সেই হাইতিকেও এখন ভয়

সংগৃহীত ছবি
নেইমার মাঠে নামলেন। দলের সবার সঙ্গে অনুশীলন করলেন। চলল ঠাট্টা-রসিকতা। তাতেই যেন মেঘ কেটে রোদ ঝলমল করল নিউ জার্সির কলম্বিয়া পার্কে। বিশ্বকাপে এখানেই আস্তানা পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। স্থানীয় সময় বুধবার প্রথমবার দলের অন্য সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলন করেছেন নেইমার, যদিও সেটা মাত্র মিনিট দশেকের জন্য। তবে হাইতির বিপক্ষে ম্যাচের আগে এই ১০ মিনিটের উপস্থিতিই যেন টনিকের কাজ করল ব্রাজিল দলে।
ব্রাজিল আর হাইতির ফুটবল সামর্থ্যের পার্থক্যটা দুই দেশের আয়তনের পার্থক্যের চেয়ে বেশি না হলেও কম নয়! হাইতির চেয়ে ব্রাজিল ৩০৭ গুণ বড় আয়তনে, দুই দেশের ফিফা র্যাংকিংয়ের পার্থক্য ৭৭। ব্রাজিল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, অংশগ্রহণ করেছে ২৩টি বিশ্বকাপের সবকটিতেই আর হাইতি এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো খেলার সুযোগ পেল বিশ্বকাপে; সেটাও ১৯৭৪ সালের পর এবারই প্রথম। এখন পর্যন্ত জিততে পারেনি বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ, এমনকি ড্র-ও করতে পারেনি। এমন একটা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে ব্রাজিল দলে দুশ্চিন্তা, এই ভাবনাটাই তো অবিশ্বাস্য! তবে বাস্তবতা হচ্ছে, মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ শুরুর পর ব্রাজিল খানিকটা চাপে। ‘ব্যাপারটা রীতিমতো ভয় ধরানোর মতো ছিল, কারণ সবাই আমাদের কাছ থেকে বড় কিছু আশা করছিল’— সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন ব্রাজিলের ডিফেন্ডার দানিলো। ‘সবকিছু যখন মনের মতো হয় না, তখন সেই ধাক্কা সামলানো সত্যিই কঠিন, এমনটাই বলেছেন ফ্ল্যামেঙ্গোর এই ফুটবলার। ক্ষয়িষ্ণু জমিদারবাড়ির তৃতীয় প্রজন্মের সন্তানরা যেভাবে অতীতের গৌরবকে মুছে যেতে আর আশপাশের একসময়ের হতদরিদ্রদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে দেখে, দানিলো বোধহয় সেভাবেই বলেছেন, ‘একটা ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট থাকতে হবে— দল হিসেবে ফ্রান্স বা আর্জেন্টিনার আজ যে পরিণত অবস্থা, সেটা আমাদের এখনো আসেনি।’ এখনো বিশ্বের সফলতম ফুটবল দল ব্রাজিল, পাঁচটি বিশ্বকাপ জেতেনি আর কোনো দলই, সেই দলের একজন সদস্যের কণ্ঠে এমন সরল স্বীকারোক্তিই বলে দেয়, এই দলের খেলোয়াড়রা নিজেরাও বিশ্বাস করেন না যে, তাদের পক্ষে বিশ্বকাপ জেতার মতো কীর্তি গড়া সম্ভব।
