তারায় ঠাসা দলও জেতায় না বিশ্বকাপ

তারায় ভরা দল নিয়ে এর আগেও বিশ্বকাপ থেকে যন্ত্রণা নিয়ে ফিরেছে অনেক দল।
স্পেনের কাছে হেরে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে ফ্রান্সের। অথচ কী দুর্দান্তভাবে তারা পৌঁছে গিয়েছিল সেমিফাইনালে। এমবাপ্পে, দেম্বেলে, ওলিসে, দুয়েরা ছাড়াও পুরো দলটাই তারায় ঠাসা। তাদের এমনই দ্যুতি যে, অনেকেই বলছিলেন, ফ্রান্সের ২৬ জন নিয়ে দুটি দেশের একাদশ গড়া সম্ভব। কিন্তু তারায় ঠাসা দল নিয়েও স্বপ্ন ভাঙল তাদের।
তারায় ভরা দল নিয়ে এর আগেও বিশ্বকাপ থেকে যন্ত্রণা নিয়ে ফিরেছে অনেক দল। ১৯৫০ বিশ্বকাপে আদেমির, জায়ার, জিজনেহোদের ব্রাজিল ফাইনালে পরিণত হওয়া শেষ ম্যাচে অবিশ্বাস্যভাবে হেরে যায় উরুগুয়ের কাছে। ১৯৫৪-তে পুসকাস-ককসিসদের হাঙ্গেরি গ্রুপ পর্বে পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে হারালেও ফাইনালে সেই দলের কাছেই ২-০ গোলের লিড নিয়ে হেরে যায় ৩-২ এ! একইভাবে ১৯৭৪-এ ইয়োহান ক্রুইফ-ইয়োহানেস নেসকেন্সদের নেদারল্যান্ডস কিংবা ১৯৮২-তে জিকো-সক্রেটিসদের ব্রাজিল পারেনি শিরোপা জিততে।
ছোটবেলা থেকেই স্প্যানিশরা একই মডেলে ফুটবল শিখে বড় হয়। খেলোয়াড় বদলালেও তাদের খেলার পদ্ধতি একই থাকে। এটাই মূল পার্থক্য গড়ে দিেয়ছে স্পেন-ফ্রান্সের -থিয়েরি অঁরি, ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী
এবার দুর্ভাগ্যই বরণ করল এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের ফ্রান্স। ডালাসে ২-০ গোলের হারে ফ্রান্সের কোচ হিসেবে দেশমের ১৪ বছরের ক্যারিয়ারের এক হতাশাজনক সমাপ্তি ঘটল। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের পরই তিনি কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। বিদায়বেলায় অবশ্য কোচকে ছেড়ে কথা বলেননি এমবাপ্পে, ‘আমাদের প্রেসিংয়ের সময় যোগাযোগের বেশ ঘাটতি ছিল। আমার মনে হয়, আমাদের ম্যান-টু-ম্যান প্রেস করা উচিত ছিল এবং আমাদের সঙ্গে দৌড়াতে ওদের বাধ্য করা উচিত ছিল।’
হারের পর রাগে-ক্ষোভে মাঠ ছেড়ে যাওয়া এমবাপ্পে মিক্সড জোনে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে আরও বলেছেন, ‘প্রযুক্তিগত বা কৌশলগত— কোনো দিক থেকেই আমরা যেমনটা চেয়েছিলাম তেমনটা খেলতে পারিনি।’
রেকর্ড ২৬তম বিশ্বকাপ ম্যাচে ফ্রান্সের ডাগআউটে দাঁড়ানো দেশমও হতাশা চেপে রাখেননি, ‘অবশ্যই আমাদের হতাশা ঘিরে ধরেছে। খেলোয়াড়রা ভেঙে পড়েছে, কারণ আমাদের প্রত্যাশা অনেক বড় ছিল। তবে আমাদের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ রেখে খেলা স্পেনের চেয়ে টেকনিক্যাল দিক থেকে আমরা এক ধাপ পিছিয়ে ছিলাম। তবে সবার আগে এটা আমাদেরই ব্যর্থতা। আমি কাউকে দোষারোপ করতে চাই না।’
আমাদের কাউন্টার অ্যাটাকগুলো খুব ভালোভাবে সামলেছে স্পেন। ওদের মাঝমাঠ বিশ্বের সেরা সেখানেই ওরা ফ্রান্সকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। -বিশেন্তে লিজারাজু, ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী
ফরাসি গণমাধ্যমগুলো বরাবরের মতোই দলের ব্যর্থতায় সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিচ্ছে। ল্য পারিসিয়েন এই ফলকে একটি ‘কঠিন ধাক্কা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং দাবি করেছে, ফ্রান্স স্পেনের রক্ষণভাগ ভাঙার কোনো উপায়ই খুঁজে পায়নি। লেকিপ পত্রিকা হতাশ কিলিয়ান এমবাপ্পের ছবি দিয়ে শিরোনাম করেছে ‘ঝরে পড়া তারকা’। পত্রিকাটি আরও লিখেছে, ‘ফ্রান্স সব দিক থেকেই স্পেনের কাছে পরাস্ত হয়েছে, তারা নিজেদের স্বপ্ন এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।’
ফরাসি খেলোয়াড়দের রেটিং দেওয়ার ক্ষেত্রেও লেকিপ বেশ কঠোর ছিল। পুরো ফ্রান্স দলকে তারা ১০-এর মধ্যে গড়ে ৩.৭ রেটিং দিয়েছে। যেখানে দিনিয়ে, দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসেকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ২। এমবাপ্পে এবং কোচ দেশম পেয়েছেন ৩ করে।
আরএমসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এমবাপ্পে নিজের দল ও দেশের জন্য জ্বলে উঠতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফরাসি অধিনায়ক একাই টুর্নামেন্টে নিজের নেতৃত্ব ও ৮ গোল দিয়ে দলকে টেনে নিয়ে এসেছিলেন, স্পেনের বিপক্ষে তিনি সেই পারফরম্যান্সের পুনরাবৃত্তি করতে পারেননি।’ করসে মার্টিন নামের একটি পত্রিকা খুব সহজ ভাষায় শুধু ‘হতাশা’ শব্দটিকে শিরোনাম করেছে। আর ল্য ফিগারো পত্রিকা লিখেছে, স্পেন ফ্রান্সকে ফুটবলীয় পাঠ শিখিয়েছে।
টানা তিন সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর ফরাসি ফুটবল কর্তাদের নড়েচড়ে বসার সময় হয়েছে। দেশম আগেই সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন। ফ্রান্সের দায়িত্বে আসতে যাচ্ছেন আরেক মহাতারকা জিনেদিন জিদান। তার অধীনে ২০২৮ ইউরোকে লক্ষ্য রেখে নতুন রূপে গড়ে উঠতে হবে ফ্রান্সকে।




