স্মৃতির বিশ্বকাপ
ভুলে যাওয়া এক সুন্দরীর গল্প

ঐশ্বর্য রাইকে গোটা দুনিয়া চেনে, কিন্তু আইরিন ফেরেরাকে ক’জন চেনেন? ভারতীয় অভিনেত্রী ঐশ্বর্য কিছুদিন আগেও কান চলচ্চিত্র উৎসবের লাল গালিচায় হেঁটেছেন। বিশ্বের তাবৎ বড় বড় ব্র্যান্ড একটা সময় তাদের মুখ হিসেবে বেছে নিয়েছিল ১৯৯৪ সালে বিশ্বসুন্দরীর খেতাবজয়ী ঐশ্বরিয়াকে। সেই একই প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার আইরিন ফেরেরা। তারপর ভেনেজুয়েলার আরো অনেক সুন্দরীর ভীড়ে হারিয়েই গেছেন। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে অংশ নেয়া ব্রাজিল ফুটবল দলের গল্পটাও ঠিক অনেকটা তারই মত।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল খেলা ব্রাজিলিয়ান দলটা নিঃসন্দেহে ১৯৮২ সালে তেলে সান্তানার কোচিংয়ে খেলতে আসা জিকো, সক্রেটিস,ফালকাওদের নিয়ে স্পেনে খেলতে আসা দলটা। কিন্তু ইতিহাস বলবে, ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল নিয়ে বিশ্বকাপে এসে পঞ্চম হয়েছিল ব্রাজিল। সুন্দর ফুটবলের নেশায় সাফল্যকে জলাঞ্জলী দেয়ার পরিণামটা ছিল মর্মস্পর্শী। ১৯৮২'র ব্যর্থতার পর থেকেই ব্রাজিল দলে সুন্দর ফুটবলের বদলে শুরু হয়ে যায় ফল নির্ভর কৌশলের চর্চা।
১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ১৬ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছিল ২৪। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের জন্য বরাদ্দ ছিল ৪টা স্পট, আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সরাসরি খেলে ৮২'র বিশ্বকাপে। ১০ দলের বাছাই পর্বে ব্রাজিল হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন, তারা জিতেছিল বাছাইপর্বের ৪ ম্যাচের সবকটিতেই। বাছাইপর্বে ব্রাজিল করেছিল ১১ গোল, হজম করেছিল মাত্র ২ গোল। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের দূর্গম দূর্গ, বলিভিয়ার লা পাজ স্টেডিয়ামেও স্বাগতিকদের ২-১ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিল, বাছাইপর্বে ৫ গোল করেছিলেন জিকো।
সুন্দর ফুটবলের চর্চা করেও কেন জিকো আর তেলে সান্তানার যুগলবন্দীতে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিততে পারল না, তার পেছনে আছে বেশ কিছু কারণ। প্রথমটা জিকো ও সান্তানার জেদ, তারা কৌশল বদল করে স্রেফ ফলের পেছনে ছুটতে চাননি। ফরম্যাটটাই এমন ছিল যে দ্বিতীয় গ্রুপ স্টেজ থেকে সেমিফাইনালে যাবার জন্য ইতালির বিপক্ষে ম্যাচটা ড্র করলেই চলত ব্রাজিলের, কারণ আর্জেন্টিনাকে তারা হারিয়েছিল ৩-১ ব্যবধানে। ইতালির কাছে হেরে বিদায় নেবার আগে ব্রাজিল সেই বিশ্বকাপে হারিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, স্কটল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডকে। সেমিফাইনালে ওঠার ম্যাচের আগে ড্রেসিং রুমে কোচ কৌশল বদল করতে চাননি, 'খেলার আগে ড্রেসিংরুমে কোচ আমাদের কখনোই রক্ষণাত্মক হতে বলেননি। মাঠে নেমে জয়ের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়াই ছিল আমাদের একমাত্র প্রতিজ্ঞা—আর এটাই ব্রাজিলের ফুটবলের আসল ঐতিহ্য', - পরে বলেছেন জিকো।
সুন্দর ফুটবলের চর্চা করা ব্রাজিল দল বেশ কিছু ভুল করে বসে সেমিফাইনালে ওঠার আগে। ইতালির বিপক্ষে ড্র করলেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত—এমন সমীকরণেও দুইবার সমতায় ফিরে রক্ষণ সামলানোর বদলে তারা আক্রমণ চালিয়ে যায়। দলে কোনো দক্ষ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিল না। গোলকিপার ভালদির পেরেসের একের পর এক ভুল এবং ডিফেন্সের দুর্বলতায় কাউন্টার অ্যাটাকে পাওলো রসি হ্যাটট্রিক করেন। ইনজুরিতে পড়া কারেকার বদলে আসা স্ট্রাইকার সার্জিনহো ছিলেন ধীরগতির ও ছন্দহীন। এমন অনেক কিছুর সঙ্গে পাওলো রসিকে খাটো করে দেখাটাও ছিল মস্ত বড় ভুল।
