ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনে আপত্তি কেন, নেপথ্যে কি?
- ‘অনুমতিপ্রাপ্ত সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ বেআইনী’
- সরকারের নিরবতা নিয়ে প্রশ্ন
- প্রতিবাদ চলচ্চিত্র সংগঠনের

সংগৃহীত ছবি
কেবল বাংলাদেশ নয়, বিদেশের প্রেক্ষাগৃহেও প্রশংসা কুড়িয়েও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসে বাধার মুখে পড়েছে তানিম নূর পরিচালিত সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারের সার্টিফিকেশন বোর্ড থেকে অনুমতি নেওয়া একটি সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ করার দাবি জানানোর পরও সরকারের নিরবতা নিয়ে।
আগামীকাল শনিবার (৩০ মে) বিকেল ৩টায় জেলা শহরের অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সিনেমাটি প্রদর্শনীর সব রকম প্রস্তুতি থাকার পরও কওমি শিক্ষার্থীদের একটি অংশের আপত্তির কারণে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি এই চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। অন্যদিকে কওমি শিক্ষার্থীরা সিনেমাটি প্রদর্শন না করার বিষয়ে ফেসবুকে নানা পোস্ট করছেন।
জেলা প্রশাসন এবং অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগামীর সময়কে বলেছে, আয়োজকেরা সিনেমা প্রদর্শনের ব্যাপারে কোনো অনুমতি নেয়নি। অন্যদিকে আয়োজকদের ভাষ্য, তারা স্কুলটির দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে এবং তারা সিনেমাটি প্রদর্শন করতে চায়।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নির্মাতা তানিম নূর আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সরকারের সার্টিফিকেশন বোর্ড থেকে অনুমতি পাওয়া একটি সিনেমা যারা বন্ধ করতে চান, তারা তো সরকারকেই চ্যালেঞ্জ করছেন। সরকারের আইনকে তোয়াক্কা করছেন না। এ ব্যাপারে সরকারের নিরব ভূমিকা দেখতে চাই না। আমার সিনেমাটি সরকার থেকে সর্বসাধারণের দেখার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দেশে-বিদেশে প্রদর্শন হয়েছে। সেই সিনেমা কারা বন্ধ করতে চায়? তারা এটা করতে পারে না।’
শনিবার যেন ঠিকভাবে সিনেমাটির প্রদর্শনী হয়, সে জন্য প্রশাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, যারা সিনেমাটি প্রদর্শনী না করতে প্রচার চালাচ্ছে, তাদেরও শুভবুদ্ধির উদয় হবে।
ভেন্যু বাতিল হলেও প্রদর্শনী বাতিল হয়নি
প্রদর্শনীটি আয়োজনের অন্যতম সংগঠক ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির তওজা খন্দকার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘পরিচালক তানিম নূরের সঙ্গে আলোচনা করে বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমাটি প্রদর্শনের অনুমতি নেওয়া হয়। পরবর্তীতে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির সদস্যরা দেখা করে বিদ্যালয়ে সিনেমাটি প্রদর্শনের অনুমতি নেন। কিন্তু হঠাৎ করে সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধের জন্য কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের সদস্যরা ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট শুরু করেন। এর ফলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিনেমা প্রদর্শনের অনুমতি বাতিল করেছে। ভেন্যু বাতিল হওয়ার কারণে এখন সিনেমাটির প্রদর্শনী ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে আমরা সিনেমাটির প্রদর্শনী করতে চাই।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উপদেষ্টা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাইমিনুল আজবীন জানিয়েছেন, ‘আমরা যেভাবেই হোক প্রদর্শনীটি করতে চাই। আলোচনা করে একটা সমাধানের পথ বের করা হবে।’
প্রদর্শনী কারা বন্ধ করতে চায়?
