আলু দিবস
ক্রেতার স্বস্তি কৃষকের দীর্ঘশ্বাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আপনি নাশতার টেবিলে বসে যে আলুভাজি খাচ্ছেন কৃষককে সে আলু উৎপাদনে লোকসান গুনতে হচ্ছে কেজিতে গড়ে ৫ টাকা। বাজারে কিনতে গিয়ে মূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের স্বস্তি থাকলেও আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। এক কেজি আলু উৎপাদনে বীজ, সার, সেচ ও শ্রম মিলিয়ে খরচ ১৫-২৫ টাকা হলেও কৃষক দাম পাচ্ছে মাত্র ৮-১২ টাকা। ন্যায্যমূল্যের অভাবে দিন দিন আলু চাষই হয়ে উঠছে দুর্বিষহ। উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনায় নীতিগত দুর্বলতার কারণে আলুকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে এক জটিল সংকট।
সূত্রমতে, দেশে বাৎসরিক চাহিদা প্রায় ১ কোটি টন। সেখানে ১ কোটি ১৫ লাখ টনের মতো উৎপাদন হচ্ছে। এতে ৩০-৪০ লাখ টন উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। যে কারণে কৃষক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছে। রংপুরের গঙ্গাচড়ার কুড়িয়ার মোড় এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, বাড়িতে সংরক্ষণ করা বস্তার আলু পচে নষ্ট হওয়ায় ফেলে দিচ্ছেন সড়কের পাশে। শুধু মিজানুরই নন, এলাকায় দুই শতাধিক কৃষকের সংরক্ষিত আলু এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে টানা বর্ষণসহ বৈরী আবহাওয়ায় পচে গেছে ঘরে রাখা আলু।
একই পরিস্থিতি তুলে ধরে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার কৃষক হানিফ মিয়া বললেন, গত মৌসুমে দুই একর জমিতে ফলিয়েছিলেন ২১ হাজার ২৩০ কেজি আলু। হিমাগার ভাড়াসহ তার মোট খরচ হয়েছিল সাড়ে তিন লাখ টাকা। কিন্তু বাজারে দরপতনের কারণে সব আলু বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ২৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি আলু তিনি বিক্রি করেছেন মাত্র ১ টাকা ২৭ পয়সায়।
এই লোকসানের ধাক্কায় ব্যাংকঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে এবার তিনি আলু আবাদ করার সাহস পাননি। তার মতো বহু কৃষক এখন দেনা শোধে জমি বিক্রি করছেন, কেউ আবার বদল করছেন পেশা।
মুন্সীগঞ্জ, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী কিংবা কুমিল্লা— দেশের প্রায় সব অঞ্চলের আলুচাষির একই চিত্র। রাজশাহীর কৃষক নুরউদ্দিন বলেছেন, ‘আলু চাষ এখন জুয়া হয়ে গেছে। লাভ হবে, না লোকসান হবে— আগে থেকে বোঝার উপায় নেই। কিন্তু খরচের টাকা ঠিকই ধার করতে হয়।’
কোল্ডস্টোরেজ সংকট ও বাড়তি ভাড়া
দেশে প্রায় ৪০০ হিমাগার থাকলেও সেগুলোর মোট ধারণক্ষমতা উৎপাদনের তুলনায় কম। উৎপাদন যখন বাড়ে, তখন অনেক কৃষক আলু সংরক্ষণের সুযোগ পান না। হিমাগার ভাড়া বেড়ে যাওয়াও বড় সমস্যা। প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণে ৩৫০ বা তার চেয়ে বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে পরিবহন ও শ্রমিক ব্যয়। ফলে আলু সংরক্ষণ অলাভজনক হয়ে পড়ছে অনেক কৃষকের জন্য। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংকট ও অব্যবস্থাপনার কারণে হিমাগারে আলু নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
বাজারে সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য
কৃষকের কাছ থেকে কম দামে আলু কিনে পাইকারি ও খুচরা বাজারে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী থাকায় কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, আবার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকেও।
অর্থনীতিতে প্রভাব
বাংলাদেশে ধানের পর সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত খাদ্যপণ্যগুলোর একটি আলু। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বহু জেলার কৃষি অর্থনীতি আলুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে আলুর দাম কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। কৃষক লোকসানে পড়লে তারা ঋণ শোধ করতে পারেন না, পরের মৌসুমে চাষ কমিয়ে দেন, এমনকি কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ঝুঁকিতে পড়ে। জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ মাহবুব আহমেদ জানান, ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষক মুখ ফিরিয়ে নেবেন উৎপাদন থেকে। এজন্য সরকারকে এখানে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। বিশেষ করে আলু প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রক্রিয়াকরণ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদন করতে পারলে এখানে আলুর চাহিদা গড়ে উঠবে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত হিমায়িত শিল্প গড়ে তুলতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতে হবে।
সরকারের পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা
সরকার মাঝেমধ্যে আলু রপ্তানির অনুমতি দিলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানি খুবই কম হওয়ায় উদ্বৃত্ত আলুর চাপ দেশীয় বাজারেই থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলু থেকে চিপস, স্টার্চ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইসহ প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা গেলে উদ্বৃত্ত আলুর ব্যবহার বাড়বে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়াতে মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
সামনে কী ঝুঁকি
চলতি মৌসুমে কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া বহু কৃষক আগামী বছর চাষ কমানোর কথা ভাবছেন। এতে ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে বাজারে দাম বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ এক বছর অতিরিক্ত উৎপাদন, পরের বছর ঘাটতি— এই অস্থির চক্রেই ঘুরছে দেশের আলুর বাজার। কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, আলু খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, কৃষক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
কমছে আলুর আবাদ
ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের আলু চাষে আগ্রহ দ্রুত কমে যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে দেশে ৪ লাখ ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছিল। এবার তা নেমে এসেছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার হেক্টরে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে কমেছে আলু চাষ। এ প্রভাব পড়েছে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায়ও। গত মৌসুমের তুলনায় চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয়েছে।






