যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে চাপে ভারত

সংগৃহীত ছবি
আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য কেনার বিষয়ে ভারতের কথিত প্রতিশ্রুতি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহল ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, এমন একতরফা চুক্তিতে কেন রাজি হলো ভারত এবং এর বিনিময়ে দেশটির প্রকৃত লাভ কী।
চলতি সপ্তাহে ভারত সফর শেষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মন্তব্য করেছেন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত।
ব্রিটিশ দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘এই মুহূর্তে ভারত কেন এমন একটি প্রতিশ্রুতি দেবে, তা বেশ রহস্যজনক।’ পত্রিকাটির ভাষ্য, পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পরও এমন চুক্তিতে অটল থাকা ভারতের জন্য হতে পারে ক্ষতির কারণ।
এই বিপুল অঙ্কের বাণিজ্য প্রতিশ্রুতির বিষয়টি প্রথম সামনে আসে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে, যখন একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি ঘোষণা করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। সে-সময় ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে ভারত কিছুটা স্বস্তি পেলেও হোয়াইট হাউস জানায়, বিনিময়ে তথ্যপ্রযুক্তি, কয়লা ও অন্যান্য মার্কিন পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে সম্মত হয়েছে ভারত।
বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছিল ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পরে তালিকায় উড়োজাহাজ ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশও যুক্ত করা হয়। সমালোচনার মুখে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল মন্তব্য করেছেন, ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির জন্য এই লক্ষ্যমাত্রা খুবই স্বাভাবিক। তার ভাষ্য, শুধু বিমান খাতের চাহিদাই আগামী পাঁচ বছরে বিশাল বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করবে।
তবে ওই মাসের শেষ দিকে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের বিস্তৃত শুল্কনীতি অবৈধ ঘোষণা করলে ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারা ব্যবহার করে সব বাণিজ্য অংশীদারের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য কেনার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। এমনকি রুবিওর বক্তব্য নিয়েও নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে কোনো আপত্তি তোলেনি। ফলে বিষয়টি এখন কার্যত একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উড়োজাহাজ বা ইঞ্জিনের মতো বড় কেনাকাটার সামর্থ্য থাকলেও ভারতের উচিত ছিল অন্য আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের জন্য বাজার খোলা রাখা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে তেলের দাম, একই সঙ্গে কমেছে ভারতীয় মুদ্রার মানও। এতে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, কোনো নির্দিষ্ট সরকারি নীতি ছাড়া ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে মার্কিন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য কিনতে উৎসাহিত করা বাস্তবে কতটা সম্ভব।
এমকে গ্লোবালের অর্থনীতিবিদ মাধবী অরোরা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘এই হিসাব ঠিক মিলছে না। এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার চেয়ে বেশি উচ্চাভিলাষী।’
বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের মোট রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ গেছে সেখানে। তবে আমদানি দ্রুত বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমে যেতে পারে। এতে ভারতের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতিও বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের মোট পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৮ হাজার ৩০৫ কোটি ডলার।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ ধর রয়টার্সকে বলেছেন, ‘প্রতিবছর ১০ হাজার কোটি ডলার আমদানি করতে হলে এটি ভারতের বাণিজ্যের ভারসাম্যকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেবে।’ তার মতে, বর্তমান শর্তগুলো মূলত ভারতের জন্য শুধু মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখছে, নতুন রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করছে না।
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের সংবেদনশীল সময়েই অনুষ্ঠিত হয় রুবিওর এই সফর। ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক চীন ও পাকিস্তান নীতিকে ঘিরে ভারতীয় মহলে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও ভারত-পাকিস্তান শান্তিচুক্তি নিয়ে নিজের কৃতিত্ব দাবির ঘটনায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কেও তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন বলছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর থেকেই ভারতের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়।
তবে নয়াদিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে রুবিও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের গতি কমেনি এবং সম্পর্ক আগের মতোই শক্তিশালী রয়েছে। শুল্ক ইস্যু নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি ভারতকে বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, ‘বড় ধরনের এক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে এবং এর সমাধান করা দরকার। তবে ভারতকে লক্ষ্য করে করা হয়নি এটি।’
রুবিওর পাশে দাঁড়িয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুভ্রমন্যু জয়শঙ্কর মন্তব্য করেছেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থানে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে তিনি তুলে ধরেন, ভারতেরও নিজস্ব অগ্রাধিকার আছে এবং তা হলো ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’।






