আমিষে আগুন
- জ্বালানি তেলে অস্থিরতা

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
সাদা ভাতের পাশে এক টুকরো মাংস— বাঙালি মধ্যবিত্তের জন্য এটি শুধু খাবার নয়, বরং দিনশেষে এক চিলতে তৃপ্তি। আর নিম্নবিত্তের জন্য ‘ব্রয়লার’ ছিল সস্তায় আমিষ (প্রোটিন) পাওয়ার অন্যতম ভরসা। কিন্তু সেই ভরসাটুকুও এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যের বাজারজুড়ে এখন শুধু দামের উত্তাপ; যে উত্তাপে পুড়ছে সীমিত আয়ের মানুষের পুষ্টির চাহিদা। সোনালি মুরগির দাম যখন স্মরণকালের রেকর্ড ছাড়ায় আর দেশি মুরগি যখন কেজি আটশর ঘরে ঠেকে, তখন শ্রমজীবী মানুষের ডাল-ভাতের সংসারে আমিষ যেন এক বিলাসিতা!
এক মাসের ব্যবধানে মুরগির বাজারে যে ‘লঙ্কাকাণ্ড’ ঘটেছে, তা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় এক ধাক্কা। এক মাস আগেও যে সোনালি মুরগি মধ্যবিত্তের নাগালে ছিল, তা এখন বাজারভেদে কেজিতে ১০০ টাকা বেড়ে ৪২০ থেকে ৪৫০-এ বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো বাজারে তা ৪৬০ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, ‘গরিবের আমিষ’ হিসেবে পরিচিত ব্রয়লার মুরগির দামও এখন চড়া। ১৬০-১৭০ টাকার ব্রয়লার মিলছে না ১৮০-১৯০-এর নিচে। যারা তুলনামূলক সচ্ছল, তাদের পছন্দের দেশি মুরগি এখন সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে; এক মাসে ২০০ টাকা বেড়ে তা বাজার ও মানভেদে ঠেকেছে ৭৫০-৮০০ টাকায়।
আমিষের চাহিদা পূরণে অনিশ্চয়তা
এতদিন মাছ বা খাসির মাংসের দাম যখন সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যেত, তখন মানুষ ব্রয়লার বা সোনালি মুরগির ওপর নির্ভর করে শরীরের আমিষের চাহিদা মেটাত। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সেই পথটিও রুদ্ধ হতে চলেছে।
দৈনিক মজুরিতে চলা একজন শ্রমিকের পক্ষে ১৯০ টাকা কেজি ব্রয়লার কেনা কষ্টসাধ্য। ফলে তাদের খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ আমিষের পরিমাণ হারে কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য এক সতর্কবার্তা।
লোকলজ্জার ভয়ে যারা হাত পাততে পারেন না, সেই মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন খাবারের তালিকায় হয় মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন অথবা বাজার থেকে খালি হাতে ফিরছেন।ঢাকার কারওয়ান বাজারের ওয়াসা ভবনের পাশে ব্যস্ত সড়কে খালি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শামীমা জোয়ার্দারের (৪০) চোখেমুখে ছিল গভীর বিষণ্নতা আর চাপা ক্ষোভ। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা শামীমা যখন তার বাজারের ব্যাগটি পকেটে গুঁজে ফিরছিলেন, তখন তার সেই নীরব প্রস্থান যেন বলে দিচ্ছিল মধ্যবিত্তের পরাজয়ের গল্প।‘কারওয়ান বাজারে এসেছিলাম একটু সস্তায় পাব বলে। ভেবেছিলাম ছোট একটি সোনালি মুরগি নিয়ে ফিরব, বাড়িতে বাচ্চাটা কয়েক দিন ধরে মাংস খেতে চাইছে। কিন্তু এসে দেখি এখানেও আগুন! যে সোনালি মুরগি কদিন আগে ৩০০-৩২০ টাকা ছিল, আজ তা ৪৫০ টাকা চাইছে’— খেদোক্তি এ স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীর।‘সবচেয়ে গায়ে লাগে ব্যবসায়ীদের কথা শুনলে। তারা একেক সময় একেক অজুহাত দেয়— কখনো বলে যুদ্ধ, কখনো বলে মড়ক। কিন্তু বাজারে সংকটের গন্ধ পেলেই তারা যেভাবে রাতারাতি দামটা বাড়িয়ে দেয়, তাতে মনে হয় আমাদের পকেটে হাত দেওয়াটাই তাদের একমাত্র কাজ। ব্রয়লার মুরগিটা ছিল আমাদের মতো মানুষের ভরসা, সেটার দামও দুইশর কাছাকাছি’— যোগ করেন শামীমা।