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের নেতা হাফেজ নাসুরুল্লাহ মুয়াজ নিজের ফেসবুকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমা প্রদর্শনীর ফটোকার্ডে লাল ক্রসচিহ্ন দিয়ে একটি পোস্টে লিখেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর। এই শহরে আল্লামা ফখরে বাঙ্গাল (রহ.) একসময় সিনেমা বন্ধ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, কিছু কুচক্রী মহল আবারও শহরে সিনেমা চালু করার উপক্রমে লিপ্ত। সাধারণ ছাত্রসমাজ ও সচেতন জনগণের পক্ষ থেকে জোর দাবি জানাচ্ছি, এ ধরনের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আমরা প্রশাসনের সুদৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করছি, যাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া হেফাজতে ইসলামের সহসাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ জাকারিয়া আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনীতে আমাদের বাধা আছে। আমরা চাই না তা প্রদর্শন হোক।
অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোসাম্মৎ সাবিনা ইয়াছমিন জানিয়েছেন, সিনেমা প্রদর্শনের অনুমতির জন্য বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা আমার কাছে এসেছিল। কিন্তু আমি অনুমতি দিইনি। যেহেতু ঈদের পর বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলন হয়। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিনেমা প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু সাঈদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এই সিনেমা প্রদর্শনের বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। তবে ফেসবুকে নানা রকম আলোচনার কারণে অনানুষ্ঠানিকভাবে জেনেছি।’
সরকারের সার্টিফিকেশন বোর্ডের অনুমতি পাওয়া একটি সিনেমা প্রদর্শন করতে চাইলে, আলাদা অনুমতি হবে কিনা জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বললেন, ‘বিষয়টি তো এখন স্পর্শকাতর। তাই আপাতত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী বন্ধ থাকবে। আয়োজকেরা আমাদের কাছে অনুমতি চাইলে, তখন অনুমতি দেওয়া হবে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে।’
প্রতিবাদ
এদিকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী নির্বিঘ্নে করার দাবি জানিয়ে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী নিষিদ্ধের দাবির তীব্র নিন্দা এবং উগ্রগোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত সাংস্কৃতিক সেন্সরশিপের বিপজ্জনক নজির প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপের সতর্কতা জানিয়ে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড কর্তৃক সনদপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর উন্মুক্ত প্রদর্শনী বন্ধ করার জন্য উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সংঘবদ্ধ অপতৎপরতার তীব্র ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানাচ্ছে ‘চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি চলচ্চিত্র সংসদের পূর্বনির্ধারিত প্রদর্শনীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উস্কানিমূলক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটি আইনসম্মত ও সনদপ্রাপ্ত শিল্পকর্মের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে সেখানে সুকৌশলে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক আবেগকে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই চলচ্চিত্রের সমালোচনা নয়। বরং এটি ভীতিপ্রদর্শন, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা এবং কৃত্রিম ক্ষোভ সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের জনজীবনে একটি সমান্তরাল ও উগ্রগোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত সাংস্কৃতিক আচরণবিধি চাপিয়ে দেওয়ার এক নগ্ন অপচেষ্টা।
চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ দীর্ঘদিন ধরে এই মত পোষণ করে আসছে যে, একটি সুস্থ জাতীয় চলচ্চিত্র ব্যবস্থা এবং একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের প্রক্রিয়া পার হওয়া একটি চলচ্চিত্র এমন একটি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই ও অনুমোদিত হয়, যা মূলত জনসাধারণের জন্য কী প্রদর্শনযোগ্য তা নির্ধারণ করার জন্যই প্রতিষ্ঠিত। কোনো গোষ্ঠী যখন আইনি বা সংসদীয় বিতর্কের পথে না হেঁটে সামাজিক চাপ, ধর্মীয় বয়ান এবং বিশৃঙ্খলার হুমকির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন তারা কেবল একটি চলচ্চিত্রের ওপরই আক্রমণ করে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক জীবন পরিচালনায় রাষ্ট্রের আইনি কর্তৃপক্ষের বৈধতাকেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ তার এই অবস্থানে অনড় যে—যেকোনো চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা, তাত্ত্বিক বিতর্ক বা তীব্র জন-অসন্তোষ কেবল গ্রহণযোগ্যই নয়, বরং তা একটি সচেতন নাগরিক সমাজের স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর প্রতিক্রিয়া। কিন্তু দমনমূলক দাবি, নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা এবং উগ্রগোষ্ঠী কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া নীরবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি স্কুল মিলনায়তনে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মতো একটি সাধারণ বিষয়কে নৈতিকভাবে হুমকিস্বরূপ হিসেবে উপস্থাপন করা এবং একটি চলচ্চিত্র সংসদের সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করা— এই অপপ্রচারের গভীরে থাকা একটি সুপ্ত আদর্শিক চক্রান্তকেই উন্মোচিত করে। এর উদ্দেশ্য কোনো সম্প্রদায়কে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা নয়; বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো— কোন গল্পগুলো বলা যাবে, কোন শিল্প দেখা যাবে এবং জনপরিসরে কোন কণ্ঠস্বরগুলো টিকে থাকবে, তা নির্ধারণের অঘোষিত অধিকার নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী এবং দর্শকরা ইতিমধ্যে কয়েক দশকের প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা, অপ্রতুল অবকাঠামো এবং নীতিমালার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছেন। এর ওপর নতুন করে তাদেরকে সংঘবদ্ধ ধর্মান্ধতার ‘ভেটো’ ক্ষমতার অধীন করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে— তারা যেন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে এবং আইনবহির্ভূত কোনো চাপে কোনো সনদপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তা সক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করে। এ ধরনের অপতৎপরতার মুখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা কোনো নিরপেক্ষতা নয়, বরং তা এক প্রকারের নীরব সম্মতি বা যোগসাজশ।
দেশের সমগ্র চলচ্চিত্র সম্প্রদায়, সাংস্কৃতিক সংগঠন, সুশীল সমাজ এবং সর্বস্তরের জনগণকে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলচ্চিত্র সংসদ’-এর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।






