আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনি
মেসি উড়লে সব প্ল্যান ডাস্টবিনে
- বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর আগেই লিওনেল স্কালোনি প্রাণ খুলে কথা বলেছেন আর্জেন্টিনার দৈনিক ‘ওলে’র কাছে। বলেছেন বিশ্বের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে নিয়েও। আর্জেন্টিনা দলে তার প্রভাব এবং সামনের বিশ্বকাপ নিয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে দেওয়া হয়েছে

প্রশ্ন: আপনি খেলোয়াড় এবং কোচ মিলিয়ে আপনার চতুর্থ বিশ্বকাপে পা রাখতে যাচ্ছেন, এ তথ্যটা কি মাথায় ছিল
স্কালোনি: চতুর্থ কেন? ও আচ্ছা, খেলোয়াড় হিসেবে যেটা খেলেছিলাম (২০০৬ বিশ্বকাপ)! হ্যাঁ, সত্যিই তো, এটা আমার চতুর্থ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। সত্যি বলতে, অনুভূতিটা একবারে অনন্য। আসলে আমি এই হিসাবটা রাখিনি, কারণ আমার মাথায় এখন একটাই চিন্তা— আমি এই দলের কোচ।
প্রশ্ন: ২০০৬ বিশ্বকাপে খেলোয়াড় হিসেবে কাটানো দিনগুলোর সঙ্গে বর্তমানের এ কোচিংয়ের ভূমিকার পার্থক্য কী?
স্কালোনি: প্রতিদিনের অনুভূতির দিক থেকে এর কোনো তুলনাই হয় না। খেলোয়াড় হিসেবে আপনার একমাত্র চিন্তা থাকে শরীর ঠিক রাখা, ভালোভাবে রিকভারি করা এবং ফিট থাকা। কিন্তু কোচিং স্টাফে থাকলে আপনার মাথায় ২৪ ঘণ্টাই ভুতুড়ে চিন্তা ঘুরপাক খাবে, মাথা সবসময় সচল থাকবে— দলকে এভাবে খেলাব নাকি ওভাবে, প্রতিপক্ষ এখান দিয়ে আক্রমণ করলে কী হবে, ওখান দিয়ে করলে কী হবে। খেলোয়াড়দের মাথায় এই চাপ থাকে না। সত্যি বলতে, পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল।
আমাদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খেলোয়াড় সবসময় একই থাকে। এটা অনেক সাহায্য করে; কারণ যখন সবাই একসঙ্গে ক্যাম্পে জড়ো হয়, তখন সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে যায়
প্রশ্ন: ফুটবলাররা এ সময়টায় কেমন অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়, তা তো আপনি ভালো করেই জানেন।
স্কালোনি: হ্যাঁ, দলে সব ধরনের খেলোয়াড়ই রয়েছে। কিছু খেলোয়াড় আছে যারা নিজে থেকে এসে পরামর্শ করে, তখন বোঝা যায় তারা ট্যাকটিকস নিয়ে কতটা ভাবছে। আবার অনেকে আছে যারা ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় না, সরাসরি আসল কাজে মন দেয়। এ কারণেই আমরা যখন ওদের কোনো তথ্য দিই, ঠিক ততটুকুই দিই, যা ওদের জন্য জানা জরুরি।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে জাতীয় দলের সার্বিক অবস্থা কেমন?
