দ্রুততম ১০০ গোল : আসল রহস্য গরম-বিরতি নাকি বল

ছবি: রয়টার্স
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে ১৯৫৮ সালের পর দ্রুততম সময়ে ১০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করার রেকর্ড গড়েছে। মাত্র ৩৩ ম্যাচেই এই রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলেছে এবারের আসর। শনিবার নেদারল্যান্ডসের ৫-১ ব্যবধানে সুইডেনকে হারানোর ম্যাচে লিভারপুলের ফরোয়ার্ড কোডি গাকপো দলের চতুর্থ গোলটি করে এই ‘সেঞ্চুরি’ পূর্ণ করেন।
৬৮ বছরের মধ্যে এই প্রথম তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে মাত্র ৩৩টি ম্যাচ লাগল। এর চেয়ে দ্রুততম সময়ে ১০০ গোল হয়েছিল কেবল ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড । সেবার মাত্র ২০ ম্যাচেই হয়েছিল ১০০ গোল। বিবিসি স্পোর্টসকে ইংল্যান্ডের ২০২২ ইউরো জয়ী তারকা এলেন হোয়াইট গোল উৎসব নিয়ে বলেছেন, ‘আমার দেখা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আঁটসাঁট ও কৌশলগত ম্যাচ ছিল নেদারল্যান্ডস- জাপান, আর সেই ম্যাচেও কিন্তু চার গোল হয়েছে।' ২০১৪ ও ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে ১০০ গোল হতে লেগেছিল ৩৬ ম্যাচ। আবার ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা এবং ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে লেগেছিল ৩৮টি করে ম্যাচ।
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচ প্রতি গড়ে ৩.০৯টি গোল হচ্ছে। এই গতি বজায় থাকলে টুর্নামেন্ট শেষে মোট গোল ৩০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, কেন মাত্র ৩৩টি ম্যাচেই ১০০ গোল হয়ে গেল? গোলরক্ষকরা কি বলের সাথে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন?
শুরু থেকেই ছন্দে তারকারা
এবারের আসরে গোলবন্যার আরেকটি বড় কারণ হলো, বিশ্বসেরা তারকা ফরোয়ার্ডরা টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ফর্মে আছেন।
লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছেন, কিলিয়ান এমবাপ্পে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছেন, আর ভিনিসিয়াস জুনিয়র ব্রাজিলের দুটি ম্যাচের প্রতিটিতেই গোল পেয়েছেন।
২০২৫-২৬ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ২৭ গোল করে প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুট জেতা আর্লিং হলান্ড ইরাকের বিপক্ষে নরওয়ের ৪-১ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন। তেমনি ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের জয়ে অধিনায়ক হ্যারি কেইনও করেছেন জোড়া গোল।
টমাস ফ্রাঙ্ক আরও যোগ করেন, "আমরা এর আগে অনেক বিশ্বকাপ বা ইউরোতে দেখেছি যে, ক্লাব ফুটবলের কঠিন মৌসুম পার করে আসার পর বড় বড় খেলোয়াড়রা পুরোপুরি ফিট থাকেন না, যেমনটি দুই বছর আগে ইউরো ২০২৪-এ হ্যারি কেইনের ক্ষেত্রে হয়েছিল। কিন্তু এবার হ্যারি কেইন, লিওনেল মেসি বা আর্লিং হলান্ডের মতো মূল খেলোয়াড়রা দারুণ ছন্দে আছেন এবং তাদের শতভাগ ফিট দেখাচ্ছে।"
ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক ডিফেন্ডার মাইক রিচার্ডস বিবিসি স্পোর্টসকে বলেছেন, ‘এবারের বিশ্বকাপে ফরোয়ার্ডদের আত্মবিশ্বাস দেখার মতো। মনে হচ্ছে মাঠে নামা প্রতিটি খেলোয়াড়ই বিশ্বাস করে যে সে গোল পাবে এবং সবাই নিজেদের ওপর ভরসা রাখছে। এবারের বিশ্বকাপ কৌশলের চেয়েও বেশি যেন ভালো লাগা আর আত্মবিশ্বাসের টুর্নামেন্ট হয়ে উঠেছে।’
অতিরিক্ত গরমও কি কারণ?