এখন পর্যন্ত হাইতির বিপক্ষে তিনটি ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল। সবচেয়ে কম ব্যবধানের জয়টাই ৪-০ গোলে, ১৯৭৪ সালে। ২০০৪ সালে প্রীতি ম্যাচে ৬-০ ও ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার শতবর্ষ আয়োজনে ৭-১ গোলে হাইতিকে হারিয়েছিল ব্রাজিল। অথচ মরক্কোর সঙ্গে ড্রয়ের পর সেই হাইতি আচমকা হয়ে গেছে প্রবল প্রতিপক্ষ! প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হারের পরও হাইতির কোচ সেবাস্তিয়ান মিনে হুংকার দিয়ে রেখেছেন, ‘হয়তো আমাদের দলের খেলোয়াড়রা খুব একটা বেশি পরিচিত নন, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, তারা কতটা দাগ কাটতে পারল।’
হাইতির হয়ে খেলা বেশিরভাগ ফুটবলারের জন্ম ফ্রান্সে। এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি, ৯৯ জন ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা ফুটবলার খেলছেন বিভিন্ন দলের হয়ে। মোট ১ হাজার ২৪৮ জন ফুটবলার অংশ নিচ্ছেন এই বিশ্বকাপে, তার ভেতর ৯৯ জনই জন্মেছেন ফ্রান্সে। বলা যায়, এই বিশ্বকাপে খেলা ফুটবলারদের ভেতর গড়ে প্রতি ১৩ জনের একজন জন্মেছেন ফ্রান্সে! হাইতি দলে ফ্রান্সে জন্মানো খেলোয়াড়ের সংখ্যা ১২। তাদের অধিনায়ক গোলকিপার জনি প্লাসিড জন্মেছেন ফ্রান্সে, খেলেন ফ্রেঞ্চ লিগের দল বাস্তিয়ার হয়ে। ফ্রেঞ্চ লিগে খেলা ফুটবলার হাইতি দলে পাঁচজন, দুজন করে খেলোয়াড় আছেন বেলজিয়ান লিগ আর ইংল্যান্ডের লিগে খেলা। জনা পাঁচেক আছেন যুক্তরাষ্ট্রেই মেজর লিগে খেলেন। ব্রাজিল ফুটবল দলেও এখন এই পরিমাণে ফুটবলার ইউরোপের লিগে নেই! ব্রাজিল স্কোয়াডের ২৬ জনের সাতজন খেলেন ব্রাজিলিয়ান লিগে, জনা দুয়েক চলে গেছেন সৌদি লিগে। একটা সময় ব্রাজিলের ফুটবলারদের দেশের বাইরে খেলার অনুমতি ছিল না, যখন অনুমতি মিলল তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লিগে দেখা যেত ব্রাজিলিয়ানদের। সেই সুবাদে জাতীয় দলেও তাদের ঠাঁই হতো। ২০০৪ সালে কফির চেয়ে বেশি ফুটবলার রপ্তানি করেছে ব্রাজিল! সেই সময়ে ৮৫২ জন পেশাদার ফুটবলার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৭৭টি লিগে খেলছিলেন। এখন সেই জায়গাটি চলে গেছে ফ্রান্সের দখলে। এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্স জাতীয় দল বাদে আরও ১৬টি দলে অন্তত একজন হলেও ফ্রান্সে জন্মানো বা ফ্রান্সের ফুটবল কাঠামো থেকে উঠে আসা ফুটবলার খেলছেন। ফ্রান্স জাতীয় দলের পর তৃতীয় সবচেয়ে বেশি, ১২ জন ফরাসি ফুটবলার খেলছেন হাইতির হয়ে। এখন পর্যন্ত কেপ ভার্দে, কঙ্গোর মতো দলগুলো যেভাবে বড়দের নাকানিচুবানি খাইয়েছে, তাতে করে হাইতির পক্ষে আশাবাদী আর ব্রাজিলের সাবধানি হওয়াটা মোটেও বাড়াবাড়ি নয়।
এমন আশঙ্কা জাগানো ম্যাচের আগেই নেইমার অনুশীলনে যোগ দিলেন, মিনিট দশেক সবার সঙ্গে গা গরম করে চলে গেলেন তার পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায়। ছোট্ট একটা উপস্থিতি, তবে নেইমার হয়তো অনুশীলনে জানিয়ে গেলেন, ব্রাজিল হয়ে হাইতিকে ভয় পাওয়া চলে না।




