১৭টি বিশ্বকাপ মাঠে বসে দেখেছি

১৯৫৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ কাভার করেছিলেন আর্জেন্টাইন সাংবাদিক এনরিকে মাকায়া মার্কেস। তখন তার বয়স মাত্র ২৩ বছর। বিশ্বকাপ কাভার করেছিলেন ‘রেডিও বেলগ্রানো’র হয়ে। এরপর কর্মস্থল অনেকবার বদল হলেও টানা ১৭টি বিশ্বকাপ কাভার করেছেন তিনি। ৯১ বছর বয়সেও তৈরি ১৮তম বিশ্বকাপের জন্য। বিশাল অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘ওলে’-তে দেওয়া তার সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো
প্রশ্ন: আপনি খেলা দেখার সময়, টেলিভিশনের সাউন্ড চালু রাখেন নাকি বন্ধ রাখেন? আজকের যুগের ধারাভাষ্যকার ও বিশ্লেষকদের কথা কি আপনি শোনেন?
মাকায়া মার্কেস: এটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, তবে সাধারণত আমি তাদের কথা শুনি।
প্রশ্ন: তাদের সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
মাকায়া: আমার মনে হয় সাংবাদিকতা বর্তমানে সঠিক পথেই রয়েছে। কারণ, তারা অন্ধ ‘ফ্যানডম’ বা একপেশে পক্ষ নেওয়ার প্রবণতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। অর্থাৎ, তারা ফুটবলের মূল ধারণার মধ্য দিয়ে যৌক্তিক কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। অন্যকে সম্মান জানিয়ে অনেক বেশি পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করা এখন সম্ভব হচ্ছে। এখানে কোনো অন্ধ ভক্ত বা পক্ষপাতিত্বের জায়গা নেই।
প্রশ্ন: এত বেশি ভিএআরের ভিড়ে ফুটবল রোমাঞ্চ উপভোগ করেন কীভাবে?
মাকায়া: একটা সময় আমরা ‘টেলিবিম’ (এক ধরনের গ্রাফিকস প্রযুক্তি) প্রযুক্তিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছিলাম। কিন্তু সেটি ছিল বিশ্লেষণের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যেখানে যৌক্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে সবকিছু ফুটিয়ে তোলা হতো। ভিএআর খুবই বিভ্রান্তিকর; এতে স্বচ্ছতার অভাব এবং কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। তবে এটি নিয়মনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এর থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই; প্রতি ম্যাচে এমন ১০টি পেনাল্টি থাকে, যা রেফারিরা বাঁশিতে ফুঁ দিয়েও এড়িয়ে যান বা দেওয়া হয় না। পেনাল্টি বক্সের ভেতরে সবাই একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে টেনে ধরে রাখে। যখন কোনো কর্নার কিক নেওয়া হয়, তখন দেখা যায় সবাই সবাইকে জড়িয়ে ধরে টানাটানি করছে এবং কেউ একটি কথাও বলছে না। এটি এক ধরনের পাগলামি, তাই না? রেফারিরা যদি এই ধরনের টানাটানি এবং ফালতু আচরণের জন্য পেনাল্টি দেওয়া শুরু করেন, তবে এসব টেনে ধরা বন্ধ হয়ে যাবে এবং খেলাটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। এটি তো গেল একদিকের কথা। এর বাইরেও আরও বিষয় রয়েছে— যেমন হ্যান্ডবলের ব্যাখ্যা। হ্যান্ডবলের ব্যাখ্যা কীভাবে করতে হবে, তা এখনো কেউ সঠিকভাবে জানে না।
প্রশ্ন: অফসাইডের ক্ষেত্রে যে রেখাগুলো টানা হয়, যা মাঝেমধ্যে বেশ অদ্ভুত দেখায়, এগুলো কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
মাকায়া: এটি মোটেও সহজ কাজ নয়, এটি বেশ কঠিন। কারণ, এটি ক্যামেরার কোণ বা অ্যাঙ্গেলের ওপর নির্ভর করে। আসল বিষয়টি হলো, আমরা ছিলাম এমন সাংবাদিক যাদের ফুটবল সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হতো, যা আমাদের নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করতে হতো। কারণ, এই খেলাটি আমরা ভালোবাসতাম। অন্যদিকে, নিয়মের সঠিক ব্যাখ্যা করার একটি বিষয় ছিল। আমরা মাঠে যা দেখছিলাম, তা যেন আরও ভালোভাবে এবং কম ভুলত্রুটি সহকারে বিশ্লেষণ করা যায়, সেই চেষ্টাই সবসময় করতাম।
প্রশ্ন: ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপের সময় ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ইংল্যান্ডের যুদ্ধ চলছিল।
মাকায়া: সেই সময়টি ছিল অত্যন্ত কঠিন। কারণ দেশে কী ঘটছে, তা আমরা জানতে পারতাম, কিন্তু কেন এমনটা ঘটছে, তা বুঝে ওঠা কঠিন ছিল। আর্জেন্টিনার কোচ ছিলেন একজন বামপন্থী চিন্তাধারার মানুষ, আমি অবশ্যই সিজার লুইস মেনত্তির কথা বলছি। তবে তিনি মন থেকে চেয়েছিলেন যেন জাতীয় দল জেতে। খেলোয়াড়দের মধ্যে মতাদর্শগত নানা ভিন্নতা ছিল, কিন্তু তারা সবাই চেয়েছিল জাতীয় দল যেন জয়ী হয়। সংবাদমাধ্যম বিভক্ত ছিল, কিন্তু তারাও চেয়েছিল দল জিতুক এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও চেয়েছিল দল যেন জেতে। এই ব্যাপারটা এখনো একই রকম আছে।
প্রশ্ন: কোন বিশ্বকাপের স্মৃতি আপনার মনে সবচেয়ে মধুর হয়ে আছে?
