সাফ আয়োজনে কতটা এগিয়ে বাংলাদেশ?

বাফুফ সভাপতি তাবিথ আউয়াল।
২০১৮ সালে শেষবার দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ। আট বছর পর ফের সাফ ফিরতে পারে এদেশে। অন্তত সাফের নির্বাহী কমিটি এতে কোন আপত্তি নেই। তারা একপ্রকার সবুজ সঙ্কেত দিয়েই দিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে। তারপরও বাংলাদেশকে থাকতে হচ্ছে অপেক্ষায়। সাফই সময় নিচ্ছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নিতে। বৃহস্পতিবার সাফের সাধারণ সম্পাদক পুরুষোত্তম কাট্টাল এই বিলম্বের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন আগামীর সময়কে।
তার আগে, বাংলাদেশের আগ্রহের মাত্রাটা কোন পর্যায়ে, সেটা জেনে নেওয়া যাক। গত মাসে অস্ট্রেলিয়ায় ওমেন্স এশিয়ান কাপ চলাকালীন বাফুফের সভাপতি তাবিথ আউয়াল সিডনির এক পার্কে বসে বলছিলেন, সাফের আয়োজক স্বত্ত্ব পেলে কী কী করতে চান, ‘অবশ্যই আমরা চাই সাফ আয়োজন করতে। কেবল ঢাকায় নয়, এটা আমরা দুই শহরে করতে চাই এবং আয়োজনটা করতে চাই এই এশিয়ান কাপের কাছাকাছি মানের।’
এটা যে শুধুই বলার জন্য বলা নয়, তার প্রমাণ মিলেছে চলতি মাসের শুরুতে। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামের ঘাস সব তুলে ফেলা হয়েছে। সেখানে বাফুফের নিজ উদ্যোগে বসানো হচ্ছে নতুন ঘাস। সরকার আগে যে ঘাস বুনেছিল, তা ছিল ভালো ফুটবলের অন্তরায়। সেটা বুঝেই তড়িঘড়ি ঘাস তুলে নতুন ঘাস বসানোর কাজ শুরু করেছে বাফুফে, ১০ আগস্টের মধ্যে সে কাজ শেষ করে আনার লক্ষ্যমাত্রাও বেঁধে দিয়েছেন তাবিথ কারণ পরের মাসেই ফিফা উইন্ডোকে কাজে লাগিয়ে হওয়ার কথা সাফ।
গত এক বছরে ঘরের মাঠে ম্যাচ আয়োজনে যে সুফল মিলেছে, সেটাকে বহুগুণে বাড়ানোর বাসনায় তাবিথ চাইছেন সাত জাতির আসরের আয়োজক হতে। আর বিশাল এ আয়োজন সফলভাবে করতে যা যা প্রস্তুতি নেওয়ার সেটা ভেতরে ভেতরে নিয়ে ফেলেছে তাবিথের টিম। বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেনের কথায়ও মিলেছে তার প্রমাণ। এরপর নিশ্চয় বাংলাদেশের আগ্রহ ও এগিয়ে থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা নয়।
তারপরও প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। আসলে পুরো ব্যাপারটাই একটা ধোঁয়াশার মধ্যে রেখেছে সাফ। তারা দিচ্ছি দিচ্ছি করেও সবুজ সঙ্কেত দিচ্ছে না বাফুফেকে। কারণটা জানতেই যাওয়া হয়েছিল বনানীর সাফের সদর দফতরে। দীর্ঘ আলাপে সাফের সাধারণ সম্পাদক পুরুষোত্তম কাট্টাল খোলাসা করেছেন সব কিছু। বাংলাদেশকে সাফ আয়োজনে নিজেদের স্বার্থের দিকটা প্রথমে দেখছেন সাফের নির্বাহী প্রধান। এটাই স্বাভাবিক। তবে তিনি যেভাবে চাইছেন, তাতেই জোড় আপত্তি বাফুফের। সভাপতি জানিয়েছেন, ‘এখনও সাফের কাছ থেকে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজক হওয়ার নিশ্চয়তা পাইনি। পেলেই আমরা কাজে নেমে পড়বো। তবে তারা কিছু কিছু জায়গায় যেভাবে চাইছে, সেভাবে হলে প্রশ্ন উঠবে আমরা কেন করবো। সাফ চায় আমরা সব দায়িত্ব নেবো। তবে অনেকগুলো স্বত্ত্ব থাকবে তাদের হাতে!’
