অতি চালাকি করতে গিয়ে নরওয়ের গলায় দড়ি

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই তো কোটি টাকার বিজ্ঞাপন, বিশ্বসেরা তারকাদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই আর প্রতি মুহূর্তের রোমাঞ্চ। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দ্বৈরথগুলোর একটি ছিল ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে বনাম নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হলান্ডের লড়াই। কিন্তু বোস্টন স্টেডিয়ামে যা মঞ্চস্থ হলো, তা কোটি ফুটবল ভক্তের সাথে এক প্রকার ‘প্রতারণা’ বলে উল্লেখ করেছে বিবিসি স্পোর্টস।
দল আগেই নকআউটে চলে গেছে—এই ঠুনকো অজুহাতে হলান্ডকে শুরুর একাদশ না রেখে সব রোমাঞ্চে জল ঢেলে দেন নরওয়ে কোচ স্টালে সলবাকেন। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। হলান্ডবিহীন ছন্নছাড়া নরওয়েকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করেছে ফরাসিরা। ম্যাচটি ছিল ব্যালন ডি’অর জয়ী ওসমান দেম্বেলের হ্যাটট্রিকে ফ্রান্সের একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রদর্শনী। কিন্তু টুর্নামেন্টের গুরুত্ব আর জাঁকজমক এতে চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে ফুটবলবোদ্ধারা। ম্যাচ শেষে নরওয়ে কোচের ব্যাখ্যা ছিল আরও অদ্ভুত। দল নাকি ক্লান্ত, তাই ১০ জন খেলোয়াড়কে একসাথে পরিবর্তন করাটা তার কাছে ‘নো-ব্রেইনার’ বা অতি সহজ সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে। কিন্তু সলবাকেন কি ভুলে গিয়েছিলেন যে এটি কোনো ক্লাব ফুটবলের নিয়মরক্ষার ম্যাচ বা আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ নয়? এটি ফিফা বিশ্বকাপ!
বিশ্বের কোটি কোটি সমর্থক টিভি পর্দার সামনে বসেছিলেন ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে গোলবন্যা বইয়ে দেওয়া হলান্ড আর রিয়াল মাদ্রিদ তারকা এমবাপ্পের ডুয়েল দেখতে। সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট ক্ষোভ প্রকাশ করে ঠিকই বলেছেন, 'যে দল ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষে একই একাদশ নিয়ে খেলল, তারা ফ্রান্সের মতো বড় ম্যাচের আগে এভাবে ভেঙে পড়ল? এটি সত্যিই হতাশাজনক।' সলবাকেন সমর্থকদের প্রত্যাশাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কার্যত টুর্নামেন্টের মহিমাকে খাটো করেছেন।
কোচের এমন নিস্পৃহ মানসিকতার ছোঁয়া লেগেছিল খোদ আর্লিং হলান্ডের গায়েও। আগের ম্যাচে সেনেগালকে হারানোর পরই হলান্ড সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, 'ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে আমি খুব একটা ভাবছি না। তারা সম্ভবত আমাদের হারিয়ে দেবে এবং টুর্নামেন্ট জিতবে।' একজন বিশ্বমানের মহাতারকার মুখে ম্যাচ শুরুর আগেই এমন মন্তব্য শুধু তার নিজের মানসিকতাকেই ছোট করেনি, বরং পুরো নরওয়ে দলের আত্মবিশ্বাসকে ম্যাচের আগেই মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল।মাঠেও দেখা গেল সেই নিস্পৃহতার প্রতিফলন। প্রথম মিনিটেই এমবাপ্পের শট পোস্টে লাগার পর ২৫ মিনিটে দেম্বেলে যখন হ্যাটট্রিক করছিলেন, নরওয়ের রক্ষণভাগ তখন কেবল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে খেলা দেখেছে। দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি মিসের মহড়া দিয়ে হারের ব্যবধান কমানোর ন্যূনতম সদিচ্ছাটুকুও দেখাতে পারেনি সলবাকেনের ‘বিশ্রাম নেওয়া’ দল।
ফ্রান্সের বিপক্ষে আত্মসমর্পণ করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার চড়া মাশুল এখন দিতে হবে নরওয়েকে। যদি তারা ম্যাচটি ড্র করতে পারত বা গ্রুপ সেরা হতো, তবে তাদের পরবর্তী নকআউট ম্যাচটি হতো কাছের ভেন্যু নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। ফ্রান্স সেই সুবিধা অনায়াসে লুফে নিয়েছে।আর নরওয়ে? সলবাকেনের ‘মাস্টারপ্ল্যান’-এর কল্যাণে এখন তাদের ক্যাম্প নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে প্রায় ১,১০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে উড়াল দিতে হবে টেক্সাসের আর্লিংটনে, আইভরি কোস্টের মুখোমুখি হতে। সাবেক স্কটিশ উইঙ্গার প্যাট নেভিন সলবাকেনের এই অদ্ভুত রণকৌশলকে তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, 'ক্লান্তি এড়াতে গিয়ে আপনি যদি দলের ছন্দটাই নষ্ট করে দেন এবং ১,১০০ মাইলের ভ্রমণের ধকল ডেকে আনেন, তবে সেই বিশ্রামের কোনো মূল্য থাকে না।'
আইভরি কোস্টের গতি আর শারীরিক ফুটবলের সামনে এই বিধ্বস্ত মানসিকতার নরওয়ে কতটুকু দাঁড়াতে পারবে, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন চিহ্ন ঝুলছে। সলবাকেন হয়তো হলান্ডকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, কিন্তু ফ্রান্সের কাছে এই অসহায় আত্মসমর্পণ করে দলের যে আত্মবিশ্বাস তিনি গুঁড়িয়ে দিলেন—তা নকআউটের আগে নরওয়েকে খাদের কিনারে ঠেলে দিল।






