১৯৭৮ বিশ্বকাপ
ম্যাচের আগে পেরুর ড্রেসিংরুমে আর্জেন্টিনার ভয়ংকর স্বৈরশাসক

নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
ফুটবল ইতিহাসে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছে, যার কোনোটিই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। তবে প্রথম দুই বিশ্বকাপ জয় নিয়েই এখন পর্যন্ত তুমুল বিতর্ক হয়। একটি ১৯৭৮ বিশ্বকাপে পেরুর বিপক্ষে সেই ম্যাচ আর অন্যটি ছিয়াশির বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অব গড’। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার ১৯৭৮ বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে ছিল এক অন্ধকার অধ্যায়।
বুয়েনস এইরেসের নুনিয়েনস পাড়ায় মাত্র ১০ ব্লকের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে আছে দুটি ভিন্ন স্থাপত্য। একটি রিভারপ্লেটের হোম গ্রাউন্ড মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম। এখানেই ১৯৭৮ সালের ২৫ জুন নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মেতে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। আর এর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি কুখ্যাত ভবন ‘নেভি মেকানিক্স স্কুল’ বা এসমা। যখন দানিয়েল পাসারেলা বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরছিলেন, তখন এসমা ভবনটি ছিল মূলত একটি বন্দিশালা ও নির্যাতন সেল। দক্ষিণ আমেরিকার ইতিহাসের ভয়াবহতম সামরিক একনায়ক শাসনামলে সেখানে হাজারো রাজনৈতিক বন্দীকে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন করা হতো।
১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত জেনারেল হোর্হে রাফায়েল ভিদেলার নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তার শাসনামলে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছিলেন। ভিদেলা ও তার সহযোগীরা নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের দাগ মুছে ফেলতেই ঘরের মাঠে ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপকে এক নিখুঁত মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সেই আসরকে তারা প্রচার করেছিলেন ‘সবার জন্য উৎসব’ হিসেবে। বিশ্বকাপের জৌলুস বজায় রাখতে স্বৈরশাসক ভিদেলা স্টেডিয়ামের চারপাশের বস্তিগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে লাখো মানুষকে ট্রেনে চাপিয়ে শহরের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই কাণ্ডের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল, যাতে বিদেশি সাংবাদিক বা অতিথিদের চোখে দেশের দারিদ্র্য ও অস্থিরতা ধরা না পড়ে। তৎকালীন ফুটবল কোচ সিজার লুইস মেনোত্তির সহায়তায় দেশের শীর্ষ ৬৬ জন খেলোয়াড়ের ইউরোপে ট্রান্সফার আটকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সেরা দল মাঠে নামানো যায়। পুরো স্কোয়াডে কেবল ভালেন্সিয়ার মারিও কেম্পেসই ছিলেন একমাত্র প্রবাসী ফুটবলার। বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক ও গোলরক্ষক উবালদো ফিলোল পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়কার ভয়াবহতা নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা কেবল ক্ষমাই চাইতে পারি। আমরা এখন উপলব্ধি করতে পারি জয়ের আনন্দের পেছনে কত দেশবাসীর মৃত্যুর বেদনা লুকিয়ে ছিল।’
গোলরক্ষক উবালদো ফিলোল নিজেও পরে এই সামরিক জান্তার হিংস্রতার কবলে পড়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে রিভারপ্লেট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে নেভির অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা কার্লোস লাকোস্তে ফিলোলকে ডেকে টেবিলের ওপর পিস্তল রেখে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি চাইলে তোমাকে এখনই নিখোঁজ করে দিতে পারি এবং কেউ কোনো দিন জানতেও পারবে না।’
