জাদুকরকে নিয়ে শেষ কথা বলা যায় না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ধরুন, এই বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরে গেলেন লিওনেল মেসি। তাতে কি তার মহিমা এতটুকুও ম্লান হবে? হবে না। কিংবদন্তিদের উচ্চতা কখনো একটি ম্যাচের ফলাফলে মাপা যায় না। তাদের মূল্যায়ন হয় সময়ের ক্যানভাসে আঁকা অসংখ্য অনন্য মুহূর্ত দিয়ে। কাতার বিশ্বকাপ জিতে মেসি এরই মধ্যে নিজের পূর্ণতা দিয়েছেন নিজের ক্যারিয়ারকে। সেখানেই থেমে যাননি। ৩৯ বছর বয়সে উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে দেখিয়েছেন, এই প্রতিভা ফুরানোর নয়। বয়স শুধু একটি সংখ্যা মাত্র। গোল, অ্যাসিস্ট, নেতৃত্ব— সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অনন্য। একের পর এক রেকর্ড ভেঙে বিস্মিত করেছেন পুরো ফুটবলবিশ্বকে।
ফাইনাল জিতলে তিনি ইতিহাসের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন। আর হারলেও তিনি থাকবেন অমরদের কাতারেই। কারণ তিনি সেই কিংবদন্তি, যিনি নিজের উপস্থিতিতেই বাড়িয়ে দেন শিরোপার মর্যাদা। অনেকে তাই আর্জেন্টাইন জাদুকরকে সর্বকালের সেরা ফুটবলারের আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি ভালোভাবে জানেন ফুটবলে মেসির অবদানের কথা, তিনি নির্দ্বিধায় আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে দিয়েছেন সর্বকালের সেরার আসন। কোচের বিশ্লেষণে, ‘সে (লিও) ইতিহাস, এক কিংবদন্তি। ৩৯ বছর বয়সেও ফাইনালে ওঠা অবিশ্বাস্য। তাই বলি, আমাদের তাকে উপভোগ করা উচিত।’
অথচ এই ফুটবল জাদুকরই কি না ২০১৬ সালে জাতীয় দল ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটা সত্যি হলে কী কেলেঙ্কারিই না হতো। ফুটবলবিশ্ব বঞ্চিত হতো তার গোধূলিবেলার ফুটবল মহিমা থেকে। গোধূলিবেলাইবা বলি কীভাবে। যিনি অবিরাম গোলের রেকর্ড করে যাচ্ছেন, যার দুই পায়ের ঝলকে এখনো ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়, সেই লিওনেল মেসি আসলে ফুটবল পায়ে চির তরুণ। খেলাটিকে অসম্ভব ভালোবাসেন তিনি। তাই এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, মেসি কি ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত খেলবেন।
এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে আগামী আসরটি যেহেতু শতবর্ষের বিশ্বকাপ এবং তার একটি ভেন্যু যেহেতু আর্জেন্টিনায়, তাই নিজের দেশের দর্শকদের সামনে খেলার সুযোগ থাকবে খুদে জাদুকরের। এই ভেবে ৪৩ বছর বয়সেও তিনি ২০৩০-এর স্বপ্ন দেখতে পারেন! এ সম্ভাবনা অনেকে উড়িয়ে দিলেও মেসির আত্মজীবনীর লেখক গিয়েম বালাগে এর শেষ দেখছেন না। এ স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ‘যদিও অনেকেই বলছে এটাই শেষ, আমি তা মনে করি না। এখনো তাকে (মেসি) জাতীয় দলে দেখতে পাচ্ছি। তিনি সত্যিই খেলাটা উপভোগ করছেন।’
গিয়েম বালাগে বলেছেন, আমি কল্পনা করতে পারি না যে তিনি ইন্টার মায়ামিতে খেলবেন, ভালো পারফর্ম করবেন, তারপর হঠাৎ বলবেন, ‘এবার শেষ’ এবং এখানেই ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দেবেন
মেসিকে দীর্ঘদিন ধরে দেখার কারণে গিয়েম বালাগে বলেছেন, “আমি কল্পনা করতে পারি না যে তিনি ইন্টার মায়ামিতে খেলবেন, ভালো পারফর্ম করবেন, তারপর হঠাৎ বলবেন, ‘এবার শেষ’ এবং এখানেই ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দেবেন।”
বিশ্বকাপে মেসির শেষদিকের ক্যারিয়ার সত্যিই বিস্ময়কর। ২১টি বিশ্বকাপ গোলের ১৫টিই এসেছে ৩৫ বছর বয়সের পর। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পরও তিনি প্রমাণ করেছেন তার পায়ের জাদু হারিয়ে যায়নি। তাই গিয়েম বালাগে বলছিলেন, ‘আমার মনে হয় না মেসি এখনো শেষ কথা বলে ফেলেছেন।’ কয়েকটি ম্যাচের উদাহরণ টেনে এ ফুটবল বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘৩৯ বছর বয়সেও মেসি ১২০ মিনিট খেলতে পারেন। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৯০ মিনিটে তিনি ৬.৫ কিলোমিটার দৌড়েছেন, যার ৬২ শতাংশ হেঁটেছেন। সামনে হয়তো আরেকটু বেশি হাঁটবেন। কিন্তু তার আবেগ এখনো আগের মতোই আছে। আর সেটিই বলে দেয়, তিনি জাতীয় দল ছাড়ছেন না।’
তাই হয়তো অনেকে আগ বাড়িয়ে মেসিকে ২০৩০ বিশ্বকাপে নিয়ে যাচ্ছেন। নিজের দেশের মাঠে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ তিনি উপেক্ষা করবেন না। কাতার বিশ্বকাপ জেতার পর মেসি বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপের যাত্রা একটি ফাইনাল দিয়ে শেষ করতে পেরেছি, এটি আমাকে খুব আনন্দ দিচ্ছে।’ এরপর যোগ করেছিলেন, ‘এখন থেকে পরের বিশ্বকাপ পর্যন্ত অনেক বছর। আমার মনে হয় না, আমি ততদিন খেলতে পারব। এভাবে শেষ করতে পারা দারুণ।’
চার বছর বাদে সেই মেসি বিশ্বকাপ ফাইনালে। সুতরাং আর্জেন্টাইন জাদুকরকে নিয়ে আগেভাগে কিছু বলা মুশকিল।