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপের গোল গড় ছিল ম্যাচ প্রতি ২.৬৯, যা মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র গরম এড়াতে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এবার উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মকালীন উত্তাপে ম্যাচ প্রতি গোল হচ্ছে ৩.০৯টি।তাহলে তীব্র গরমের কারণে খেলোয়াড়রা কি দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন, আর সেই সুযোগে বেশি গোল হচ্ছে?
জার্মানি-আইভরি কোস্টের ম্যাচ পর্যন্ত হওয়া মোট ১০৫টি গোলের মধ্যে ৩০টি গোলই এসেছে ম্যাচের ৭৬ মিনিট থেকে খেলা শেষের বাঁশি বাজার মধ্যবর্তী সময়ে (যা মোট গোলের ২৮.৬%)। এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা হবে ইতিহাসের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ এবং ২০১৪ সালের পর সবচেয়ে বেশি দেরিতে হওয়া গোলের রেকর্ড।
পাশাপাশি, খেলোয়াড়দের মারাত্মক ভুলের খেসারত হিসেবেও অনেক গোল হচ্ছে। যেমন, তিউনিসিয়ার এলিয়েস সখিরি সুইডেনের বিপক্ষে নিজেদের ডি-বক্সের কাছে বল হারিয়ে ফেলেন, যা থেকে সহজেই গোল পায় সুইডেন। তিউনিসিয়ার খেলোয়াড়রা প্রথম ম্যাচে মোট ৬টি এমন ভুল করেছিলেন যা থেকে প্রতিপক্ষ শট নেওয়ার সুযোগ পায়, এবং গ্রাহাম পটারের সুইডেন ৫-১ ব্যবধানে জেতে।
অন্যদিকে, ম্যাচের মাঝে দেওয়া ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানি পানের বিরতি নিয়ে অনেক দর্শক অসন্তোষ প্রকাশ করলেও, এটি কি দলগুলোকে নতুন করে গুছিয়ে নিয়ে গোল করতে সাহায্য করছে?
১০৪টি ম্যাচের প্রতিটিতেই খেলোয়াড়দের তরল জাতীয় খাবার গ্রহণের জন্য বাধ্যতামূলক ৩ মিনিটের বিরতি দেওয়া হচ্ছে। তবে কোচরা এই সময়টাকে শুধু পানি পানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলোয়াড়দের নতুন কৌশল শেখাতে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে ব্যবহার করছেন।
যেমন, নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ব্রাজিল ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু প্রথমার্ধের ড্রিংকস ব্রেকের পর মাঠে ফিরেই ১০ মিনিটের মধ্যে তারা সমতা ফিরিয়ে আনে।
সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন বলেন, ‘এই সময়ে আপনি খেলোয়াড়দের সরাসরি বুঝিয়ে দিতে পারেন কী করতে হবে। আমরা তাদের স্ক্রিনে ছবি বা ভিডিও দেখাতে পারি। এই তিন মিনিটে আমরা তাদের সাথে কথা বলতে পারি, ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন বা বদলি খেলোয়াড় নামানোর বিষয়ে আলোচনা করতে পারি।’
গোলরক্ষকরা কি বলের কারণে ভুগছেন?
গত ১১ জুন মেক্সিকোর হুলিয়ান কুইনোনেস দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে এবারের বিশ্বকাপের প্রথম গোলটি করেছিলেন। মেক্সিকো সিটির সেই উদ্বোধনী ম্যাচের পর থেকে গোলবন্যা যেন থামছেই না।
১৪ জুন হিউস্টনে নবাগত কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে জার্মানির ৭-১ গোলের বিশাল জয় থেকে শুরু করে, চার দিন পর ভ্যাঙ্কুভারে কাতারের বিপক্ষে কানাডার ৬-০ গোলের দাপুটে জয়, চারদিকে শুধু গোলের মহোৎসব চলছে।
ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে সেনেগালের বিপক্ষে করেছিলেন জোড়া গোল। গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মঁদিকে প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে পরাস্ত করে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি, যা ছিল এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দূরপাল্লার গোল।