স্কালোনি: আমরা ভালো অবস্থায় আছি। ভাগ্যবশত আমাদের দলে একটা চেনা ভিত্তি আছে। আমাদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খেলোয়াড় সবসময় একই থাকে। এটা অনেক সাহায্য করে; কারণ যখন সবাই একসঙ্গে ক্যাম্পে জড়ো হয়, তখন সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে যায়। একে অন্যকে চেনা, আমাদের খেলার ধরন এবং আমরা কী চাই— তা জানা থাকার কারণে কোনো সমস্যা হলে খুব সহজেই কাটিয়ে ওঠা যায়।
আগে থেকে কোনো নিখুঁত ‘মাস্টারপ্ল্যান’ তৈরি করে রাখা বোকামি। মেসি যদি মাঠে উড়তে শুরু করে, তবে সব প্ল্যান ডাস্টবিনে চলে যাবে! পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়াই আমাদের আসল পরিকল্পনা
প্রশ্ন: তারকা খেলোয়াড়দের সামলানো সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ। মেসির সাবেক সতীর্থ হওয়াটা কোচিং করানোর ক্ষেত্রে কতটা সাহায্য করেছে?
স্কালোনি: আগে একসঙ্গে খেলার কারণে কিছু বাড়তি সুবিধা তো অবশ্যই পাওয়া যায়, কারণ আপনি তাকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে কাছ থেকে দেখেছেন। কোচ এবং খেলোয়াড়ের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি এবং আমি তা করি। মেসির প্রতিদিনকার স্বভাব ও ড্রেসিংরুমের পরিবেশটা আগে থেকে চেনা থাকার কারণে আমি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলাম।
প্রশ্ন: মেসিকে সেই ‘পোস্টার বয়’ বা অতিমানবীয় রূপ থেকে বের করে দলের একজন করে তুললেন কীভাবে?
স্কালোনি: বাকিদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের সহজ হওয়ার সুযোগ দিয়ে। তবে বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা অনেক বেশি সাহসী ও স্পষ্টবাদী। তারা অনায়াসে মেসির সঙ্গে গিয়ে গল্প করতে পারে, ছবি তুলতে পারে। আমাদের সময় এমন ছিল না।
এই দল যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম। বল জালে জড়াবে কি জড়াবে না, তা আমাদের হাতে নেই, তবে মাঠের ১১ জন খেলোয়াড়ের প্রত্যেকেই দেশের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে লড়বে
প্রশ্ন: আপনার অধীনেই মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে চারটি ট্রফি জিতলেন এবং এখন তিনি তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে। এ পুরো বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন?
স্কালোনি: সে যতদিন চাইবে ততদিন খেলবে, কারণ সে কে, তা আমরা সবাই জানি। মেসি ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছে— এটা মোটেও আশ্চর্যের কিছু নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আর্জেন্টিনার হয়ে মাত্র চারটি শিরোপা জিতেছে! সে তো আরও দুটি কোপা আমেরিকা এবং একটি বিশ্বকাপ জেতার একদম দ্বারপ্রান্তে ছিল। এত কিছু জেতার পরও এখনো একইরকম ক্ষুধার্ত, একইরকম লড়াকু এবং একই ইচ্ছা নিয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে।
প্রশ্ন: কোপা আমেরিকার ফাইনালে যখন ইনজুরির কারণে মেসিকে মাঠ থেকে উঠে যেতে হলো এবং বেঞ্চে বসে কাঁদছিল, সেটাই কি সেই নিবেদনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ?
স্কালোনি: মেসি শুধু ফুটবল খেলতে চায়। ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে মাঠের বাইরে চলে যাওয়াটা তার জন্য ছিল এক চরম দুঃসহ যন্ত্রণা। সে আমাদের সঙ্গে কতটা ত্যাগ স্বীকার করে খেলেছে, তার এমন অনেক গল্প আছে, যা আমি ক্যামেরার সামনে বলতে পারব না। যখন নিজে থেকে মাঠ ছাড়ার ইশারা করে, তখন বুঝতে হবে সত্যিই বড় কোনো সমস্যা হয়েছে। ওই ফাইনালের পর মেসি কতদিন মাঠের বাইরে ইনজুরিতে ছিল, তা আপনারা দেখেছেন। ওটাই তার আসল পরিচয়। এ ছবিগুলো চিরকাল ফুটবলের ইতিহাসে থেকে যাওয়া উচিত। অনেকে হয়তো বলতে পারে— ‘তুমি তো বিশ্বকাপ জিতেছ, তাহলে একটা কোপা আমেরিকার ম্যাচে মাঠ থেকে ওঠার জন্য এভাবে কাঁদছ কেন?’ কিন্তু ব্যাপারটা ট্রফি জেতার নয়, ব্যাপারটা হলো— সে মাঠের ভেতর সতীর্থদের সঙ্গে থেকে ফুটবলটা খেলতে চেয়েছিল। কিছু জিনিস শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না, ছবিটাই সব কথা বলে দেয়।
প্রশ্ন: লিও তো মাঠ থেকে সহজে উঠতে চান না... এই বিশ্বকাপে যেখানে ম্যাচের সংখ্যা বেশি, ইন্টার মায়ামির মতো এখানেও কি তার ম্যাচ টাইম কিছুটা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা আছে?
