স্ত্রী কাঁধে, সন্তান হাতে— উৎসবের রঙ মিশে গেল কান্নায়

সংগৃহীত ছবি
ডান কাঁধে স্ত্রীকে তুলে নিয়েছিলেন তরুণটি। বুকের ভেতর তখনও হয়তো একটিই আশা, কোনোভাবে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলেই হয়তো প্রিয় মানুষটাকে বাঁচানো যাবে। কিন্তু আরেক হাতে ১৮ মাসের শিশু সন্তানকে তুলতে পারছিলেন না তিনি। স্টেশনের লোকজন তখন শিশুটিকে তুলে দেন তার হাতে। পাশে হাঁটছিল ছোট্ট আরেক কন্যাশিশু। আর হাতে ছিল মার্কেট থেকে কিনে আনা ঈদের নতুন পোশাকের একটি ব্যাগ।
কী নির্মম দৃশ্য! যে পোশাকগুলো হয়তো আনন্দের ঈদের জন্য কেনা হয়েছিল, সেগুলোই সেদিন হয়ে উঠল এক অসহায় পরিবারের নীরব সাক্ষী। উৎসবের রঙ মিশে গেল কান্না, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছেন অনেকে। কেউ লিখেছেন, একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় অসহায়ত্ব আর কী হতে পারে। কেউ বলেছেন, এই দৃশ্য কোনো সিনেমার গল্প নয়, আমাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এক কঠিন বাস্তবতা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিডিওর সেই ভাগ্যাহত তরুণের নাম সুজন মিয়া। পেশায় দিনমজুর সুজন কখনো ইজিবাইক চালিয়ে, আবার কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ করে টেনেটুনে সংসার চালাতেন। গত ২৭ মে, ঈদের আগের দিন একটু আনন্দের খোঁজে স্ত্রী সাথী বেগম ও দুই সন্তানকে নিয়ে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন নরসিংদী শহরে। শেষ করেছিলেন কেনাকাটাও, কিন্তু নতুন পোশাক নিয়ে আর হাসিমুখে বাড়ি ফেরা হলো না তাদের।
শহর থেকে বাড়ি ফেরার পথে রেলস্টেশন পার হওয়ার মুহূর্তে ঘটে সেই অসাবধানতা। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন স্ত্রী সাথী বেগম ও ১৮ মাসের শিশু সন্তান সাফওয়ান ওরফে হাসেন। পরে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় মা ও ছেলের।
নরসিংদী রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) দিলীপ চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পরপরই সুজন মিয়া রক্তাক্ত স্ত্রী ও সন্তানকে উদ্ধার করে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
স্ত্রী ও কোলজুড়ে থাকা আদরের সন্তানের এমন আকস্মিক মৃত্যুর পর সুজন মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘চোখের সামনে আমার অবুঝ শিশু সন্তানসহ স্ত্রীকে হারিয়েছি। আগামীকাল ঈদে আমি কী নিয়ে থাকবো? ট্রেন আসছে দেখতে পেয়ে তাকে আটকানোর জন্য ডাক-চিৎকারসহ চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি।’
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত এই দম্পতির ৯ বছর বয়সী আরেকটি কন্যাসন্তান রয়েছে, যে অলৌকিকভাবে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছে। তবে চোখের সামনে মা আর ছোট ভাইকে হারানোর সেই ক্ষত হয়তো তাকে বইতে হবে সারাজীবন। ঈদের আগের দিন যেখানে সুজনের ঘরে আনন্দের আলো জ্বলার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই শ্মশানের নীরবতা।