তার সঙ্গে কয়েক মিনিটের আলাপনে উঠে আসে মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবনের টানাপড়েনের বেদনাদায়ক চিত্রটা। ‘সত্যি বলতে কি ভাই, আমাদের মতো মানুষের কষ্ট কেউ দেখে না। আমরা তো আর লাইনে দাঁড়িয়ে কম দামে টিসিবির পণ্য কিনতে পারি না, লোকলজ্জার একটা ভয় আছে। আত্মীয়স্বজন বা কলিগরা দেখে ফেললে কী ভাববে—এ সম্মানের ভয় আমাদের শেষ করে দিচ্ছে। মুরগি না কিনেই ফিরে যাচ্ছি। বাসায় গিয়ে ছেলেকে কী বলব জানি না। হয়তো বলব, আজ বাজারে ভালো মুরগি ছিল না বাবা। মধ্যবিত্তের জীবনটাই এখন এমন— পেটে ক্ষুধা থাকলেও মুখে হাসি রেখে মিথ্যে বলতে হয়’— খেদোক্তি শামীমার।
এ কারওয়ান বাজারেই কিছুটা কম দামে পাওয়ার আশায় মুরগি কিনতে এসেছিলেন রেহনুমা বেগম (৪২)। কিন্তু তার সে আশায় গুড়ে বালি। মুরগি না কিনেই ফিরছিলেন বাসায়। এ প্রতিবেদকের কাছে একটানে বলে গেলেন সংসার চালাতে গিয়ে সম্মুখীন হওয়া বিভিন্ন প্রতিকূলতার কথা— ‘কী আর বলব ভাই, রোজার ভেতরেও সোনালি কিনলাম ৩২০ টাকা কেজি। আর এখন নাকি ৪২০। ব্রয়লার মুরগি মেয়ে খেতে চায় না। বলে, ব্রয়লার মুরগি খাওয়ার চেয়ে সবজি খাওয়া ভালো। সেজন্য মাঝেমধ্যে সোনালি কিনি। কিন্তু এখন যে হারে দাম বাড়ছে, তাতে মনে হচ্ছে মুরগির মাংস খাওয়াই বাদ দিতে হবে। এরকম নয় যে, সোনালি মুরগি বাদ দিয়ে দেশি মুরগি কিনব! দেশি মুরগির দাম তো আরও বেশি।’ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দাবি, এ সংকটের নেপথ্যে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বেশ কয়েকটি সূচক। গত কয়েক মাসে খামারে মড়কের কারণে মুরগির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে উৎপাদন খরচ। মুরগির বাচ্চার দাম প্রতিটি ৩০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০ টাকা। ফিডের (মুরগির খাবার) দামও কেজিতে দুই থেকে আড়াই টাকা বেড়েছে। জ্বালানি তেলে অস্থিরতার কারণে মূল্যবৃদ্ধি এবং তার প্রভাবে যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়াও সরাসরি বাজারে ফেলেছে নেতিবাচক প্রভাব।এমন প্রেক্ষাপটে সুখে নেই বিক্রেতারাও। কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা মোবারক হোসেনের কণ্ঠে ঝরে পড়ল অসহায়ত্ব— ‘দাম বাড়লেও আমাদের লাভ বাড়েনি। উল্টো কাস্টমার কমে গেছে। আগে যা ৩২০ টাকায় বেচতাম, এখন তা ৪২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিদিন বাগ্বিতণ্ডা করতে হয়।’মুরগির বাজারে যে আগুন লেগেছে, তা নেভার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই।খাবারের পাতে আমিষের এ আকাল দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের পুষ্টি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। উৎপাদন স্বাভাবিক না হওয়া এবং যাতায়াত খরচ না কমা পর্যন্ত মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের এ ‘আমিষ বিলাসিতা’র লড়াই চলতেই থাকবে।মুরগির বাজারে তেজিভাবের মধ্যে ক্রেতাদের কিছুটা সান্ত্বনা দিচ্ছে মাছ ও সবজির বাজারের স্থিতিশীল আবহ। পাঙাশ, রুই বা কাতল মাছের দাম স্থিতিশীল। সবজির বাজারও মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে (৪০-৬০ টাকা কেজি)। যদিও সরবরাহ সংকটে কিছু সবজি বিকোচ্ছে চড়া দামে। স্বস্তির খবর রয়েছে আরও একটি, তা হলো— ডিমের দাম স্থিতিশীল।ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, উৎপাদন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এবং যাতায়াত খরচ না কমলে নিত্যপণ্যের বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।