স্কালোনি: আমরা তাকে নিয়ে যে সিদ্ধান্তই নিই না কেন, তার সঙ্গে কথা বলেই নিই। আমি একা একা ড্রেসিংরুমে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম— এমনটা মেসির ক্ষেত্রে খাটে না এবং এ সম্মানটা তার পাওয়া প্রাপ্য। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি সে কেমন বোধ করছে এবং দুজন মিলেই সিদ্ধান্ত নিই। কারণ, মাঠে শতভাগ ফিট না থাকলেও তার উপস্থিতি প্রতিপক্ষের মনে যে ত্রাস সৃষ্টি করে, তা আমাদের জন্য অনেক বড় সুবিধা। প্রতিপক্ষ তো আর জানে না সে কতটা ইনজুরিতে আছে! সে মাঠে থাকাই আমাদের জন্য অবিশ্বাস্য শক্তির উৎস। তবে সেই সঙ্গে মানসিক অবস্থা বা ম্যাচ পরিস্থিতিও আমাদের দেখতে হয়। যেমন, কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে যখন আমরা ১০ জন হয়ে গিয়েছিলাম, সে নিজেই আমাকে ইশারা করেছিল বদলে দেওয়ার জন্য। তাই আগে থেকে কোনো নিখুঁত ‘মাস্টারপ্ল্যান’ তৈরি করে রাখা বোকামি। সে যদি মাঠে উড়তে শুরু করে, তবে সব প্ল্যান ডাস্টবিনে চলে যাবে! পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়াই আমাদের আসল পরিকল্পনা।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
স্কালোনি: বার্তা একটাই— আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দেব। এই দল যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম। বল জালে জড়াবে কি জড়াবে না, তা আমাদের হাতে নেই, তবে আমরা এটুকু নিশ্চিত করতে পারি যে, মাঠের ১১ জন খেলোয়াড়ের প্রত্যেকেই দেশের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে লড়বে। মাঠে নেমে তারা নিজেদের উজাড় করে দেবে— এটাই আমাদের গ্যারান্টি।
প্রশ্ন: বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর থেকে এই বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত পথচলাটা আপনি কতটা উপভোগ করেছেন?
স্কালোনি: বিশ্বকাপ জেতার পর আমার জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত এসেছিল, যা খুব কঠিন ছিল না, তবে আমি মানসিক ও মানসিকভাবে প্রচণ্ড ক্লান্ত (overwhelmed) বোধ করছিলাম। আমাকে খেলাধুলা এবং পরিবার— দুদিক নিয়েই কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবতে হচ্ছিল। যখন আমি নিজের মাথা ও জীবনটা গুছিয়ে নিতে পারলাম, তখন থেকে আবার উপভোগ করা শুরু করলাম। আমরা আবার কোপা আমেরিকা জিতলাম, দল ভালো খেলছে। সত্যি বলতে, বিশ্বকাপ জেতার প্রায় ছয় মাস বা এক বছর পর থেকে আমি আবার এই দলের কোচিং উপভোগ করা শুরু করেছি।




