আনচেলত্তির হাতেই সেলেসাওদের রূপান্তর

সংগৃহীত ছবি
এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে কেউ রাখেনি ফেভারিটের তালিকায়। এই দলের চেহারায়ও অবশ্য ছিল না বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের ছাপ। তবে এই টুর্নামেন্টে এসে কয়েকটি ম্যাচের মধ্য দিয়েই বদলে গেছে তার ভাবমূর্তি। সমর্থকরাও এখন সত্যি সত্যি শুরু করেছে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতে। এই সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন দলে রূপান্তরের মূল কারিগর কার্লো আনচেলত্তি। এই ইতালিয়ান কোচের হাতেই বড় হচ্ছে আন্ডারডগ ব্রাজিলের স্বপ্নটা।
বিশ্বকাপে আসার আগে এই কোচই আকারে-ইঙ্গিতে বলে গেছেন নিজেদের দুর্বলতার কথা। রাশ টেনে ধরেছিলেন সেলেসাওদের হেক্সা জয়ের স্বপ্নে।
২০২২ বিশ্বকাপের পর কঠিন সময় পার করেছে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। কোনো কোচই পারছিলেন না দলটিকে টেনে তুলতে। দেশি কোচের অধীনে উন্নতি হচ্ছিল না মাঠের খেলায়। বাছাই পর্বে কোচ বদলেও সুরাহা হয়নি। একটা পর্যায়ে তারা পড়ে গিয়েছিল তুমুল অনিশ্চয়তার মধ্যে, এই দল কি বিশ্বকাপ খেলতে পারবে? সেই প্রশ্নের উত্তর মিলিয়েছেন আনচেলত্তি।
চারবার কোচ বদলের পাশাপাশি যেন প্রতিভাবান খেলোয়াড় সংকটও একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০০২-এর বিশ্বকাপ জয়ী দলের মতো কোনো তারকা নেই এই দলে। তাই বিশ্বকাপ দল গঠনের জন্য মোট ৯৫ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে বিভিন্ন সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন কোচ। তাকে বিপদে ফেলেছিল ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনে রাজনৈতিক সংকটও। অপসারণ করা হয়েছে সংস্থাটির সভাপতিকেও। সব মিলিয়ে নানা অনিশ্চয়তায় সমর্থকদের মধ্যেও ভর করেছিল হতাশা।
পরিবেশ বদলেছেন আনচেলত্তি
সেখান থেকে দলটির মোড় ঘুরিয়েছেন আনচেলত্তি। অনেক খেলোয়াড়কে ক্যাম্পে রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি দল দাঁড় করিয়েছেন তিনি এবং মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে সমর্থকদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করেছেন। কোচ, খেলোয়াড়দের ওপর থাকা বাইরের চাপ থেকেও রক্ষা করেছেন দলকে।
গোলকিপার আলিসনও মনে করছেন, সবার মনোযোগ ফুটবলে ফেরাতে পেরেছেন কোচ, ‘আমরা কঠিন সময়টা খুব কাছ থেকে দেখেছি। তবে আনচেলত্তি আসার পর পুরো পরিবেশটাই বদলে গেছে। তিনি এমন একটা কর্মপরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে বিতর্ক ও বাইরের সমস্যার বদলে সবাই যেন ফুটবলে মনোযোগ দিতে পারে।’ খেলোয়াড়দের মধ্যেই দলে টিকে থাকার একটা প্রতিযোগিতা তৈরি করেছিলেন এই ইতালিয়ান কোচ।
দলের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার মার্কিনিয়োসের কণ্ঠেও একই সুর, ‘আমাদের দল তখন ভালো অবস্থায় ছিল না। কিন্তু আনচেলত্তি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনেছেন। তিনি খুব বুদ্ধিমান, খেলোয়াড়দের সেরাটাও বের করে আনতে জানেন এবং কীভাবে তাদের আরও উন্নত করা যায়, সেই ব্যবস্থা করেছেন। আমাদের মানসিকতা বদলে দিয়েছেন এবং ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছেন তিনি।’
মোড় ঘুরিয়েছেন জাপান ম্যাচ দিয়ে
জাপানের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল এই কোচের জন্য বড় পরীক্ষা। এই ম্যাচের আগে ছিল অনেক শঙ্কা ও সংশয়, প্রতিপক্ষের হুংকার এবং সংবাদ মাধ্যমের প্রচারণায় আনচেলত্তির ব্রাজিলের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়েছিল জাপান। তা ছাড়া পরিসংখ্যানও ছিল বিপক্ষে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আগে গোল হজম করলে ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস ধসে পড়ত। ২০২৩ সালের পর ব্রাজিল ১২টি ম্যাচে প্রথম গোল খেয়ে হেরেছে সাতটি ও ড্র করে চারটি। জাপান ম্যাচে আগে গোল খেয়েও ২-১ গোলে ম্যাচ জিতে ব্রাজিল নতুন মানসিক শক্তির পরিচয় দিয়েছে।
ওই ম্যাচে জয়সূচক গোল করা গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি কোচের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ‘আনচেলত্তি একজন অসাধারণ মানুষ। তার শিরোপা জেতার কারণটা সহজেই বোঝা যায় এই ম্যাচ দিয়ে। বিরতির সময় তিনি বলেছিলেন, আমরা সমতা ফিরিয়ে আনব, তারপর জিতব। তার শরীরি ভাষা বলে দিয়েছিল, তিনি কতটা শান্ত। এই আত্মবিশ্বাসই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন আমাদের মধ্যে।’
জাপান ম্যাচের পরই আসলে নতুন ব্রাজিল হয়ে তারা সামনে আসবে আজ নরওয়ের বিপক্ষে। এই ব্রাজিলে আত্মবিশ্বাস আছে, ম্যাচ ঘোরানোর সামর্থ্য আছে।
নেইমারকে বেঞ্চে রাখার সাহস
অন্য আনচেলত্তিকে দেখা গেছে দল নির্বাচনেও। নিজের কৌশল অনুযায়ী এই ইতালিয়ানের মাথায় আছে ম্যাচের সেরা একাদশ। সেখানে এখনো নেইমার নেই, গত চার ম্যাচে ছিলেন না ব্রাজিল ফুটবলের পোস্টারবয়। কোচ মুখে বলছেন, এই ফরোয়ার্ড ৯০ মিনিট খেলার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু খেলাচ্ছেন না।
কারণ তার বিশ্বাস আছে একাদশের ওপর, নিজের কৌশলের ওপর। তার বাইরে হাঁটতে চান আনচেলত্তি। কোনো দেশি কোচ বা অনভিজ্ঞ কেউ হলে হয়তো এমন তারকার চাপ উপেক্ষা করতে পারতেন না। কিন্তু এই ইতালিয়ানের নিজের কৌশল ও সাজানো একাদশের ওপর এতটাই বিশ্বাস যে এখনো নেইমার ছাড়া চলছে ভালো। তবে প্রয়োজনে নামাবেন তাকে। কোনো চাপে সিদ্ধান্ত বদলানোর মানুষ তিনি নন। তাতেই আন্ডারডগ ব্রাজিলের গ্রাফটা উঠছে ওপরের দিকে।




