এক মিলিয়ন কোচ বনাম থমাস ডুলি

ছবি : মোশারফ হোসেন
আগের দিন তাকে নিয়ে হয়েছিল বিক্ষোভ। মিছিল হয়েছিল তাকে কোচ না করার জন্য। পরদিনই অর্থাৎ গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ তিনি হাজির কুল-বিএসপিএ অ্যাওয়ার্ডের মঞ্চে। বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন বাংলাদেশ দলের নতুন ফুটবল কোচ হিসেবে। নাম তার থমাস ডুলি। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে দুটি বিশ্বকাপ খেলা এবং কয়েকটি জাতীয় দল সামলানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন হামজাদের দলের দায়িত্ব নিতে। এই দায়িত্বে চাপ-তাপ ভীষণ। দেশের ফুটবলের হালচাল ভালো না হলেও মানুষের ফুটবলাবেগ বাড়াবাড়ি রকমের। ডুলি সেটি জেনে-বুঝেই এসেছেন, ‘হয়তো এক মিলিয়ন (১০ লাখ) কোচ বাইরে ঘোরাঘুরি করছে। তারা ফুটবল বোঝে, এটা ভালো কথা। তবে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে।’
বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের কাতারে যে এত ‘কোচ’ ঘোরাঘুরি করে, এটি নতুন নয়। তাদের সবারই ফুটবল দল নিয়ে নিজস্ব মতামত আছে। যেন ফুটবলটা গুলে খেয়ে ফেলেছেন। তাদের কথা অনুযায়ী চললেই সাফল্য পাবে দল, এটা তাদের বিশ্বাস। তাদের কাছে মূল কোচ গৌণ, তার কোনো সিদ্ধান্তই সঠিক নয়। সাধারণ্যে এত ‘কোচ’ ঘোরাঘুরি করলে তো আসল কোচের কাজটাই কঠিন হয়ে যেতে পারে।
নতুন কোচ এসেছেন হোমওয়ার্ক করে। হয়তো বা জেনেছেনও তার বিরুদ্ধে মিছিলের খবর। তার ফেসবুকে নাকি এরই মধ্যে ভিড় বেড়েছে বাংলাদেশি লোকজনের। চ্যালেঞ্জটাও ডুলি টের পাচ্ছেন আর তাই ট্রফি জয়ই তার লক্ষ্য, ‘আমি সবসময় আমার খেলোয়াড়দের ও ফেডারেশনকেও বলি যে আমাদের কিছু অর্জন করতে হবে। আমরা বোধহয় ২৩ বছর কিছু জিতিনি। এখন সময় এসেছে কিছু করে দেখানোর।’ নিজেদের মাঠে ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর বাংলাদেশের ফুটবল ভাগ্যে কিছুই জোটেনি। এরপর ২০০৯ সাল থেকে টানা পাঁচ আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া বাংলাদেশের বিদায়ী কোচ হাভিয়ের কাবরেরার অধীনে ২০২৩ সালে সেমিফাইনালে পৌঁছে।
আমি সবসময় আমার খেলোয়াড়দের ও ফেডারেশনকেও বলি যে আমাদের কিছু অর্জন করতে হবে। আমরা বোধহয় ২৩ বছর কিছু জিতিনি। এখন সময় এসেছে কিছু করে দেখানোর -থমাস ডুলি
কোচিং করানোর জন্য সাত সমুদ্র-তেরো নদী পাড়ি দিয়ে আমেরিকান কোচ এসেছেন বাংলাদেশে। কারণ হলো এশিয়া তার পছন্দের জায়গা, ‘ফিলিপাইন জাতীয় দলের হয়ে কাজ করার সুবাদে এশিয়ার অনেক জায়গায় ভ্রমণ করি এবং আমার দারুণ লেগে যায়। আমি সত্যিই এখানে আবারও কাজ করতে চেয়েছিলাম। এরপর আমি দক্ষিণ আমেরিকায় আরেকটি দায়িত্ব পাই; সেখানকার সংস্কৃতি এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি আমার খুব ভালো লাগে। আমি অনেক দেশ দেখেছি, তবে মনে মনে সবসময় এশিয়ায় ফিরে আসার স্বপ্ন দেখতাম। আমি সেখানকার ফেডারেশনকেও বলে রেখেছিলাম যে, এশিয়ায় যদি কোনো সুযোগ আসে, তবে আমি যেতে চাই।’ তাই বাংলাদেশে কোচ হতে তিনি আবেদন করেন। মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনে কাজ করার সময় তিনি দেখেছেন বাংলাদেশি মানুষের ফুটবলাবেগ। সুবাদে এই দেশ সম্পর্কে তার কিছু জানা হয়।
