কেপ ভার্দের আর্জেন্টিনা যোগ

বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউট পর্বে পৌঁছানো সবচেয়ে ছোট দেশ এখন কেপ ভার্দে
বিশ্বকাপে বাংলাদেশে ছেয়ে যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায়। কেপ ভার্দেতেও তাই। আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশে অবশ্য আর্জেন্টিনারই জয়জয়কার। কেননা, কেপ ভার্দের অনেকে অভিবাসী হিসেবে রয়েছেন আর্জেন্টিনায়। ১৯২০ থেকে ১৯৫০-এ কাজের সন্ধানে এই অঞ্চল থেকে অনেক অভিবাসী আর্জেন্টিনায় পাড়ি জমান। অর্থনৈতিক মন্দায় অনেকেই নিজ দেশ ছেড়ে সমুদ্রপথে নতুন জীবনের সন্ধানে যান আর্জেন্টিনায়।
সেখানে তারা দক্ষ নাবিক ও জেলের কাজ করতেন। ১৯৮০-এর আদম শুমারি অনুযায়ী আর্জেন্টিনায় কেপ ভার্দে বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে ১৫ হাজারের কাছাকাছি বলে ধারণা করা হয়। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা হোসে রামোস দেলগাদোও কেপ ভার্দের বংশোদ্ভূত ছিলেন।
সেই আর্জেন্টিনাকেই নকআউটে পেয়েছে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসে রূপকথা গড়া কেপ ভার্দে। দলটির কোচ বুবিস্তা লিওনেল মেসিদের মুখোমুখি হওয়ার আগে স্মরণ করিয়ে দিলেন সেটিই, ‘আর্জেন্টিনার সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক। কারণ, অনেক কেপ ভার্দিয়ান সেখানে অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছেন। তবে আমরা নিজেদের কৌশল, ব্যক্তিত্ব, দায়িত্ববোধ আর চরিত্র বজায় রেখেই তাদের বিপক্ষে খেলব। তাদের দলে মেসি আছেন, যার পরিচয় নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই।’
বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউট পর্বে পৌঁছানো সবচেয়ে ছোট দেশ এখন কেপ ভার্দে। আর তারা যেন বিশ্বের সব ফুটবলপ্রেমীর প্রতিনিধি হয়ে মাঠে লড়ছেন।
আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূলের ছোট্ট এই দ্বীপরাষ্ট্রের সমর্থকরা সৌদি আরবের সঙ্গে েগালশূন্য ড্রয়ের পর স্টেডিয়ামের বাইরে মনের আনন্দে নাচছিলেন। স্টেডিয়ামের বাইরের সেই উদযাপনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবল ভক্তরাও শামিল হয়েছিলেন। নিজেদের প্রিয় দলের জার্সি পরেই তারা মাথায় জড়িয়েছিলেন কেপ ভার্দের হ্যাট, গলায় স্কার্ফ কিংবা বুকে দলটির পিন।
মিডফিল্ডে দুর্দান্ত খেলে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতা ডেরয় দুয়ার্তে এমন উৎসব দেখে বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীই আজ আমাদের সমর্থন করছে। এই ভালোবাসা আমাদের প্রাপ্য। আমাদের দেশটি সুন্দর, এখানকার মানুষগুলো দারুণ আর এভাবে বিশ্ব মানচিত্রে কেপ ভার্দেকে তুলে ধরতে পারাটা স্বপ্নের মতো।’
বিশ্বকাপ ৪৮টি দলের হওয়ায় সমালোচনা করেছিলেন অনেকে। এখন কেপ ভার্দের সাফল্য অনেককেই ভাবিয়ে তুলবে যে— এতদিন কেন এই সুযোগ দেওয়া হয়নি!
এখনো আফ্রিকার ৫৩টি দেশের মধ্যে মাত্র ১০টি দেশ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়, যা মহাদেশীয় কনফেডারেশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সর্বনিম্ন অনুপাত। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বমঞ্চে খেলার অভিজ্ঞতা যদি তাদের জন্য অধরাই থেকে যায়, তবে বিশ্ব কীভাবে আশা করে যে এই দলগুলো তাদের সেরা পারফরম্যান্সে পৌঁছাবে?
এটি সমাধান করার দায়িত্ব কেপ ভার্দের নয়। তবে তারা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, এই সমস্যার সমাধান করাটা কতটা জরুরি ছিল।
কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা বলেছেন, ‘আমরা দেখিয়েছি যে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। অবশ্যই আমরা আমাদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি, তবে একই সঙ্গে আমরা পুরো আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিনিধি। আর তার চেয়েও বড় কথা, আমরা পৃথিবীর সব ছোট দেশের প্রতিনিধি হয়ে লড়ছি।’
আমরা আফ্রিকারও প্রতিনিধিত্ব করছি। এটি গর্বের। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের ফুটবলের মান বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। এটি প্রমাণ করে যে মনের জোর, সংকল্প, লক্ষ্য, ইচ্ছা এবং লড়াকু মানসিকতা থাকলে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দেশও যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখাতে পারে।’
আর্জেন্টিনা আর লিওনেল মেসির ভক্ত বুবিস্তা নকআউটে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের পেয়ে ভয়ে কুঁকড়ে যাননি। বরং এটিকে গর্বের মনে হচ্ছে তার, ‘আমাদের নিজেদের এবং কেপ ভার্দের সাধারণ মানুষের— সবারই এই দলটির পারফরম্যান্সে গর্বিত হওয়া উচিত। আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে খেলার এই সুযোগ মেলাটাই আমাদের জন্য এক পরম গর্বের বিষয়। ম্যাচের ফল যা-ই হোক না কেন, বিশ্বকাপের এই নকআউটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসির বিপক্ষে মাঠে নামতে পারাটা আমাদের দেশের জন্য দারুণ ব্যাপার।’




