৪০ বছর পর ঢেউ উঠবে অ্যাজটেকায়

যে মাঠে বিশ্বকাপ জিতেছেন পেলে ও ম্যারাডোনা, সেই অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম ৪০ বছর পর আবারও উত্তাল হবে মেক্সিকান ওয়েভে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের তিন আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। এই তিন দেশের ভেতর সত্যিকার অর্থে ফুটবল সংস্কৃতির প্রচলন আছে মেক্সিকোতেই, বাকি দুই আয়োজক দেশে তো ফুটবল মানে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক খেলা! পৃথিবীতে মাত্র দুটি স্টেডিয়াম আছে, যেখানে দুবার বিশ্বকাপ ফাইনাল হয়েছে। প্রথমটি মেক্সিকোর অ্যাজটেকা আর দ্বিতীয়টি ব্রাজিলের মারাকানায়। ১৯৮৬’র বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের ৪০ বছর পর ১১ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে স্বাগতিক মেক্সিকোর ম্যাচ দিয়ে ফের বিশ্বকাপের ঢেউ ছুঁয়ে যাবে পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম এই ফুটবল স্টেডিয়ামকে।
ফুটবল মাঠে সমর্থকরা কত কিছু করেই তো আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। জাপানের দর্শকরা স্টেডিয়াম পরিষ্কার করেন, দক্ষিণ আফ্রিকানরা ভুভুজেলা বাজিয়ে বিরক্তির কারণ ঘটান, আইসল্যান্ডের সমর্থকরা ভাইকিং তালি দিয়ে খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেন আর মেক্সিকান দর্শকরা তোলেন ঢেউ। গ্যালারিতে থাকা দর্শকরা ছন্দবদ্ধভাবে ওঠানামা করে গ্যলারিতে সৃষ্টি করেন মানব ঢেউ, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর দর্শকদের এই উল্লাসভঙ্গি সম্প্রচারকদের মুখে মুখে নাম পেয়ে যায় ‘মেক্সিকান ওয়েভ’ হিসেবে। এরপর থেকে অনেক খেলাতেই স্টেডিয়ামে দর্শকরা এভাবে মেক্সিকান ওয়েভ সৃষ্টি করেন। বিশ্বকাপ সামনে রেখে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেক্সিকান ওয়েভ তৈরির বিশ্বরেকর্ড করতে চাইছেন মেক্সিকোর ফুটবল ভক্তরা।
১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪ জন মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে মেক্সিকান ওয়েভ সৃষ্টির রেকর্ড ২০০৮ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে। সবচেয়ে লম্বা সারির মেক্সিকান ওয়েভের রেকর্ড ২০০৭ সালে পর্তুগালে, যেখানে অংশ নিয়েছিলেন ৮ হাজার ৪৫৩ জন। ২০১৫ সালে জাপানে হয় সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে চলা মেক্সিকান ওয়েভের রেকর্ড, সেবার ‘ঢেউ’ উঠেছিল ১৭ মিনিট ১৪ সেকেন্ড ধরে। মেক্সিকো সরকারের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবারে তাদের লক্ষ্য স্টেডিয়ামের বাইরে সবচেয়ে বড় ‘মেক্সিকান ওয়েভ’ তৈরির, “বিষয়টি কোনো রেকর্ড ভাঙার নয়, বরং সম্পূর্ণ নতুন একটি রেকর্ড গড়ার— যা এর আগে কখনো দেখেনি বিশ্ব। ঠিক এ কারণেই সব উপাদান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’ কর্তৃপক্ষ প্রমাণগুলো নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। কারণ, তাদের অনেকগুলো বিষয় বিশদভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়।” এই রেকর্ডের অংশ হতেই মেক্সিকোর বিভিন্ন জায়গা থেকে রাজধানীতে এসেছেন অনেকে। তাদেরই একজন তেরেসা লোপেজ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা এখানে এসেছি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘মেক্সিকান ওয়েভ’-এর অংশ হতে এবং আমাদের জাতীয় দলকে সমর্থন জোগাতে। আমরা মেক্সিকান এবং নিজেদের দেশ নিয়ে ভীষণ গর্বিত।’ টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই রাজধানীতে চলে আসা পর্যটক ভিভিয়া শিভার্স জানিয়েছেন, ইতিহাসের অংশ হতেই এসেছেন, ‘এটি ভীষণ স্পেশাল একটি ভেন্যু, বিশ্বকাপের মতো আসরে এটি এক দারুণ অবদান এবং এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অংশ হতে পারাটা সত্যিই চমৎকার এক অনুভূতি।’
স্থানীয় সময় শনিবার সকালে কয়েক দফা প্রস্তুতির পর মেক্সিকোর রাজধানীর পাসেও দে লা রিফর্মা এলাকায় হাজার হাজার মেক্সিকো সমর্থক জড়ো হয়ে মানব ঢেউ সৃষ্টি করেছেন। বিশ্বকাপ জুড়ে ফ্যানরা ড্রাম, বাঁশি আর স্থানীয় সংগীতের মূর্ছনায় মাতিয়ে রাখবেন মেক্সিকোর ভেন্যুগুলো, বিশ্বকাপের তিন স্বাগতিকদের ভেতর নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আনন্দময় অভিজ্ঞতা উপহার দেবেন মেক্সিকানরাই। কারণ, মেক্সিকান ফুটবল সমর্থকদের কাছে ম্যাচ মানেই উৎসব, ‘বিষয়টি ঠিক নিজের বাড়িতে কোনো পার্টির আয়োজন করে বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানানোর মতো। এবার আতিথেয়তা দেখানোর পালা আমাদের। বৃহস্পতিবার মেক্সিকো ও সার্বিয়ার মধ্যকার প্রীতি ম্যাচটি উপভোগ করতে আসা ক্রিস্তিয়ান জানিয়েছেন সিএনএনকে।
মেক্সিকোর দর্শকরা কেন এত উৎসবমুখর, সেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন মেক্সিকোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেক্সিকান জাতীয়তাবোধ নিয়ে গবেষণা করা গবেষক ফের্নান্দো ভিজকেইনো, ‘গ্যলারিতে কোনো ফুটবল থাকে না, সমর্থকরা সরাসরি খেলায়ও অংশ নেন না; সত্যি বলতে কোনো খেলোয়াড়ও সরাসরি জড়িত নন এই উদযাপনের সঙ্গে। তবুও এই যে উচ্ছ্বাসের সংক্রমণ, এই যে স্বপ্রণোদিত উদযাপন, এটিই মেক্সিকোর সংস্কৃতির অংশ।




