‘তারা পিটিয়ে শুধু মানুষ মারেনি, একটি পরিবার ধ্বংস করেছে’

মারধর থেকে বাঁচতে হাতজোড় করেন প্রদীপ লাল (বাঁয়ে), সঙ্গে ছিলেন রুপলাল (ডানে)। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
‘আমরা চোর নই। জুতা সেলাই করে জীবন চালাই। আমাদের মারবেন না।’ উত্তেজিত লোকজনের মারধর থেকে বাঁচতে হাতজোড় করে এভাবে আকুতি জানিয়েছিলেন রুপলাল দাস ও প্রদীপ লাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কিল-ঘুষি-লাথি ও রডের আঘাতে লুটিয়ে পড়েন তারা। পুলিশ পৌঁছালেও হয়নি রক্ষা। প্রাণ ফিরে পাননি তারা।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার এই ঘটনা গত বছরের ৯ আগস্টের। এর ভিডিও সেসময় ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। চোর সন্দেহে দলিত সম্প্রদায়ের এই দুজনকে পিটিয়ে হত্যা দেশ জুড়ে তোলে আলোড়ন।
উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের ঘনিরামপুর গ্রামের রুপলাল (৪০) ছিলেন মুচি। তার জামাতা মিঠাপুকুর উপজেলার বালুয়াভাটা গ্রামের প্রদীপ (৩৫) চালাতেন ভ্যান। ঘটনার দিন সয়ার ইউনিয়নের বটতলা থেকে বুড়িরহাট বাজারে দফায় দফায় মারধরে প্রাণ হারান তারা।
ঘটনার ভয়াবহতা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন তাদের স্বজনরা। নানাজনের সহায়তায় আর্থিক সংকট সাময়িকভাবে ঘুঁচলেও দীর্ঘমেয়াদি শূন্যতা আর অনিশ্চয়তায় পড়ে আছে পরিবারটি।
রুপলালের বাড়িতে গিয়ে কথা হলো তার স্ত্রী মালতী রানী দাসের সঙ্গে। ভেজা চোখে শোক আর ক্ষোভ মিলেমিশে একাকার।
‘যারা আমার স্বামীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তারা শুধু একজন মানুষকে হত্যা করেনি, একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এখন সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছি। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই’- বলছিলেন তিনি।
রুপলালের মা লাচিয়া দাসের ছিল একটাই ছেলে। ‘রুপলালই ছিল আমার একমাত্র ছেলে। তাকে হারিয়ে আমার বুক খালি হয়ে গেছে। আমার নাতি-নাতনিদের এতিম করে দিয়েছে ওরা। এখন আমাদের দেখার কেউ নেই’- লাচিয়ার কণ্ঠে স্পষ্ট হাহাকার।
রুপলালের পরিবার ও মামলার সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৯ আগস্ট মিঠাপুকুর উপজেলা থেকে ভাগনির স্বামী প্রদীপ লাল ভ্যান নিয়ে আসছিলেন রুপলাল দাসের বাড়িতে। পরদিন মিঠাপুকুরের এক তরুণের সঙ্গে রুপলালের বড় মেয়ে নূপুর রানীর বিয়ের দিন ঠিক করার কথা ছিল। সেজন্যই আসছিলেন প্রদীপ।
কিন্তু গ্রামের ভেতর দিয়ে রাস্তা না চেনায় সয়ার ইউনিয়নের কাজীরহাট এলাকায় এসে রুপলালকে ফোন করেন প্রদীপ। তাকে আনতে এগিয়ে সেখানে যান রুপলাল। দুজনে ভ্যানে চড়ে রুপলালের বাড়ি ঘনিরামপুর গ্রামের দিকে রওনা হন।
রাত ৯টার দিকে তারাগঞ্জ-কাজীরহাট সড়কের বটতলা এলাকায় পৌঁছালে ভ্যানচোর সন্দেহে তাদের পথে আটকে রাখা হয়। মামলার তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ওই এলাকায় ভ্যান চুরির একটি ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এরমধ্যে প্রদীপের ভ্যানে থাকা একটি বস্তায় কিছু প্লাস্টিকের বোতল খুঁজে পান তারা।
বোতলের ভেতরের তরল নিয়ে নানা সন্দেহের কথা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে রুপলাল ও প্রদীপকে মারধর শুরু করা হয়। বটতলা থেকে তাদের মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হয় বুড়িরহাট বাজারের দিকে। সেখানে বাড়তে থাকে মবের আকার।
পুলিশ প্রথমে সেখানে পৌঁছে মব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। পরে আসে আরও পুলিশ ও সেনাবাহিনীর তিনটি গাড়ি। দুজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক রুপলালকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রদীপ পরদিন মারা যান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
এ ঘটনায় রুপলালের স্ত্রী পরে হত্যা মামলা করেন। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে একজন এসআইসহ ছয় পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেন তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) আবু সাইম।
পুলিশের ভাষ্য, মামলায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তারাগঞ্জ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল্লাহ আল মামুদ বললেন, ‘গ্রেপ্তার আসামিরা সবাই জামিনে আছেন।’
এক বছরেও মামলার বিচারকাজ না এগোনোয় হতাশ পরিবার। সব আসামি আইনের আওতায় আসবে কিনা- সে প্রশ্ন স্বজনদের।