এই দেশের ফুটবলের সঙ্গেও বোধহয় তার কোচিং দর্শনটা মেলে। ডুলি চান সুন্দর ফুটবল, বল পায়ে রেখে খেলাতে, ‘আমি সুন্দর ফুটবল খেলাতে চাই। ফুটবলের পেছনে দৌড়াতে (বল তাড়া করতে) পছন্দ করি না। বল তাড়া করা জিনিসটা আমি পছন্দ করি না। কারণ, তখন আপনাকে শুধু শুধুই দৌড়াতে হয় বলটি ফিরে পাওয়ার জন্য আর অধিকাংশ সময় আপনি বল ফেরতও পান না। আমি ফুটবল পায়ে রেখে খেলতে পছন্দ করি।’ মানে ‘রান অ্যান্ড প্রেসিং’ ফুটবলে তিনি বিশ্বাসী নন। ডুলি সুন্দর ফুটবলের পূজারি। বল পায়ে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চান। একজন আমেরিকান ফুটবল কোচের সুন্দর ফুটবল খেলানোর দর্শন ধারণ করা কম কথা নয়।
এ স্টাইলে খেলতে গেলে ফুটবলারদের বল পায়ে রাখার ক্ষমতা থাকতে হয়। ফুটবলের বেসিকটাও তাদের ভালো থাকা চাই। অ্যাওয়ার্ড মঞ্চে দাঁড়িয়ে ডুলি খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বলছেন, ‘খেলোয়াড়দের মাথায় এই জিনিসটি ঢুকিয়ে দেওয়া ভীষণ জরুরি, যেন তারা বোঝে যে পুরস্কার পাওয়ার আগে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। জীবনে কোনো কিছু অর্জন করতে হলে আপনাকে কিছু না কিছু ত্যাগ করতেই হবে। আর যারা তা করতে রাজি আছে, তাদের নিয়ে আমরা সফল হতে পারব। তাই আমার লক্ষ্য হলো র্যাংকিংয়ে ১৬০ বা ১৫০-এর মধ্যে চলে আসা। এটি রাতারাতি হবে না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।’ বাংলাদেশের র্যাংকিং ১৬০-এ নামিয়ে আনতে পারলে বড় সাফল্য বলে বিবেচিত হবে।
এটি করতে গেলে অনেক কিছুই বদলাতে হবে। ফুটবল নিয়ে থমাস ডুলির আছে একটা বই— ‘দ্য ট্রুথ অ্যাবাউট সাকসেস ইন সকার দ্যাট নো ওয়ান টিচেস’। যেখানে সাফল্যের জন্য তিনি দেখিয়েছেন চারটি মূল স্তম্ভকে, যার একটি হলো মানসিকতা। তাই নতুন কোচ শুরুতে বদলাতে চান খেলোয়াড়দের চিন্তার ধরনটা।
কম বেতন
তালিকায় অনেক হাই প্রোফাইল কোচ থাকলেও বাফুফে শেষমেশ থমাস ডুলিকেই পছন্দ করেছে। ক্রিস কোলম্যানের তুলনায় তার বেতনও অনেক কম, ৮ হাজার ডলার। তবে ফিলিপাইনকে এশিয়ান কাপের মূল পর্বে তোলার অভিজ্ঞতা আছে তার।
ফুটবল দর্শন
বাংলাদেশ দলে এতদিন ইউরোপীয় ফুটবল স্টাইলের চর্চা হয়েছে বেশি। কিন্তু থমাস ডুলির ফুটবল দর্শনে খেলার সৌন্দর্য আগে। শুধু বলের পেছনে দৌড়ানোর পক্ষে নন তিনি। তার চেয়ে এই আমেরিকান কোচ বল পায়ে রেখে খেলার স্টাইল তৈরি করতে চান ।
র্যাংকিংয়ে লক্ষ্য
নতুন কোচ খেলোয়াড়দের আত্মনিবেদন চান। খেলোয়াড়রা তাদের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করলে দেশের ফুটবলের চেহারা বদলাবে। বদল রাতারাতি সম্ভব না হলেও ফিফা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশকে ১৬০-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির করেছেন থমাস ডুলি।






