যেভাবে একা হয়ে গেলেন ইনফান্তিনো

সংগৃহীত ছবি
এই বিশ্বকাপকে ধরা হচ্ছিল জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। একই সঙ্গে কি এটাকে দুর্ভাগ্যের প্রতীকও বলা যায়! ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডকে সূচনা ধরলে তো তাই দাঁড়ায়। এর পর থেকেই নানা বিতর্কে টালমাটাল ফিফায় ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ। কয়েক সপ্তাহ ধরে যা চলছে, বিশ্ব ফুটবলের মহীরুহের বিদায়ঘণ্টা বাজার উপক্রম হয়েছে। তিনিও লড়ছেন, এদিক-ওদিক থেকে শুভার্থীরাও তার পক্ষাবলম্বন করছেন। কিন্তু বিরোধী শিবিরকেই এখনো শক্তিশালী দেখাচ্ছে। এখন সময়ের হাতেই তার নিয়তি। তবে কী এমন হলো, যাতে নড়ে গেল ফিফার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী সভাপতির পদ?
বিতর্কের শুরু ফোলারিন বালোগানের সেই লাল কার্ড বাতিল নিয়ে। বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ লাল কার্ড দেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের এই ফরোয়ার্ড, এতে পরের রাউন্ডে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। তবে শেষ ১৬-এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে নাটকীয়ভাবে উঠিয়ে নেওয়া হয় তার নিষেধাজ্ঞা। বেলজিয়ামের বিপক্ষে বালোগানের মাঠে নামা নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। এই ইস্যুতে হোয়াইট হাউসের সরাসরি হস্তক্ষেপের পর আনুষ্ঠানিক তদন্তের দাবি তুলেছিল ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৭২ জন সদস্য।
এই ধাক্কা সামাল দিলেও ইনফান্তিনোর বিপদ তখন কেবলই শুরু। বিশ্বকাপ শেষে দ্য টাইমস এবং দ্য গার্ডিয়ান নিয়ে আসে নতুন এক ঝড়। তারা খবর দেয় ইনফান্তিনো 'ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' নামের একটি বাণিজ্যিক সত্তা গঠনের পরিকল্পনা করছেন। এর মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হবে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব।
এই তথ্য ফাঁসের পরেই ফুঁসে ওঠে পুরো ফুটবল বিশ্ব। বিশ্বকাপকে বিক্রি করে ফুটবলকে ধ্বংস করছেন ইনফান্তিনো, এমন অভিযোগে তার ফিফা সিংহাসন টলে যাওয়ার জোগাড়।
কারণ ফিফা সভাপতি এই পরিকল্পনা করেছিলেন গোপনে। এমনকি ফিফায় তার কাছের লোকজনও জানত না বিশ্বকাপ বিক্রির পরিকল্পনা! ফিফা মহসাচিব, চিফ অপারেটিং অফিসারসহ কেউ-ই নাকি এর সঙ্গে জড়িত ছিল না। এসবই তার পদ নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দশ বছর আগে যারা তাকে সভাপতি পদে বসিয়েছিল সেই উয়েফা সোচ্চার হয় ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবিতে। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির বর্তমান নেতৃত্বের ওপর আর আস্থা নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা। একই সঙ্গে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব (মোশন অব নো কনফিডেন্স) আনার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল উয়েফা।
উয়েফার সঙ্গে যোগ দেয় কনকাকাফ, এশিয়ান ফুটবল কাউন্সিলও। ইউরোপের ৫৫টি দেশই বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে, সঙ্গে এশিয়া ও কনকাকাফের কিছু দেশে। শুধু ইউরোপ বেঁকে বসলে আসলে ফুটবল চালানো কঠিন হয়ে যায়। তারা খেলবে না বললে বিশ্বকাপের কিছু অবশিষ্ট থাকে! সমূহ বিপদ দেখে বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাব থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন ইনফান্তিনো।
আপাতত বড় বিপদ সামাল দেওয়া গেলেও প্রায় প্রতিদিনই বের হচ্ছে ইনফান্তিনোর অপকর্মের ফিরিস্তি। তার বিরুদ্ধে ‘ব্ল্যাকমেইলের’ অভিযোগ তুলেন জর্ডান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রিন্স আলী বিন আল-হুসেইন। তার দাবি, ইনফান্তিনোকে সমর্থন করার বিনিময়ে জর্ডানের সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিল ফিফা। কাতারে অনুষ্ঠিত আরব কাপের ফাইনালে ওঠার পুরস্কারের অর্থও না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন হুসেইন। তার এই বিপদের দিনে অবশ্য পাশে দাঁড়িয়েছে আফ্রিকা ও আরবের কিছু দেশ। বিশেষ করে তার পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজন করা কাতার। বিতর্কিত 'ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ইনফান্তিনোর সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছে কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। জাতীয় অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে সাধুবাদ জানায় তারা। পাশাপাশি প্রতিটি ফিফা সদস্য দেশের এককালীন ২ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার কিছু ইতিবাচক দিক ছিল বলেও জানিয়েছে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করা দেশটি।
এ ছাড়াও ইনফান্তিনোর পাশে দাঁড়িয়েছে কুয়েত, শ্রীলঙ্কা, লেবানন, মিসর, লেবানন। ডেইলি মেইল জানিয়েছে, কাতারসহ এই দেশগুলোর প্রকাশ্য সমর্থন তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বাড়তি শক্তি জুগিয়েছে।
বর্তমানে উয়েফা ও কনকাকাফের অধীনে ফিফার ২১১ সদস্যের মধ্যে ৯৬টি সদস্য ফেডারেশন রয়েছে। অনাস্থা ভোটের প্রক্রিয়া শুরুর জন্য এই সংখ্যা যথেষ্ট হলেও ইনফান্তিনোকে অপসারণের জন্য তা পর্যাপ্ত নয়। কারণ আফ্রিকার অধিকাংশ সদস্য ফেডারেশনের সমর্থন এখনো তার পক্ষেই রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোরও তাকে সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য যেকোনো ভোটে এশিয়ার সদস্য দেশগুলোর অবস্থানই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এত সব বিতর্ক, অভিযোগের মধ্যেই ক্ষমা চেয়েছেন ইনফান্তিনো। আর এতেই আপাতত বেঁচে গেছে তার সভাপতির পদ। মরক্কোয় অনুষ্ঠিত সভায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সমর্থন পেয়ে আপাতভাবে ফিফা সভাপতি পদেও টিকে গেছেন তিনি।
তীব্র সমালোচনার মুখে মরক্কোর রাবাতে ফিফার আফ্রিকা কার্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্যদের জরুরি বৈঠক ডেকেছিলেন ইনফান্তিনো। বৈঠক শেষে চার ঘণ্টা পর ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি তার প্রতি সমর্থনের বার্তা দিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে।
মনে হচ্ছে, বেঁচে গেছেন ইনফান্তিনো। আসলে কি তাই? নির্বাচন হবে ২০২৭ সালের ১৮ মার্চ। ওই দিন না হয় ভোট হবে। সেই পর্যন্ত যেতে তাকে লড়তে হবে প্রতিপক্ষের ছুড়ে দেওয়া নানা প্রসঙ্গে। ইউরোপ যেন কোমড় বেঁধে নেমেছে ইনফান্তিনো হটাও মিশনে !




