অদম্য ফ্রান্সকে থামানোর মন্ত্র জানে স্পেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ফরাসি বিপ্লবের পর যে বিশৃঙ্খলা চলছিল, নেপোলিয়ান বোনাপার্ট সেই অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে ফ্রান্সের রাষ্ট্রকাঠামোকে একটি স্থায়ী, সুশৃঙ্খল ও আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। দিদিয়ের দেশম যখন ফ্রান্সের জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব নেন, তখনো দলটার ভেতর বিদ্রোহের ক্ষত। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপে কোচ রেমন্ড ডমেনেখের সঙ্গে নিকোলাস আনেলকার বিরোধ থেকে খেলোয়াড়দের বিদ্রোহ, সেই জের ধরে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের প্রধানের পদত্যাগ। ২০১২ সালের ইউরোর দ্বিতীয় রাউন্ডে স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হারল ফ্রান্স, পদত্যাগ করলেন লরা ব্লঁ আর তার জায়গায় দায়িত্ব নিলেন দেশম।
ধীরে ধীরে দলের ভেতর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছেন, তারকা খ্যাতির চেয়ে দলের জন্য অবদানকে দিয়েছেন গুরুত্ব আর জোর দিয়েছেন একাডেমিগুলোতে তরুণ প্রতিভা তুলে আনার প্রক্রিয়ায়। ঠিক যেভাবে নেপোলিয়ান অভিজাত্য ও বংশ মর্যাদার বদলে জোর দিয়েছেন মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতায়। ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নকে হেরে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল সেন্ট হেলেনা দ্বীপে, দেশমের জন্য সেই ‘ওয়াটারলু’ হয়ে যেতে পারে ডালাস। গত দুই বছরে স্পেনের কাছে দুটি বড় আসরের সেমিফাইনালে হেরেই যে বিদায় নিতে হয়েছে ফ্রান্সকে। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগে সেই দুঃস্বপ্নই তাড়া করে ফিরবে দেশমকে।
খেলাধুলার তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান অপটা বেশ কিছু চমৎকার তথ্য দিয়েছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের চার দলকে নিয়ে। তাদের তথ্য-বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রতি ৯০ মিনিটের খেলা (অতিরিক্ত সময়ের গোল বাদ দিয়ে) সবচেয়ে বেশি গড় গোল ফ্রান্সের। ম্যাচপ্রতি যা ২.৭। সবচেয়ে কম স্পেনের, ১.৮। যদিও গোলমুখী শটের সংখ্যার গড়ে দুই দল একদম সমান, ১৮.৩। তবে সেই শটগুলোকে গোলে রূপান্তরের হারে পিছিয়ে আছে স্পেন, ফ্রান্সের সাফল্য ১৫ আর স্পেনের ১০ শতাংশ।
ফ্রান্সের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা ড্রিবল করতে ভালোবাসেন, চার সেমিফাইনালিস্টদের ভেতর তাদের ড্রিবল করার হার সবচেয়ে বেশি; ২৩.২ শতাংশ। তবে ড্রিবল করতে গিয়ে বলের দখল খোয়ানোর হারও তাদেরই বেশি। হাওয়ায় ভেসে আসা বল দখলেও ফরাসিরা এগিয়ে, ৬৮ শতাংশ যেখানে স্প্যানিশদের সেটা ৬১ শতাংশ।
ফুটবলটা শেষ পর্যন্ত অঙ্কের খেলা নয়, মাঠের লড়াই আর কৌশলের সফল প্রয়োগ। জাতীয় দলে কখনোই না খেলা লুই দে লা ফুয়েন্তে তার স্প্যানিশ দলটাকে পজেশনভিত্তিক ফুটবলের ছন্দ রপ্ত করিয়েছেন, তবে প্রয়োজনে তারাও যে গোলের মালাও বুনতে পারে সেটা দেখা গেছে নেশনস লিগের সেমিফাইনালে।
ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নকে হারতে হয়েছিল ভুল কৌশল নেওয়ার কারণে। বৃষ্টিতে যুদ্ধক্ষেত্র কাদাময় হয়ে যাওয়ায় নেপোলিয়ন কাদা শুকাতে খানিকটা দেরি করেছিলেন, এরই মধ্যে ব্রিটিশদের সহযোগিতায় প্রুশিয়ান সেনা সময়মতো যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে যায়। তা ছাড়া নেপোলিয়নের প্রধান সেনাপতি মার্শাল মিশেল নে মনে করেছিলেন ব্রিটিশরা পিছু হটছে, তাই পদাতিক ও গোলন্দাজ বাহিনী ছাড়াই আক্রমণ করে বসেন এবং এতে করে ফরাসিরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।
ওয়াটারলুর যুদ্ধের মতো দেশমের শিষ্যরাও যদি স্পেনের মাঝমাঠের পেদ্রি ও রোদ্রির চতুর পাসের বুননে বলের পিছু ধাওয়া করে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে প্রতিআক্রমণে গোল হজম করে ফেলার আশঙ্কাটা বেশি। একই কৌশলে পর্তুগাল ও বেলজিয়ামকে ঘোল খাইয়েছে স্প্যানিশরা। আবার মার্শাল মিশেল নের মতো সবাই মিলে আক্রমণে উঠে এলেও ওলমো এবং ইয়ামালের দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে গোল হজমের আশঙ্কাও কম নয়। দুটি বড় ম্যাচে হারের পর দেশমের নিশ্চয়ই বুঝে ফেলার কথা, কী করে আটকাতে হবে এই স্প্যানিশদের। এরপর বাকিটা ভাগ্য।