প্রথম রাউন্ডের ম্যাচগুলোতেই ২২ গজের বেশি দূর থেকে মোট ৫টি গোল হয়েছে। এর মধ্যে দুটি গোল করেছেন সুইডেনের ইয়াসিন আয়রি, তিউনিসিয়ার বিপক্ষে যথাক্রমে ২৪.৮ এবং ২৪.৩ গজ দূর থেকে। বাকি দুটি গোল করেছেন অস্ট্রেলিয়ার কনর মেটকাফ (তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ২৫.৬ গজ থেকে) এবং মরক্কোর ইসমায়েল সাইবারি (ব্রাজিলের বিপক্ষে ২৪.৭ গজ থেকে)।
ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক জো হার্ট বিবিসি স্পোর্টসকে বলেছেন,‘ বিশ্বকাপের বল নিয়ে খুব বেশি অভিযোগ নেই। তবে গোলরক্ষকরা কিছু ক্ষেত্রে মনে হয় বলের গ্রিপ বা গতি বুঝতে হিমশিম খাচ্ছেন।’ গত ১৭ জুন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়ার মার্টিন বাতুরিনার সমতাসূচক গোলের বলটি জর্ডান পিকফোর্ডের দিকে ধারণার চেয়েও অনেক বেশি দ্রুতগতিতে ছুটে গিয়েছিল।
বিবিসি স্পোর্টসের হয়ে কাজ করা ইংল্যান্ডের আরেক সাবেক গোলরক্ষক পল রবিনসন বলেছেন,‘দুই-একবার দেখা গেছে ফুটবলটি যেভাবে বাতাসে ভেসে আসার কথা, ঠিক সেভাবে আসেনি। এটা সত্যিই নজরে রাখার মতো।"
বিশ্বকাপের বল নিয়ে বিতর্ক অবশ্য এটাই প্রথম নয়। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে 'জাবুলানি' বলটি বাতাসে আকস্মিক বাঁক খাওয়া ও ড্রপ করার জন্য বেশ পরিচিতি পেয়েছিল। যার ফলে সেবার দূরপাল্লার অনেক গোল হয়েছিল। সেই বিশ্বকাপে ১৪৫টি গোলের মধ্যে ২৬টি হয়েছিল ডি-বক্সের বাইরে থেকে।
বড় আসরই কি গোল বন্যার কারণ?
এবারের বিশ্বকাপে গোলশূন্য ড্র বা ‘টাই’ হওয়া ম্যাচ যেন ব্রাজিলের হয়ে নেইমারের মাঠে নামার মতোই বিরল ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন ফরম্যাটে ৪৮টি দলের মোট ১০৪টি ম্যাচের এই বিশাল টুর্নামেন্টে ৩৩টি ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও গোলশূন্য ড্র হয়েছে মাত্র একটি।
তবে নবাগত কেপ ভার্দের জন্য সেটি ছিল এক স্মরণীয় ড্র, যারা ১৫ জুন আটলান্টায় ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোল করতে দেয়নি।
এবারের বর্ধিত আসরে কেপ ভার্দে ছাড়াও কুরাসাও, জর্ডান এবং উজবেকিস্তান— এই চারটি দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে। কেপ ভার্দে স্পেনকে রুখে দিলেও, আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ কুরাসাও কিন্তু নিজেদের প্রথম ম্যাচেই জার্মানির কাছে ৭ গোল হজম করেছে।
ব্রেন্টফোর্ড ও টটেনহ্যামের সাবেক কোচ টমাস ফ্রাঙ্ক বলেছেন, ‘অবশ্যই, টুর্নামেন্টে দলের সংখ্যা বাড়ায় এবং অপেক্ষাকৃত নিচের সারির দলগুলো সুযোগ পাওয়ায় খেলার মানে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে জার্মানি বনাম কুরাসাওয়ের মতো দু-একটি ম্যাচ বাদ দিলে, খুব বেশি দল কিন্তু এখন পর্যন্ত অসহায়ভাবে উড়ে যায়নি।’
ফিফা র্যাংকিংয়ের ৬৮ নম্বরে থাকা জর্ডান অস্ট্রিয়ার কাছে ৩-১ গোলে হেরে তাদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছে, আর উজবেকিস্তানও কলম্বিয়ার কাছে একই ব্যবধানে হেরেছে।
ম্যাচগুলোর মাঝে লম্বা বিরতিও কি এত বেশি গোল হওয়ার পেছনে কোনো ভূমিকা রাখছে? যেমন— ১১ জুন উদ্বোধনী ম্যাচ খেলার পর মেক্সিকোকে তাদের দ্বিতীয় ম্যাচের (দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে) জন্য পুরো এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই বিরতি কি শক্তিশালী দলগুলোকে আরও সতেজ হয়ে মাঠে নামার বাড়তি সুযোগ করে দিচ্ছে?




