কাসেমিরোর জায়গা বদলেই ব্রাজিলের সাফল্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিল দলকে যতটা ছন্নছাড়া দেখিয়েছে, হাইতি এবং স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে পরের দুটি ম্যাচে ব্রাজিলকে দেখিয়েছে ততটাই ধারালো। ইসমাইল সাইবারির মতো কোনো ফরোয়ার্ড সহজেই বল নিয়ে ঢুকে যেতে পারেননি ব্রাজিলের ডি-বক্সে, প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ হয়ে গেছে বল বিপৎসীমায় ঢোকার আগেই। কার্লো আনচেলত্তি ছোট্ট একটা পরিবর্তন এনেছেন কৌশলে আর তাতেই গোটা দলের চেহারাই বদলে গেছে।
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে কার্লো আনচেলত্তি বেছে নিয়েছিলেন ৪-৪-২ পদ্ধতি। যেখানে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে কাসেমিরোর অবস্থান ছিল লুকাস পাকেতা আর ব্রুনো গিমারেসের সমান্তরালে। মরক্কোর ৪-২-৩-১ কৌশলের কারণে যখনই বল নিয়ে ওপরে উঠেছে, তখনই মাঝমাঠে চাপে পড়ে গেছে ব্রাজিল। পরের ম্যাচে আনচেলত্তি দগলাস সান্তোস আর দানিলো— এ দুজনকে শুরু থেকে রাখেন একাদশে, কাসেমিরোকে ডিফেন্ডার থেকে ওপরে তুলে দায়িত্ব দেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের। হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন আনে ব্রাজিল। কাসেমিরো খেলেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা ‘পিভট’ হিসেবে, তার সামনে ডান ও বাঁ পাশের জায়গা সামলানোর দায়িত্বে ছিলেন গিমারেস ও পাকেতা। এ দুই মিডফিল্ডার দুপাশ আগলে রাখায় কাসেমিরো মাঝমাঠের কেন্দ্রীয় অঞ্চল পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার স্বাধীনতা পান।
বল যখন প্রতিপক্ষের দখলে থাকত তখন কাসেমিরো সামনে থেকে দলের প্রেসিং বা চাপ সৃষ্টির কৌশল পরিচালনা করতেন এবং প্রতিপক্ষের পাস দেওয়ার পথ অনুমান করে বল কেড়ে নেওয়ার দারুণ সুযোগ তৈরি করতেন। বল নিজেদের দখলে থাকলে তিনি নিচ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার কাজে সাহায্য করতেন। এর ফলে দলের ফরোয়ার্ড ও অ্যাটাকিং মিডফিল্ডাররা বলের চেয়েও সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে আক্রমণের একাধিক সুযোগ তৈরির সুযোগ পেতেন।
তবে কাসেমিরোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আক্রমণের দিক পরিবর্তনের মুহূর্তে। প্রতিপক্ষ যখন পাল্টা আক্রমণ করত তখন তিনি রক্ষণভাগের সামনে সুরক্ষার অতিরিক্ত একটি দেয়াল হয়ে দাঁড়াতেন। অন্যদিকে, ব্রাজিল যখন নিজেদের রক্ষণ থেকে আক্রমণে উঠত, তখন পেছনের ফাঁকা জায়গা সামলানোর দায়িত্ব কাসেমিরো একাই নিজের কাঁধে তুলে নিতেন। তার এ উপস্থিতির কারণেই ফরোয়ার্ডরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই দ্রুত রক্ষণ ভেঙে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে পড়ার পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছিলেন। ২০০২ সালে ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা গিলবার্তো সিলভা আছেন ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি বিভাগে। তিনিই জানিয়েছেন কেন কাসেমিরোর এ জায়গা বদলই তার কাছে এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কোচ আনচেলত্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর কৌশল, ‘পজিশনের এ পরিবর্তনটাই আমার কাছে মূল চাবিকাঠি মনে হয়েছে। পিভট (ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার) পজিশনে খেলার কারণে পেছনের চার ডিফেন্ডারকে কীভাবে সুরক্ষা দিতে হয় এবং খেলাটাকে কীভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে সামনে গুছিয়ে রাখতে হয়, তা সে খুব ভালো করেই জানে। যখন এমনটা ঘটে, তখন সে পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে গিমারেস ও পাকেতার নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং ওদের সঠিক নির্দেশনা দিতে পারে। এ পজিশনে কাসেমিরো রীতিমতো ফুটবলীয় মাস্টারক্লাস দেখিয়েছে; কারণ এখানে ওকে বাড়তি দৌড়াদৌড়ি করতে হয়নি, বরং নিজের জায়গা ধরে রেখেই ও মাঝমাঠের ফাঁকা স্পেসগুলো দারুণভাবে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে।’ ব্রাজিল দলে ও আর্সেনালে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে লম্বা সময় খেলেছেন সিলভা, সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি দেখছেন কাসেমিরো কীভাবে কার্যকরভাবে নিজের ভূমিকাটা পালন করে ব্রাজিলকে বদলে দিয়েছেন।
হাইতির বিপক্ষে ম্যাচ থেকে একাদশে নিয়মিত জায়গা করে নিয়েছেন মাথেউস কুনিয়াও। গোল করার পাশাপাশি রক্ষণেও সতীর্থদের সহায়তা করেছেন, যেটা রক্ষণকে আরও জমাট করেছে বলে মনে করেন সিলভা, ‘কুনিয়াও নিচে নেমে এসে রক্ষণে সহায়তা করেছে, ফলে মাঝমাঠে কখনোই ব্রাজিল খেলোয়াড় সংখ্যায় প্রতিপক্ষের চেয়ে পিছিয়ে পড়েনি। প্রতিপক্ষ যদিও ছিল হাইতি এবং স্কটল্যান্ড, প্রথম ম্যাচের ব্রাজিলকে চেনা ছন্দে ফিরতে দেখতে পাওয়াটা অনেকটাই কাসেমিরোর জন্য, ‘এ কাঠামোগত পরিবর্তনটাই ব্রাজিলকে মাঠে আরও বেশি সাবলীল, ধৈর্যশীল এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। কাসেমিরোর সামনে খেলা খেলোয়াড়দের মধ্যেও মাঠে কঠিন পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়ার আর মানসিকভাবে অবিচল থাকার এবং নিজেদের শৃঙ্খলা বা পজিশন না হারানোর মতো মানসিকতা ছিল, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
বিশ্বকাপে জাপান রীতিমতো চমকে দিয়েছে, দুই ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের সঙ্গে ড্র করে আর তিউনিসিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়ে। রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপান হয়তো মরক্কোর কৌশলই বেছে নেবে, তবে এবার হয়তো এত সহজে গোলের দেখা পাবে না প্রতিপক্ষ, কারণ অদৃশ্য দেয়াল হয়ে কাসেমিরো যে আছেন!




