সোনালি ট্রফিহীন সোনার ছেলে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে? পেলে-ম্যারাডোনা-মেসির সঙ্গে অনেকেই নাম নেবেন ইয়োহান ক্রুইফ, দি স্তেফানো, ইউসেবিওদের। অথচ ক্রুইফ, স্তেফানো, ইউসেবিওরা কখনো বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখেননি। সেই সৌভাগ্য হলো না ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোরও। সোনালি ট্রফি না জিতেও অবশ্য ফুটবল ইতিহাসে সোনার ছেলে হয়ে ক্রুইফ, স্তেফানোদের সঙ্গে আসবে রোনালদোর নাম। তার প্রভাব এতটাই।
বিশ্বকাপের আগে রোনালদো নিজে বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপ সাত ম্যাচের টুর্নামেন্ট। সাতটা ম্যাচ কীভাবে একজনকে বিশ্বসেরা করবে?’ বিশ্বকাপ শেষেও নিজের ধারণা থেকে সরে আসেননি। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারার পর নিশ্চিত করলেন এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। চোখের জল মুছে এও নিশ্চিত করলেন, ট্রফি জিততে না পেরে কোনো অতৃপ্তি নেই তার, ‘আমি আমার সেরাটা দিয়েছি, পর্তুগালের জন্য তিনটি শিরোপা জিতেছি। ক্রিস্তিয়ানোর আগে পর্তুগালের কোনো শিরোপা ছিল না, তাই আমি খুশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ২০১৬ সালের (ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ) শিরোপাটি, যা আমার কাছে বিশ্বকাপের সমান গুরুত্বের। আবারও বলব, একদম পরিষ্কার বিবেক নিয়ে বিদায় নিচ্ছি।’
কঠোর পরিশ্রমে দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ স্তরে টিকে থাকাটাই কৃতিত্ব রোনালদোর। বয়সের সীমাকে তিনি নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়। বিশ্বকাপ ইতিহাসেই দেশের হয়ে সবচেয়ে কম ও বেশি বয়সে গোল করা তিন খেলোয়াড়ের একজন তিনি। তবে টানা সপ্তম বিশ্বকাপ খেলতে চান না রোনালদো। পরের বিশ্বকাপে না খেললেও জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছেন না এখনই। সেই সিদ্ধান্ত জানাতে চাইলেন পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে, ‘আমি চিন্তা করার আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাব। কোনো তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেব না, জীবন এগিয়ে যাবে।’ এবারের বিশ্বকাপটা যাচ্ছেতাই কাটলেও ঠিকই ছাপ রেখে যাচ্ছেন রোনালদো। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ছয় বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তিটা তার। বিশ্বকাপ নকআউটে সবচেয়ে বেশি বয়স ৪১ বছর ১৪৭ দিনে গোলের রেকর্ডটাও রোনালদোর। তবে ৪ ম্যাচে ৩ গোল করলেও ছিলেন বিবর্ণ। পুরো টুর্নামেন্টে একটাও ড্রিবলিং করার চেষ্টা করেননি! বিশ্বকাপে পর্তুগালের ৫ ম্যাচে মাত্র ৯ মিনিট বাদে বাকি সময় মাঠে থেকেও ৩৬৬ জন খেলোয়াড় রোনালদোর চেয়ে বেশি বল স্পর্শ করেছেন।
শেষ ষোলোতে স্পেনের বিপক্ষে রোনালদো মাত্র ১৯ বার বল স্পর্শ করেছেন, যা বিশ্বকাপ ম্যাচে তার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এমন বিবর্ণ রোনালদোর জন্যই কি অসাধারণ একটা দল নিয়েও শেষ ষোলো থেকে বাদ পড়ল পর্তুগাল?
ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন দায়টা চাপালেন রোনালদোর ওপরই, ‘ও মাঠে দাদুর মতো হেলেদুলে হাঁটছিল। পর্তুগাল বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়েছে এজন্যই। রোনালদো মাঠে কিছুই করেনি। কোচ মার্তিনেস কী করছেন? একজন খেলোয়াড়কে এভাবে কতটা তোষামোদ করা যায়? মার্তিনেসের ভুলেই পর্তুগাল বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘গত বিশ্বকাপে শেষ ১৬-এর ম্যাচে কোচ ফের্নান্দো সান্তোসের সাহস ছিল রোনালদোকে বাদ দেওয়ার। ওকে বসিয়ে খেলানো হয় গনসালো রামোসকে, সে হ্যাটট্রিকও করেছিল। এই বিশ্বকাপে রোনালদোর বয়স আরও চার বছর বেড়েছে আর দেখুন কী ঘটল। মার্তিনেসের দল পরিচালনা কলঙ্কজনক। বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম নিয়ে দারুণ কিছু করার সুযোগ পেয়েও তিনি খিচুড়ি পাকিয়েছিলেন, আর এবার পর্তুগালকে নিয়েও একই কাণ্ড করলেন।’
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে রোনালদোর একসময়ে সতীর্থ ওয়েন রুনি অবশ্য প্রশংসাই করলেন রোনালদোর, ‘ও জিনিয়াস, সুপারস্টার, কিংবদন্তি। ফুটবলে রোনালদো কোটি কোটি মানুষকে যা দিয়েছে সেটা অনন্য। রোনালদো এখন হতাশ, কারণ ও বিশ্বাস করত এই টুর্নামেন্ট জেতা সম্ভব। কিন্তু সময় কাউকেই ছাড় দেয় না। ফুটবলের জন্য এটা দুঃখের দিন। আমরা রোনালদোকে খেলতে দেখেছি, এটাই আনন্দের।’
কোচ রবার্তো মার্তিনেসের পরিকল্পনা ছিল রোনালদোকে ঘিরেই। যদিও তাকে সতীর্থরা পাস না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল শুরুতে। সেই বিতর্ক পেছনে ফেলে রোনালদো করেছেন ৩ গোল। বিশ্বকাপে তার ১১ গোলই পর্তুগালের কারও সর্বোচ্চ। তাই মার্তিনেস বললেন, ‘যখন আপনার গোলের প্রয়োজন, তখন রোনালদোকে মাঠ থেকে তুলে নিতে পারেন না। অন্তত ৯০ মিনিটের মধ্যে তো নয়ই। ও শারীরিকভাবে ফিট। ওর উপস্থিতি, ডেডবল পরিস্থিতি আর অভিজ্ঞতা প্রয়োজন ছিল আমাদের।’
নিজের সেই অভিজ্ঞতাতেও সোনালি ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখা হলো না রোনালদোর। তারপরও ফুটবল ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন সোনার ছেলে হয়েই।