মাকায়া: আমি সবসময় ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপের কথা মনে রাখব। আমি জানতাম না আমি কোথায় যাচ্ছি, আমি কোথায় আছি বা কীভাবে সেখানে পৌঁছাব। আর আমি অলৌকিকভাবে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম, যা আমার জীবনে প্রায়ই ঘটে থাকে; আমি ভাগ্যের জোরে এবং কিছু অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কারণে সেখানে পৌঁছাতে পেরেছিলাম। বিশ্বকাপগুলো সাধারণত আর্জেন্টিনার শীতকালের সময়ে অনুষ্ঠিত হয় আর সেই সময়ে আমার কোনো সর্দি বা ফ্লু ছিল না, তাই আমি যেতে পেরেছিলাম।
প্রশ্ন: আপনার বয়স তখন ছিল মাত্র ২৩ বছর। আপনার মনে কেমন ভয় কাজ করছিল?
মাকায়া: না, আমার মনে খুব বেশি ভয় ছিল না। আমার মনে হয় আসল চাবিকাঠি হলো জ্ঞান বা জানাশোনা, আর সেখানে যা ঘটছিল তার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ছিল। আমি এমন একটি সময়ের কথা বলছি, যখন খোদ ফুটবল কর্মকর্তারাও অনেক কিছু জানতেন না। আর আমি যখন বলছি কর্মকর্তারা জানতেন না, তার কারণ হলো আমাদের একটি অনুশীলন ক্যাম্পে যেতে হয়েছিল; তারা সঠিক ক্যাম্পটি বেছে নিতে পারেননি, ভুল একটি জায়গা নির্বাচন করেছিলেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এমন অনেক ঘটনা ঘটেছিল, যা স্বয়ং কর্মকর্তাদের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল। আমি বলছি না যে আজকের ব্যবস্থা একদম নিখুঁত। তবে রিসোর্স বা সুযোগ-সুবিধা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে, যা চ্যাম্পিয়ন দল বা আমরা সাধারণত যা দেখে থাকি তার চেয়েও ভালো দল গঠনে সাহায্য করে।
প্রশ্ন: কোনো বিশ্বকাপের সময় কি আপনি কাউকে খুব মিস করেছিলেন? তখনকার দিনে তো যোগাযোগব্যবস্থা আজকের মতো এত দ্রুত ছিল না...
মাকায়া: না, তেমনটি নয়। অথবা অন্তত আমার তেমন কিছু মনে পড়ে না, যা আমি সহজে উল্লেখ করতে পারি। ১৯৫৮ সালে আমি একজন ধারাভাষ্যকারের সঙ্গে গিয়ে ম্যাচ কাভার করেছিলাম। আমি বিশ্লেষণ করতাম এবং আমরা টেলিফোনের মাধ্যমে সেই ধারাভাষ্য পাঠাতাম। তখন ওপাশে ফোনে সেটি রেকর্ড করা হতো এবং পরে প্রচার করা হতো। যাই হোক, আজকের দিনে যা যা প্রযুক্তি রয়েছে, তখন তার কিছুই ছিল না।
প্রশ্ন: ৯১ বছর বয়সে ১৮তম বিশ্বকাপ কাভার করবেন আপনি!
মাকায়া: ১৭টি বিশ্বকাপ মাঠে বসে দেখেছি। দারুণ অভিজ্ঞতা এটি। এই বয়সে আমার জন্য কঠিন। কারণ আমি আগের মতো এখনকার খেলোয়াড়দের চিনি না। এমন নয় যে আমি আগে তাদের সঙ্গে থাকতাম, তবে আমাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হতো। পাসেরেলা, ম্যারাডোনাদের সঙ্গে কথা হতো। মেসির সঙ্গেও কথা হয়। তবে এখন এমন অনেক খেলোয়াড় আছে, যাদের আমি চিনি না। হ্যাঁ, ব্যক্তিগত দক্ষতা বা কোয়ালিটির দিক থেকে আমি তাদের চিনি, কিন্তু তাদের ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। কারণ একেকজন একেক জায়গায় থাকেন। তারা ভিন্ন প্রজন্মের, আর আমি তাদের বিচার করতে পারি না। এটি এমন এক জাতীয় দল, যারা একসঙ্গে খুব কম ম্যাচ খেলে। সবকিছু বদলে গেছে এবং আমাদের পরিস্থিতিকে এভাবেই মেনে নিতে হবে।
প্রশ্ন : এবার আপনার ফেভারিট কোন দল?
মাকায়া: আমার মনে হয় এবারের বিশ্বকাপটা উন্মুক্ত। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলকে সবসময় হিসাবে রাখতে হয়। তবে এবার আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ইউরোপের ফ্রান্স, স্পেন আর পর্তুগালের ভালো সুযোগ রয়েছে। এই তিনটি দলের ভারসাম্য অসাধারণ। তবে নতুন কোনো চ্যাম্পিয়ন দেখলে খুশি হব আমি।





