টানা সাতে সপ্তম আকাশে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেসিকে ব্যাখ্যা করাটা এখন লিওনেল স্কালোনির জন্যও কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তারও শব্দ বোধহয় ফুরিয়ে যাচ্ছে, এ মহাতারকাকে নিয়ে বলতে গিয়ে কোনো জুতসই শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না, ‘সবাই মেসিকে নিয়ে যখন প্রশ্ন করে তখন আমি অস্বস্তিতে পড়ে যাই। তাকে নিয়ে আর কী বলব! আমিও বিস্মিত।’ লিওনেল মেসি এমন এক শিল্পী, যার প্রতিটি সৃষ্টিই যেন ছাপিয়ে যায় আগের বিস্ময়কে।
জর্ডানের বিপক্ষে কালকের ম্যাচে প্রথম একাদশে খেলেননি মেসি। তরুণদের খেলার সুযোগ দিয়েছিলেন। এরপরও দ্বিতীয়ার্ধে অল্প সময়ের জন্য নেমে দারুণ এক ফ্রি-কিক গোলে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক গড়েছেন বিশ্বকাপে টানা সাত ম্যাচে গোল করার অনন্য কীর্তি। ভেঙেছেন ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফরাসি জুস্ত ফোঁতেনের ও ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জর্জিনহোর টানা ছয় ম্যাচে গোলের রেকর্ড। মেসি কাতার বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে ফাইনাল পর্যন্ত চারটি ম্যাচে গোল করে জিতেছেন বহু কাঙ্ক্ষিত শিরোপা। চার বছর পর যেন ঠিক একই জায়গা থেকে শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে, গোল করেছেন গ্রুপের তিন ম্যাচেই। সর্বশেষ গোলে রেকর্ডের মালায় যোগ হয় আরেকটি মুক্তো। এ গোলে মেসি ছাড়িয়ে গেছেন আরেক ব্রাজিলিয়ান লিজেন্ড রিভেলিনোকেও। ডি-বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার শটে তিনি করেছিলেন ৫ গোল। মেসির ফ্রি-কিক গোলে সেটি উন্নীত হয়েছে ৬ গোলের নতুন রেকর্ডে। আসলে গোলের এ সংখ্যাগুলো শুধু রেকর্ড নয়, এগুলো সময়ের বুকে খোদাই করা এক কিংবদন্তির স্বাক্ষর।
প্রতিটি গোলে তিনি একটি করে ধাপ পেরিয়ে আরও ওপরে উঠে যাচ্ছেন। একসময় যেসব কিংবদন্তি সামনে ছিলেন, তারা আজ নিচে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের অংশ; আর মেসি নিজে ইতিহাসের আকাশে তৈরি করছেন নতুন এক নক্ষত্রমণ্ডল। যেমন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের (১৬) রেকর্ড ভেঙেছেন আগেই, এ ম্যাচে সেই সংখ্যাটাকে নিয়ে গেছেন ১৯-এ। যত দিন যাচ্ছে, এটি হয়ে উঠছে মেসির গোলের বিশ্বকাপ।
অথচ একসময় বিশ্বকাপ ছিল তার জীবনে বড় আক্ষেপের নাম। বারবার দরজায় কড়া নেড়েও ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। সর্বশেষ কাতারে সেই স্বপ্নজয় বদলে দিয়েছে সব হিসাব। এ শিরোপায় তার কাঁধ থেকে নেমে গেছে অদৃশ্য এক পাহাড়। ৩৯ বছর বয়সী এ মহাতারকা এই বিশ্বকাপে খেলছেন মুক্ত আকাশে ডানা মেলা ঈগলের মতো— চাপহীন, আত্মবিশ্বাসী এবং আগের চেয়েও বেশি ভয়ংকর।
বয়স তার ফুটবল সৌন্দর্য কেড়ে নিতে পারেনি। উল্টো মেসিকে দেখাচ্ছে পুরনো মদের মতো— সময়ের সঙ্গে যার গুণ বেড়েছে। প্রতিটি বছর যেন তাকে করেছে আরও পরিণত ও পরিশীলিত। এই বিশ্বকাপটা তাই ডাল-ভাত হয়ে গেছে তার জন্য। আবার নকআউটে আর্জেন্টিনার সামনে পড়েছে পুঁচকে কেপ ভার্দে। সমর্থকরা নির্ভার থাকলেও আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি এ বাধাকে সহজ মনে করছেন না। প্রতিপক্ষ কোনো পরাশক্তি নয়, তবে তাদের পথচলা দেখে অবহেলার সুযোগ নেই। তারা কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলকে। এই দলগুলো আটকে গেছে নবাগত কেপ ভার্দের রক্ষণে গিয়ে। তাই স্কালোনি সতর্ক করছেন তার খেলোয়াড়দের।
সতর্ক না হলেইবা ক্ষতি কী! সতীর্থরা জানেন, দলে আছেন ফুটবল জাদুকর। তার প্রতিটি স্পর্শে জেগে ওঠে আর্জেন্টিনার স্বপ্ন। তার সামনে অসম্ভব বলে কিছু নেই, তিনি থাকলেই জয়ের সূর্যটা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।




