অনেক বাধা তারপরও ইউরোপীয়রাই এগিয়ে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এবারের বিশ্বকাপকে আগের দশটির সঙ্গে মেলানো যাবে না। তিনটি আলাদা আলাদা টাইমজোনে খেলা হবে। এর আগে এ রকম ঘটনা কখনো ঘটেনি। এখানে দলগুলোকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হবে। বিরূপ আবহাওয়া; যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে এখন তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে। এর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে খেলা ভীষণ কঠিন। ২০২২ বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামগুলোয় ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এখানে এটা নেই। আবার মেক্সিকোতে উচ্চতার একটা ব্যাপার আছে। সেখানকার আবহাওয়া একেবারেই আলাদা। কানাডাও ভিন্ন। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে এক মাঠ থেকে আরেক মাঠে ছোটাছুটি। ভ্রমণে হ্যাপা। এ বিষয়গুলো মাঠের পারফরম্যান্সে অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আবার লাতিন ও আফ্রিকা অঞ্চলের দলগুলো কিছুটা সুবিধা পাবে আবহাওয়ার অভ্যস্ততার কারণে। ফিফা যথেষ্ট কুলিং ব্রেক না রাখলে শীতপ্রধান অঞ্চল, বিশেষ করে ইউরোপিয়ান দলগুলোর কিছুটা সমস্যা তৈরি হবে। সর্বশেষ কাতারে ফিফা বিশ্বকাপ জুন-জুলাইয়ে আয়োজন করেনি সে সময়ের তাপমাত্রা বিবেচনা করে। সেটা পিছিয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বরে হয়। এবার কিন্তু সেই সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করতে হবে দলগুলোকে।
ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়া, টাইমজোন, ট্রাভেল হ্যাসেলগুলোর প্রভাব খেলাতে পড়াই স্বাভাবিক। এ রকম ছোটাছুটির বিশ্বকাপ আগে কখনো হয়নি। আবার এটাও ঠিক, দলগুলো আগেভাগেই জানত কী কী সমস্যায় পড়তে হবে। সেভাবেই তারা প্রস্তুত হয়ে এসেছে। পেশাদার ফুটবলে এগুলো কখনোই অজুহাত হতে পারে না। আর নেতিবাচক সব আলোচনা ঢাকা পড়বে সত্যিকারের মাঠের লড়াই শুরু হলে। মানুষ সেই লড়াইয়ের অপেক্ষায় আছে। আর আমাদের দেশের মানুষ তাকিয়ে শুধু আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে।
এ দুটি দলের সঙ্গে তাদের আবেগ, ভালোবাসা জড়িত। আমাদের দেশের আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকরা অন্ধের মতো। বাস্তবতার বাইরে গিয়ে ভাবেন। আর্জেন্টিনা সর্বশেষ বিশ্বকাপ জেতায় সমর্থকদের উন্মাদনা বহুগুণে বেড়েছে। অথচ আর্জেন্টিনা ২০২২ বিশ্বকাপ জিতেছে কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা ছিল বলে। প্রায় প্রতি ম্যাচেই রেফারিংয়ের একটা অ্যাডভান্টেজ তারা পেয়েছে। পেনাল্টি পেয়েছে। আমি এটিকে নেতিবাচক অর্থে বলছি না। পেনাল্টিগুলো তারা আদায় করে নিয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপেও মেসি একটা বিশাল ফ্যাক্টর আর্জেন্টিনার জন্য। তাদের সর্বশেষ ম্যাচেও এটি বোঝা গেছে। আইসল্যান্ডের সঙ্গে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে ২০ মিনিট বাকি থাকতে তিনি নামার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের চিত্র বদলে যায়। নেমেই গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, গোলও করেছেন। আগেরবারের মতো এবারও দলের বাকিরা মেসির জন্যই খেলবেন মনে হচ্ছে। মেসির মতো অনুপ্রেরণা আপনি অন্য দলগুলোয় দেখবেন না।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, শিরোপা ধরে রাখা তাদের জন্য সত্যি কঠিন। তারপরও আমি আর্জেন্টিনাকে ফেভারিটের তালিকায় রাখব ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। তবে আমি এগিয়ে রাখব ইউরোপের সেরা দলগুলোকে। স্পেন ও ফ্রান্স শিরোপার অন্যতম দাবিদার। ফ্রান্সের ব্যাকলাইন থেকে ফ্রন্টলাইন— অসাধারণ সব ফুটবলারে ঠাঁসা। স্পেনও একই রকম, তারা বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন। বেলজিয়াম, ইংল্যান্ডের কথাও বলব। টমাস টুখেল ইংল্যান্ডের জন্য বিরাট অনুপ্রেরণা। উনি দলটি এমনভাবে সাজিয়েছেন, যেখানে সব বিভাগেই আছে বৈচিত্র্য। দলটি বেশ সুসংহত। পর্তুগালও ভালো, তবে তাদের মূল সমস্যা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে। ওদের গত ম্যাচে রোনালদো অনেক সুযোগ নষ্ট করেছেন, যেটা কোনোদিন আমরা করতে দেখিনি। তার মানে বয়সের একটি প্রভাব পড়েছে এবং ফর্মও পড়তির দিকে। আর সত্যি বললে আমি ব্রাজিলকে রাখব ফেভারিটের তালিকার ছয় বা সাত নম্বরে।
আমাদের দেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে এক ধরনের উন্মাদনা থাকে দর্শকদের মধ্যে। দল যেমনই হোক, তারা চিন্তা করে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাই ফাইনাল খেলবে কিংবা চ্যাম্পিয়ন হবে। তবে ফুটবলের একজন স্টুডেন্ট হিসেবে যখন বিষয়গুলো চিন্তা করতে হয়, তখন অনেক কিছু বিবেচনা করতে হয়। আবার সবসময় কিন্তু বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণ ঠিক হয় না। গ্রিস এখানে অনেক বড় উদাহরণ। তারা যেবার ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়, সেটা কেউ কল্পনা করেনি। শুধু ডিফেন্স করে আর কাউন্টার অ্যাটাকের ওপর ভর করে তারা ইউরোপের সেরা হয়ে গিয়েছিল। আবার গত বিশ্বকাপে মরক্কোর সেমিফাইনালে পৌঁছানোও ছিল ভাবনার অতীত। সেমিফাইনালেও ফ্রান্সকে ভীষণ ভুগিয়েছিল তারা। শুধু সুযোগগুলো ঠিকঠাক ফিনিশ হয়নি বলে হেরে গেছে।
তাই বিশ্বকাপ নিয়ে যতই অনুমান করুন, যতই আলোচনা হোক। দিন শেষে মাঠেই হয় সব হিসাবের ফয়সালা। সে হিসাবগুলো যারা মেলাতে পারে ঠিকঠাক, বিজয়মাল্য ওঠে তাদের গলায়।




