেগালের কাছে হেরে বিশাল অঘটনের জন্ম দিয়েছিল আগেরবারের চ্যাম্পিয়নরা। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচ খেলে তাদের পয়েন্ট ছিল মাত্র ১। ফ্রান্সের এই হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পরেই ফুটবল বিশ্বে প্রথমবার উচ্চারিত হয়েছিল ‘চ্যাম্পিয়নস কার্স’।
২০০২ বিশ্বকাপ জয়ের পর ২০০৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাদ পড়ে ব্রাজিল। তারকাঠাসা দলটি ছিল সেই আসরের অন্যতম সম্ভাবনাময় দল। কিন্তু ফ্রান্সের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয় সেলেসাওদের। তবে ব্রাজিল একমাত্র দল যারা এই শতাব্দীতে ট্রফি জেতার পরের আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়েনি। জাপান-কোরিয়া জয়ের পর আর শিরোপার মুখ দেখেনি পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। বারবার বিদায় নিতে হয়েছে হতাশা নিয়ে। এর ভেতর ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে উঠলেও জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হেরে লজ্জাজনকভাবে বিদায় নিতে হয়।
২০০৬ সালে জার্মানিতে ২৪ বছর পর নিজেদের চতুর্থ শিরোপা জেতে ইতালি। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই বিতর্কিত ফাইনালে টাইব্রেকারে জয় পায় তারা। ২০১০ ও ২০১৪ সালে বাদ পড়তে হয় গ্রুপ পর্ব থেকে। ব্রাজিল বিশ্বকাপের পর থেকে তো আর বিশ্বকাপে খেলারই সুযোগই পায়নি চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জেতে স্পেন। ২০১৪ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ যাওয়ার পর ২০১৮ সালে স্বাগতিক রাশিয়া এবং ২০২২ সালে মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টি শুটআউটে দুঃখজনকভাবে হেরে বিদায় নিতে হয়।
২০১৪ সালের জার্মানি ছিল এক কথায় ‘বিধ্বংসী’। কারণ তারা প্রতিপক্ষকে শুধু হারায়নি, তাদের চুরমার করেছে। কিন্তু আবারও সেই ‘চ্যাম্পিয়নস কার্স’। ২০১৮ সালেও সবাই সেই অপ্রতিরোধ্য জার্মানিকে দেখবে আশা করেছিল। সেই আশা নিভে যায় দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ার পর। ২০২২ সালেও জাপানের কাছে হেরে একই অবস্থা। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর একবারও গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরোতে পারেনি চারবারের চ্যাম্পিয়নরা।
মজার বিষয় হলো, যাদের হাত ধরে এই ‘চ্যাম্পিয়নস কার্স’-এর আলোচনা শুরু হয়েছিল, সেই ফ্রান্সই ২০১৮ সালের শিরোপা জয়ের পর এই তত্ত্বকে অনেকটা ভুল প্রমাণ করে। ২০২২ সালে বাকিদের মতো দুর্দশা হবে তাদের— এমনটাই ভেবেছিল সবাই। কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমাণ করে ২০২২ সালে ফাইনালে পৌঁছায় ফ্রান্স। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নাটকীয় ম্যাচে টাইব্রেকারে হারতে হয় তাদের। এর মাধ্যমেই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়নদের অভিশাপ তত্ত্বের সমাপ্তি ঘটে।
২০২২ সালের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়েই এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেবে। চ্যাম্পিয়নদের অভিশাপ তত্ত্বের বোঝা নিয়ে আর মাঠে নামতে হবে না তাদের।
ফ্রান্সের মতো ধারাবাহিকতা মেসিরা ধরে রাখতে পারে কি না, সেটিই দেখার অপেক্ষায় রয়েছে ফুটবল বিশ্ব।






