বানিয়াচংয়ের রায়হান মিয়ার 'গাছ মামা' হয়ে ওঠার গল্প

ছবি: আগামীর সময়
রাস্তাঘাটে চলতে গিয়ে কোথাও ময়লা-আবর্জনা চোখে পড়লে আর স্থির থাকতে পারেন না তিনি। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজেই কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে নেমে পড়েন পরিচ্ছন্নতা অভিযানে। শুধু তা-ই নয়, যেখানে সুযোগ পান সেখানেই পরম মমতায় রোপণ করেন গাছের চারা, লালন-পালন করেন পাখি। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো স্বভাবের এই মানুষটির নাম রায়হান মিয়া। হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা সদরের দাসপাড়া গ্রামের মৃত আবুল হাসিমের ছেলে তিনি।
অবিবাহিত, মধ্যবয়সী এই মানুষটি নিজের কোনো স্বার্থ ছাড়া বছরের পর বছর ধরে প্রকৃতি ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর এই অনন্য কর্মগুণের কারণে আজ শুধু বানিয়াচংয়েই নয়, পুরো হবিগঞ্জ জেলাজুড়েই তিনি কারও কাছে ‘গাছ মামা’, আবার কারও কাছে ‘পাখি মামা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, রায়হান মিয়া বানিয়াচং উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বর, হবিগঞ্জ পৌরসভা কার্যালয় চত্বর এবং জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের ফাঁকা জায়গায় বিনামূল্যে অসংখ্য গাছ রোপণ করেছেন। কেউ তাঁর কাছে এলে এক কাপ চা খাওয়ানোর পাশাপাশি একটি গাছ উপহার দেওয়া তাঁর চেনা স্বভাব। বিশেষ করে বজ্রপাত থেকে মানুষের জীবন রক্ষায় তিনি নিজ উদ্যোগে বিনামূল্যে তালগাছ বিতরণ করেন এবং এর উপকারিতা বর্ণনা করে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে সচেতন করে যাচ্ছেন। আর এভাবেই একসময় লোকমুখে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘গাছ মামা’। মাঝেমধ্যে পাখি লালন-পালনের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে অনেকে তাঁকে ‘পাখি মামা’ বলেও ডাকেন। প্রকৃতিপ্রেমী এই মানুষটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে নার্সারি করেছেন, যার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে হবিগঞ্জ শহরের উত্তর প্রান্তে খোয়াই নদীর তীরে গাছপালার এক সবুজ সংসার গড়ে তুলেছেন।
বানিয়াচং উপজেলার ইকরাম নন্দপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহায়ক ছাদরীল আমিন সুফি জানান, ‘গাছ মামা’ রায়হান মিয়া তাঁদের স্কুলের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে তালগাছসহ নানা জাতের প্রায় চারশত গাছের চারা বিনামূল্যে বিতরণ করেছেন। এমনকি লোকজনকে সচেতন করতে তিনি নিজ খরচে প্ল্যাকার্ড তৈরি করে প্রদর্শনী ও বক্তব্যও দিয়েছেন।
বাসদ নেতা অ্যাডভোকেট জুনায়েদ আহমেদ বললেন, 'রায়হান মিয়া দীর্ঘদিন আমাদের পাড়ায় বাস করেছেন। সেই সময় দেখেছি, লোকজন এলাকার ড্রেনে ময়লা ফেলে তা ভরাট করে ফেললে তিনি নিজেই কোদাল-ঝুড়ি নিয়ে ড্রেন পরিষ্কারে নেমে পড়তেন। রাস্তার যেখানেই ময়লা দেখতেন, নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করতেন। তিনি নার্সারি করে পাড়ার মানুষকে গাছ উপহার দিতেন, রাস্তার পাশে গাছ লাগাতেন। এসব দেখেই পাড়ার ছেলেমেয়েরা তাঁকে ‘গাছ মামা’ বলে ডাকতে শুরু করে। এই ডাক শুনলে তাঁর চোখেমুখে এক অদ্ভুত আনন্দ ফুটে উঠত।'
'একসময় পাড়া ছেড়ে রায়হান মিয়া অন্যত্র চলে গেলেও তাঁর এই জনকল্যাণকর কাজ থেমে থাকেনি।' যোগ করেন তিনি।
সিপিবি নেতা আজমান আহমেদ জানান, রায়হান মিয়া বর্তমানে খোয়াই নদীর পাড় এলাকায় থাকেন। নিভৃতচারী ও পরোপকারী এই সমাজকর্মী প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই ভালোবাসেন, যার কারণে এত বড় মানবিক কাজ করার পরও এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমের নজরে আসেননি।
কেন প্রচারের আড়ালে থেকে এমন কাজ করে যাচ্ছেন—জানতে চাইলে ‘গাছ মামা’ রায়হান মিয়া সহজ গলায় জানালেন, 'নিজে ভাইরাল হওয়ার জন্য আমি এসব করি না। তাই মিডিয়া বা কাউকে না জানিয়েই দীর্ঘদিন যাবত বৃক্ষরোপণ আর রাস্তাঘাট পরিষ্কারের কাজ করে যাচ্ছি। কোনো প্রতিদান পাওয়ার আশায় নয়, মানুষকে—বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের এই ধরনের জনহিতকর কাজে উদ্বুদ্ধ করতেই আমার এই চেষ্টা।'
আলাপে জানা যায়, রায়হান মিয়া ২০১২ সাল থেকে দেশে এভাবে বৃক্ষরোপণ করছেন। এর আগে তিনি কাতার প্রবাসী ছিলেন।
রায়হান মিয়ার এই যাপিত জীবনের পেছনের গল্পটি জানালেন তাঁর আত্মীয় ও সাবেক জাসদ ছাত্রলীগ নেতা খালেদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী মোসাদ্দেক। তার ভাষ্য, 'রায়হান মিয়া আমার মামা শ্বশুর। তিনি আমাদের অঞ্চলের সুনামধন্য শিক্ষিকা আছিয়া খাতুনের ভাই। জীবনে বিয়ে-শাদি করেননি। কাতারে থাকার সময় মোটা অঙ্কের বেতনের চাকরি করতেন এবং সেখানে অনেক বাঙালি প্রবাসীর উপকার করেছেন। দেশে আসার পর থেকেই তিনি গাছ আর মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।'
মোসাদ্দেক আরও জানান, রায়হান মিয়ার নিজের বলতে কোনো পিছুটান নেই, তাই বোনেরা ও নিকটাত্মীয়রাই তাঁর হাতখরচের টাকা-পয়সা দিয়ে থাকেন। অনেক সময় তাঁর উপকারে খুশি হয়ে কেউ প্রতিদান হিসেবে টাকা দিতে চাইলে রায়হান মিয়া তা সলজ্জে প্রত্যাখ্যান করেন। বৃক্ষরোপণে বিশেষ অবদানের জন্য একবার জেলা প্রশাসন থেকে এই ‘গাছ মামা’কে পুরস্কৃত করার একটি উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও, শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি। তবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না মিললেও, শত শত মানুষের ভালোবাসা আর প্রকৃতির মাঝেই প্রতিদিন পুরস্কৃত হন বানিয়াচংয়ের এই আসল ‘গাছ মামা’।






