উইং থেকে
ফিফাই বিতর্ক উসকে দিচ্ছে

ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া ল্যাটেক্সিয়ারকে নিয়ে সমালোচনা এখন তুঙ্গে
রেফারিংয়ের ব্যাপারে বলতে গেলে আমি একটু পেছনে ফিরে তাকাতে চাই। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো থেকেই আলোচনা হচ্ছে রেফারিং ও ভিএআর নিয়ে। ব্রাজিলের সঙ্গে স্কটল্যান্ডের ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একটা গোল ভিএআর-চেক করার পর বাতিল হয়। ঘানা এবং ইংল্যান্ড ম্যাচের পর ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজ, যিনি সারা পৃথিবীতে অত্যন্ত পরিচিত এবং সম্মানিত একজন কোচ, রেফারির একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রেস কনফারেন্সে বলেছিলেন, “ভিআর কি সেই সময় ঘুমাচ্ছিল, না কফি খেতে গিয়েছিল?”
জার্মানির ম্যাচে প্যারাগুয়ের ম্যাচে জার্মানির একটা গোল বাতিল করা হয়েছিল। তো আরও কিছু ঘটনা নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম লিওনেল মেসির একটা ফাউলকে কেন্দ্র করে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়। এবারের বিশ্বকাপে প্রায় প্রতিটা ম্যাচেই এই ধরনের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফিফাই নিয়মিত বিতর্ক উসকে দিচ্ছে।
ফিফা ভিএআর—এর প্রবর্তন করেছিল যাতে রেফারির কোন সিদ্ধান্তে কোন দল যাতে অন্যায়ের শিকার না হয় বা বঞ্চিত না হয়। রেফারির সিদ্ধান্তগুলো যাতে আরও সঠিক হয়, সেজন্য সহায়ক হিসেবে ভিএআর-এর প্রবর্তন হয়। তবে আল্টিমেটলি আমরা দেখছি, সেটা তো হচ্ছেই না, বরং আরো অনেক বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। এই প্রযুক্তি তো পরিচালনা করছে মানুষই। সুতরাং খেলার আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্তটা শেষ পর্যন্ত সেই মানুষই নিচ্ছে। তাই এটা শতভাগ নির্ভুল হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। রেফারি তার মতো করে সেই আইনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। এখানে তাই আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্কের সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।
গত রাতে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচে, মিসরের একটা গোল বাতিল নিয়ে অনেক বিতর্ক হচ্ছে। গোলটা ছিল কাউন্টার অ্যাটাকে। গোলটা বিল্ড-আপ করার সময় মিশর নিজেদের রক্ষণভাগের ডান দিকে বলটা কেড়ে নেয়। সেখান থেকে কাউন্টার অ্যাটাকের শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত গোল করেন মোস্তফা জিকো। গোলের পরেই ভিএআর চেক হয় এবং দেখা যায় যেখানে বলটা উইন করেছিল মিশর, সেখানে লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে ফাউল করা হয়েছিল, তার জার্সি টেনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যেটা সত্যি।
এই কারণে পরবর্তীতে যখন গোলটা বাতিল করা হয়, সাধারণত এটা এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। বিশ্বকাপের প্রায় প্রতি ম্যাচেই দেখেছি যে দলই গোল করুক না কেন, রেফারি একটা নির্দিষ্ট সময় গোল চেক-এর জন্য অপেক্ষা করেন। মূলত ভিএআর চেক করে কোনো ফাউল বা অন্য কোনো কিছু ঘটেছিল কিনা দেখার জন্য। এ ম্যাচের রেফারিও সেটা করেই সিদ্ধান্ত দেন, গোল বাতিল করে আর্জেন্টিনাকে ফ্রি-কিক দেন।
মিসর যখন বল নিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে গেলো এবং গোল করলো ততক্ষণে ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ড সময় চলে গিয়েছে। রেফারি ইচ্ছা করলেই কিন্তু এই সময়ের আগেই খেলা থামাতে পারতেন, সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। ধরে নিলাম, গোল হওয়া পর্যন্তই তিনি অপেক্ষা করেছেন। এরপর তিনি ভিএআর চেক করে নিশ্চিত হতে চেয়েছেন। সবই ঠিকঠাক হয়েছে।
তবে বিতর্কটা তৈরি হয় যখন মোহাম্মদ সালাহর বক্সের ভেতরে একটা ট্যাপিং হয়েছিল সম্ভবত লিসান্দ্রো মার্তিনেসের সঙ্গে। সেই ট্যাপিং থেকে বল জিতে নিয়ে আর্জেন্টিনা কাউন্টার অ্যাটাকে যায় এবং লাউতারো মার্তিনেসের ক্রসে এনসো ফের্নান্দেস হেড করে গোল করেন। আর্জেন্টিনা তাতে ৩-৩ গোলে এগিয়ে যায়। এই গোলটা হওয়ার পর মিশরের খেলোয়াড়রা জোড় দাবী জানিয়েছিলেন সালাহকে ফাউলটা ভিএআর-এ চেক করার। যদি ওটা ফাউল হয়, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী পেনাল্টির সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। আর যদি ফাউল না হয়, তাহলে তো নরমাল খেলা চলবে।
আরেকটি দিক দেখেন, কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স-মরক্কোর ম্যাচে অফিসিয়াল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেবন আর্জেন্টাইন রেফারিরা, যা এর মধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে। তাই আলোচনা হচ্ছে কেন সেই ম্যাচেই র্জেন্টাইন রেফারিদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে? গত রাতের আরর্জন্টিনা-মিসর ম্যাচ পরিচালনা করেছেন ফ্রেঞ্চ রেফারি। এ সিদ্ধান্তগুলোও প্রশ্নের জায়গা তৈরী করে।
আপনি দেখেছেন, গ্রুপ পর্বের তিন নম্বর ম্যাচগুলো একই সময়ে শুরু হয়। যাতে একটা ম্যাচের রেজাল্ট কোনোভাবেই অন্য ম্যাচের রেজাল্ট প্রভাবিত করতে না পারে। কোনোভাবেই যাতে ম্যানিপুলেট না হয়। এ ব্যাপারে ফিফা এত কনসার্ন, ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচে তারা রাখছে আর্জেন্টাইন রেফারি! এতেও ফিফা বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। অন্য কোনো দেশের রেফারিকে দায়িত্ব দেওয়া যেত। অন্য কোনো রেফারি দিলেও যে আলোচনা-সমালোচনা তর্ক-বিতর্ক হবে না, সেটা বলার সুযোগ নেই। তবে এই জিনিসগুলো কি আরো সুচিন্তিতভাবে করা গেলে তো অনেক বিতর্কের জন্ম নিত না।
বিশ্বকাপের প্রথম দিন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ম্যাচে বিভিন্নভাবে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সেগুলো নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছেই। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যালোগানকে নিয়ে যেটা হয়েছে, সেটা তো নজিরবিহীন। রেড কার্ড পাওয়ার পর সেই খেলোয়াড়ের শাস্তি ফিফা মওকুফ করে বেলজিয়ামের বিপক্ষে রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়। তার লালকার্ডটা অতি হাস্যকরভাবে দেওয়া হয়েছিল। আবার পরে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয় যাতে বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র তাকে খেলাতে পারে। পৃথিবীতে এরকম নজির আমি দেখিনি। এরকম ব্যাপারগুলো যখন বারবার ঘটে, তখন পুরো আয়োজন ও ফিফার উদ্দেশ্যকেই বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আর সেটাই স্বাভাবিক।









