আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডে যতটা ফুটবল ততটাই ‘যুদ্ধ’

বাংলাদেশের সমর্থকদের দেখলে মনে হতে পারে, ব্রাজিলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার দা-কুমড়ো সম্পর্ক। অথচ বাস্তবে সেটা একদমই নয়। লাতিন আমেরিকার দেশ হিসেবে দুটো দলই একটা সময় ইউরোপিয়ানদের আধিপত্যের বিরোধিতা করেছে। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ব্রাজিলের দেখাই হয়েছে চারবার, তাতে ব্রাজিলের জয় দুবার আর সবশেষ দেখা ১৯৯০ সালে সেটাও ৩৬ বছর আগে। এই দ্বৈরথগুলোর কোনোটিই ছিল না শিরোপা নির্ধারণী বা আসরের সেমিফাইনালের মতো পর্বে।
বরং আর্জেন্টিনার সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ফুটবল নিয়ে বৈরিতা উরুগুয়ের, সেই প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে। কিছুটা বলা যেতে পারে ইতালির সঙ্গেও, মুসোলিনি যে ১৯৩০ বিশ্বকাপের চার আর্জেন্টাইন ফুটবলারকে জোর করে পরের আসরে আজ্জুরিদের পক্ষে মাঠে নামালেন। বড় মঞ্চে হারিয়ে দেওয়ার জের হিসেবে জার্মানির সঙ্গেও ‘শত্রুতা’ হতে পারে, চারবার আর্জেন্টিনাকে নকআউট করেছে জার্মানরা। দুবার বিশ্বকাপের ফাইনালে। কিন্তু সব ছাপিয়ে ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ আসলে ইংল্যান্ড। এই দুই দল মুখোমুখি হওয়া মানেই বাড়তি উত্তাপ, খেলার মাঠে স্নায়ুর চাপ আর রেফারির কার্ড।
দক্ষিণ আটলান্টিকের বেশ কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপ মিলিয়ে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ। একটা সময়ে আটলান্টিকে জাহাজ চলাচলের পথে দ্বীপটা রসদ সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করতেন ইংরেজ ও স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা। পরে সেখানে অপরাধীদের নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। মাছ ধরা আর পশু পালনই প্রধান আয়ের উৎস, খুব দামি কোনো খনিজসম্পদ বা তেল গ্যাসও মেলেনি। সেই দ্বীপ দখল করা নিয়েই ১৯৮২ সালে ১০ সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধ হয় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের। ৭৪ দিনের যুদ্ধে আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করে। তাদের পক্ষে নিহত হন ৬৪৯ জন সেনা, ব্রিটেনের মারা যান ২৫৫ জন। এরপর থেকে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে, সেখানে ব্রিটেনের রাজার গভর্নরের শাসন চলে। পুরনো হলেও, সেই ফকল্যান্ড যুদ্ধের পরাজয়ের ক্ষত যেমন আছে, তেমনি সেই কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেওয়া হ্যান্ড অব গড কাণ্ডও আছে!
যুদ্ধের আগে পরে ফুটবল মাঠে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনা ঘি ঢেলেছে আগুনে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা। ওয়েম্বলিতে সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডের জয় ১-০ গোলে, তবে জিওফ হার্স্টের গোলটিকে অফসাইড ভাবেন আর্জেন্টাইনরা। তাদের অধিনায়ক আন্তনিও রাতিনকে ৩৩ মিনিটের মাথায় দুবার হলুদ কার্ড দেখান রেফারি, রাতিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান, এতে করে খেলা থেমে থাকে ৮ মিনিট। ম্যাচের পর ইংল্যান্ডের কোচ অ্যালফিও বাসিল আর্জেন্টাইনদের বলেছিলেন ‘পশু’। এরপর ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ কাণ্ড। ফকল্যান্ড যুদ্ধের বছর চারেক পর দুই দলের মুখোমুখি হওয়াটা জন্ম দিয়েছিল রাজনৈতিক কৌতূহলের। সেটা ছাপিয়ে মাঠের খেলাই এমন মনে রাখার মতো হলো যে, যুদ্ধের কথা পেছনে পড়ে থাকল। একই ম্যাচে বিশ্বের সবচেয়ে কুখ্যাত ও বিখ্যাত গোলটি করেছিলেন ম্যারাডোনা। ভিএআর প্রযুক্তি না থাকায় রেফারিকে বোকা বানিয়ে ম্যারাডোনা পার পেয়ে গেছে, তবে প্রযুক্তি থাকার পরও যে আর্জেন্টিনাকে বিতর্ক ছাড়ছে না, সেটা এ আসরেই স্পষ্ট।
এরপর ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে দুই দলের দেখায় মাইকেল ওয়েনের ম্যারাডোনাকে মনে করানো গোল, ডিয়েগো সিমিওনেকে ডেভিড বেকহ্যামের লাথি মেরে লাল কার্ড দেখা ও টাইব্রেকারে হার ইংল্যান্ডের। সবশেষ দেখা ২০০২ সালে জাপানে। এই বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের কোচের দায়িত্ব পালন করা আর্জেন্টাইন সাবেক ফুটবলার মুরিসিও পচেত্তিনো ডি বক্সের ভেতর ফাউল করেছিলেন ওয়েনকে। ফলে পেনাল্টি, তাতে গোল করে ইংল্যান্ডকে জিতিয়েছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম।
এবারও আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে পৌঁছেছে বিতর্ককে সঙ্গী করে। অন্যদিকে ইংল্যান্ড শেষ চারে এসেছে দারুণ পারফরম্যান্সে, হ্যারি কেইন আর জুড বেলিংহামে ভর করে। গোল্ডেন বল ও বুটের ত্রিমুখী লড়াই লিওনেল মেসি আর কেইন ও বেলিংহামের ভেতর। দলের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তে এই তিনজনই জ্বলে উঠেছেন, করেছেন ব্যবধান গড়ে দেওয়ার মতো পারফরম্যান্স। নতুন-পুরনো অনেক স্মৃতির ভিড়ের সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাস যখন বাড়িয়ে তুলছে প্রত্যাশার চাপ আর সেমিফাইনালে যোগ করেছে বাড়তি উত্তাপ। তার আঁচ লাগতে শুরু করেছে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই! সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের গন্ধ পেতেই আর্জেন্টাইন সমর্থকরা লাফিয়ে উদযাপন করে আর গলা ফাটিয়ে বলতে থাকে, ‘যে লাফাবে না সে-ই ইংলিশম্যান।’
সেমিফাইনালটা কী রকম বারুদে ঠাসা ম্যাচ হবে, বোঝাই যাচ্ছে।