কাট্টাল এই প্রশ্নে একটু সতর্কে পা ফেলতে চাইছেন, ‘সাফ কার্যনির্বাহী কমিটির একটি বোঝাপড়া আছে যে এটি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি, ততক্ষণ এটি পরিষ্কার নয়। আমি কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করার চেষ্টা করছি না এবং মিডিয়াতে বলব না যে আমরা এটি বাংলাদেশেই হচ্ছে।‘’
এর মধ্যেই নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজক স্বত্ত্ব পেয়েছে ভারত। সাফ সাধারণ সম্পাদক জানালেন ভারতের কাছ থেকে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর তারা সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে। যেটা এখনই বাংলাদেশের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি, ‘যুদ্ধের কারণে বিমানের টিকিটসহ সবকিছুর খরচ ক্রমাগত বাড়ছে। যদি আর্থিক শর্তাবলী পূরণ হয় (তবেই এটা বাংলাদেশে হবে)। আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি। এখনও কয়েক মাস বাকি আছে। তবে অনেক সদস্য ফিফা উইন্ডো ব্যবহারের পরিকল্পনা করে, তাই আমাদের দ্রুত ঘোষণা করতে হবে যাতে তারা সেই সময়টি ফাঁকা রাখে।‘
সাফের ধীরে চল নীতির পেছনে আরেকটি বড় কারণ আছে। সম্প্রতি তাদের পেছনে ঠেলে দিয়েছে তাদের কমার্শিয়াল পার্টনার স্পোর্টস ৫। গত বছর শুরুর দিকে সাফের সঙ্গে একটি আকর্ষনীয় চুক্তি করেছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। তবে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক দূরত্বের কারণে লাভজনক হবে না ধরে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গত নভেম্বরে চুক্তি বাতিল চেয়ে সাফকে চিঠি দেয়। এতেই বিপাকে পড়ে গেছে সাফ। তাই বুঝে শুনেই অন্যতম সেরা টুর্নামেন্টের আয়োজক বেছে নিতে চাইছেন কাট্টাল, ‘গত বছর একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করেছিলাম যা বেশ লাভজনক ছিল। একটি দুবাই ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, যারা আসিয়ান ফুটবল নিয়ে কাজ করে, তাদের সঙ্গে চুক্তি ছিল। তবে তারা নভেম্বরে সেই চুক্তি বাতিল চেয়ে চিঠি দেয়। এটা আমাদের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ যে অর্থ আসার কথা ছিল তা আমাদের প্রতিযোগিতাগুলোতে ব্যয় হতো। এখন আমাদের কোনো পার্টনার নেই। তাই আমরা বাংলাদেশ কতটা কী করতে পারে সেটা দেখতে হচ্ছে। বাফুফে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের সাথে সরাসরি কাজ করছি। আশা করি আগামী ৪-৭ দিনের মধ্যে আমরা এটি চূড়ান্ত করতে পারব।‘
এশিয়ান কাপ বাছাই শেষে হামজা চৌধুরী ইএসপিএন এশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাফ জয়ের ইচ্ছের কথা জানিয়েছিলেন। যার ছোঁয়ায় দেশের ফুটবলে অনুসারীর সংখ্যা বেড়েছে হু হু করে, সেই হামজাকে সাফের মতো মর্যাদার আসর নিজ আঙিনায় খেলতে দেখতে চায় হাজারো ভক্ত। তাদের বিশ্বাস হামজাই পারবেন ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও জাতিকে শিরোপার আনন্দে ভাসাতে। এখন শর্তারোপে সাফ একটু ছাড় দিলেই হয়। বাফুফে তো প্রস্তুতই।