প্রথম রাউন্ডে টানা তিন ড্রয়ে স্রেফ গোলের ব্যবধানে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পরের পর্বে উঠেছিল ইতালি। বিপরীতে সেলেসাওরা মাঠে নেমেছিল পরিষ্কার ফেবারিট হিসেবে; হয়তো তারা কিছুটা অবহেলাই করেছিল হঠাৎ চেনা ছন্দে ফেরা ইতালিয়ানদের।
কিন্তু কোচ এনজো বিয়ারজোতের ইতালি খেলল কাউন্টার-অ্যাটাকের এক নিখুঁত ও নির্মম মাস্টারক্লাস। আর পুরো টুর্নামেন্টে আড়ালে থাকা পাওলো রসি যেন জ্বলে উঠলেন ঠিক সময়ে; ব্রাজিলের রক্ষণভাগের ক্ষমার অযোগ্য সব ভুলের সর্বোচ্চ ফায়দা তুলে নিয়ে পূর্ণ করলেন এক রূপকথার হ্যাটট্রিক।
১৯৮০ সালে ম্যাচ পাতানো কেলেংকারিতে নাম আসে রসির, সে জন্যে ঐ বছর ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে তার জায়গা হয়নি ইতালি দলে। পেরুজিয়া থেকে ফের জুভেন্তাসে আসার পর মৌসুমে ৩ ম্যাচে করেছিলেন ১ গোল। সাংবাদিকদের কলমের খোঁচাও ছিল রসির গায়ে, অনেকেই লিখেছিলেন রসি তার সেরা সময়টাকে পেছনে ফেলে এসেছেন। সবটাই বুঝি রসি জমিয়ে রেখেছিলেন ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচের জন্য। হ্যাটট্রিক করলেন, এরপর একে একে বিশ্বকাপ, সর্বোচ্চ গোলদাতার সোনার বল, ১৯৮২ সালের ব্যালন ডি'ওর এবং ওয়ার্ল্ড সকারের বিশ্বসেরা ফুটবলারের খেতাব; সব মিলিয়ে ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপেই রসি হয়ে গেলেন ইতালির মহানায়ক। আর তার আলোর ঝলকানিতে হারিয়ে গেল ব্রাজিলের জোগো বনিতো।
জিকো পরে আফসোস করে বলেছিলেন, ' আমরা সুন্দর ফুটবল খেলেছিলাম, কিন্তু ফুটবলে শেষ পর্যন্ত জেতাটাই সবকিছু। না জিতলে লোকে সুন্দরকে ভুলে যাবে।' ১৯৮২'র বিশ্বকাপের ব্যর্থতায় ব্রাজিলের ফুটবল দর্শনই বদলে গেল। এরপর থেকে ব্রাজিলিয়ানরাও খুঁজল ভারি গড়নের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের, সুন্দর আক্রমণাত্মক ফুটবল কৌশলের বদলে জমাট রক্ষণের ফল নির্ভর কৌশলেই পা বাড়াল সেলেসাওরা। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের কর্তাব্যক্তিরাও সেই পথেই হাঁটলেন। ১৯৯৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতল ঠিকই, কিন্তু জিকো সক্রেতিসদের সুন্দর ফুটবলে ভর করে নয় বরং দুঙ্গা,মাউরো সিলভাদের মত নির্দয় রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের কৃতিত্বেই।
ইতালির কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় সুন্দর ফুটবলের ব্রাজিল, তবে এই সৌন্দর্যের কারিগররা কিন্তু বিশ্বকাপের পর চলে যান ইতালিতেই! ফালকাও তো রোমাতেই ছিলেন, ফ্ল্যামেঙ্গো থেকে জিকো উড়ে যান উদিনেসে, ৪ মিলিয়ন ডলারে। প্রথম মৌসুমে উদিনেসে ১৯ গোল করেছিলেন জিকো, ১৯৮৩ সালে ওয়ার্ল্ড সকারের বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছিলেন তিনি।
সান্তানা চলে যান সৌদি আরবে, আল আহলির কোচ হয়ে। এরপর ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের জন্যও তাকে জাতীয় দলে ফিরিয়ে আনে সিবিএফ, তবে পরেরবারও পারেননি সান্তানা।কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে পেনাল্টি শুট আউটে হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিল। ১৯৮২ বিশ্বকাপের পর আর কোন দিন জাতীয় দলে খেলেননি গোলরক্ষক ভালদির পেরেস, হারের অনেকটা দায় তার কাঁধেই চাপিয়েছিল সমর্থকরা। সেন্টার ফরোয়ার্ড সের্জিনহো অল্প কিছু ম্যাচ খেলে বাদ পড়ে যান, তার জন্যও বন্ধ হয়ে যায় জাতীয় দলের দরজা।
১৯৮২'র ব্রাজিল দল নিয়ে তাই ফুটবল দার্শনিক সক্রেতিসের কথাটাই শেষপর্যন্ত সত্যি। সক্রেতিস বলেছিলেন, ' এই দলটাই ইতিহাসের সবশেষ ফুটবল দল, যারা ফুটবলের ছন্দময় সৌন্দর্যকে ভালবেসে খেলাটা খেলত। এরপর থেকে ফুটবল হয়ে গেছে স্রেফ ফল, কার্যকারিতা আর হারের ভয়ে গুটিয়ে থাকার খেলা।'