নিখোঁজ হওয়া এক রাজনৈতিক বন্দীর স্ত্রী গ্রাসিয়েলা লুইস সেই ট্র্যাজেডি স্মরণ করে বলেন, ‘আমার বাবা বিশ্বকাপের একটা ম্যাচও মিস করতেন না। কিন্তু আমি টিভিতে চোখ রাখতে পারতাম না, কারণ আমার কেবল স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার কথাই মনে পড়ত। আমরা জানতাম বিশ্বকাপের আড়ালে অনেক কিছু ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। দুঃখের বিষয়, তখন আমাদের কণ্ঠস্বর কেউ শুনতে পায়নি। আমার স্বামীকে ওই এসমা ভবনেই আটকে রাখা হয়েছিল, যেখান থেকে মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের দর্শকদের চিৎকার ও গর্জন পরিষ্কার শোনা যেত।’
আর্জেন্টিনার এই বিশ্বকাপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল ফ্রান্সে। কারণ নিখোঁজদের তালিকায় ২০ জনেরও বেশি ফরাসি নাগরিক ছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত ঘটনা ছিল রেনে লিওনি দুকে ও অ্যালিস ডোমোন নামের দুই ফরাসি নান বা সন্ন্যাসিনীকে অপহরণ। তারা স্বৈরশাসক ভিদেলার প্রতিবন্ধী ছেলের সেবা করতেন। অথচ তাদেরই এসমাতে নির্যাতন করার পর ড্রাগ খাইয়ে বিমান থেকে রিও দে লা প্লাতা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যা তৎকালীন ইতিহাসে ‘ডেথ ফ্লাইটস’ নামে পরিচিত।
এই ঘটনার পর ফরাসি দল যাতে আর্জেন্টিনা না যায়, সেজন্য ফ্রান্সের কোচ মিশেল হিদালগোকে অপহরণের চেষ্টা করেছিল একটি সশস্ত্র ফরাসি বামপন্থী গোষ্ঠী। তবে তিনি কোনোমতে পালিয়ে বাঁচেন। পরবর্তীতে ফ্রান্স বিশ্বকাপে অংশ নিলেও প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়।
ফুটবল ইতিহাসের একটি প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ আর্জেন্টিনার একনায়কতন্ত্রের প্রতিবাদেই ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ বয়কট করেছিলেন। তবে ২০০৮ সালে রেডিও কাতালুনিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্রুইফ নিজেই এই ভুল ভাঙেন। তিনি জানান, বিশ্বকাপ শুরুর এক বছর আগে বার্সেলোনায় তার পরিবারকে গানপয়েন্টে রেখে অপহরণের চেষ্টা হয়েছিল। সেই আতঙ্কের পর পরিবারকে একা রেখে দূর দেশে খেলতে যেতে রাজি ছিলেন না তিনি। তবে সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৬-০ গোলের জয়। ফাইনালে যেতে আর্জেন্টিনার অন্তত ৪ গোলের ব্যবধানে জিততে হতো। বহু বছর পর জানা যায়, ম্যাচের ঠিক আগে পেরুর ড্রেসিংরুমে হাজির হয়েছিলেন স্বয়ং স্বৈরশাসক ভিদেলা। তৎকালীন পেরুর ডিফেন্ডার হেক্টর চুম্পিতাস ১৯৮৮ সালের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সে আমাদের সামনে এসে লাতিন আমেরিকার ভ্রাতৃত্ব নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছিল এবং শুভকামনা জানিয়েছিল। ভিদেলা অত্যন্ত ভয়ংকর একজন মানুষ ছিলেন।’
সেই ম্যাচে পেরুর ফুটবলাররা স্বৈরশাসকের ভয়ে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে গিয়েছিলেন নাকি কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল- তা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য। বিশ্বকাপের গৌরবও শেষ পর্যন্ত সামরিক জান্তাকে রক্ষা করতে পারেনি। ১৯৮১ সালে এক অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ক্ষমতা হারান ভিদেলা এবং ১৯৮৩ সালে দেশটিতে গণতন্ত্র ফিরে আসে। ২০১৩ সালে অপহরণ, হত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে সাজা খাটা অবস্থায় কারাগারেই মৃত্যু হয় এই স্বৈরশাসকের। কিন্তু সেই রক্তেভেজা বিশ্বকাপ আজও আর্জেন্টিনা ফুটবলের এক বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে আছে।
-গোল ডট কম অবলম্বনে










