ফিফা পরিবার
ইনফান্তিনোর পক্ষে-বিপক্ষে কারা

সংগৃহীত ছবি
বিশ্বকাপ বিক্রি করে দেওয়ার বিতর্কিত পরিকল্পনার পর ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো পড়েছেন তীব্র সমালোচনার মুখে। অনেক দেশ তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ফিফা ইনফান্তিনোর ওপর চাপ বেড়েই চলেছে। মরক্কোর রাজধানী রাবাতে বুধবার ফিফার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন তিনি। এখন প্রশ্ন প্রতিটি কনফেডারেশনের সঙ্গে ইনফান্তিনোর সম্পর্ক কেমন আর নির্বাচন কি সত্যিই হতে যাচ্ছে? প্রতিটি কনফেডারেশন ধরে বিশ্লেষণ করা হলো:
১) নির্বাচনকে প্রতিটি কনফেডারেশন কীভাবে দেখছে?
• উয়েফা (ইউরোপ): ইনফান্তিনোকে সরানোর পদক্ষেপের নেতৃত্ব শক্তভাবে দিচ্ছে উয়েফা। কড়া বিবৃতিতে উয়েফা বলেছে, বর্তমান ফিফা নেতৃত্ব কেবল উয়েফারই নয়, ফুটবল পরিবারের আরও অনেক সদস্যের আস্থা হারিয়েছে। ইংলিশ ও ওয়েলশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনসহ বেশ কিছু সদস্য ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনে দেওয়া সমর্থনের চিঠি প্রত্যাহার করেছে।
• এএফসি (এশিয়া): এশীয় কনফেডারেশনটি এখন বিভক্ত। প্রস্তাবিত বিশ্বকাপ চুক্তির বিপক্ষে এএফসি তাদের স্বাভাবিক অবস্থানের চেয়ে কড়া ভাষায় কথা বলেছে এবং ফিফার সংস্কার দাবি করেছে। অতীতে তারা ইনফান্তিনোর বড় সমর্থক থাকলেও, ইনফান্তিনো বড় বিপদে পড়লে এএফসির নেতৃত্ব অবস্থান বদলাতে পারে। তবে পশ্চিম এশিয়ার কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ইনফান্তিনোকে সমর্থন করছে এবং তারা এশিয়ায় বেশ প্রভাবশালী।
• কনকাকাফ (উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান): কনকাকাফ ইনফান্তিনো ও তার এফএফই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে। ৪১টি সদস্য দেশের পক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে এই পরিকল্পনাকে ‘ফুটবলকে অগ্রাধিকার না দেওয়া নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ’ এবং ‘দুর্বল শাসনব্যবস্থার উদাহরণ’ বলে আখ্যা দিয়েছিল তারা। কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্তাগলিয়ানি নিজেও ফিফার ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং সম্ভাব্য সভাপতি পদপ্রার্থী।
• সিএএফ (আফ্রিকা): আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিএএফ) সভাপতি প্যাট্রিস মোতসেপে জানিয়েছেন, তাদের ৫৪টি সদস্য দেশই আগামী বছর মরক্কোতে হতে যাওয়া নির্বাচনে ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনকে সর্বসম্মতভাবে সমর্থন করছে।
• কনমেবল (দক্ষিণ আমেরিকা): এফএফই প্রস্তাব বাতিল হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ আমেরিকান কনফেডারেশন কনমেবল অনেকটাই নীরব। তারা সরাসরি বিরোধিতা না করে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল বিশেষজ্ঞ মারিনা মেন্দেজ বলেন, ‘কনমেবলের বর্তমান অবস্থান প্রকাশ্য সংঘাতের চেয়ে সতর্ক সমর্থনমূলক। তারা ফিফার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে রাজনৈতিক সুবিধা ও প্রভাব ধরে রাখতে চায়। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ইনফান্তিনোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলতে চায়।’
• ওএফসি (ওশেনিয়া): ওশেনিয়া ফুটবল কনফেডারেশনের ১১টি সদস্য দেশের অবস্থান এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। নিউজিল্যান্ড দ্রুত প্রস্তাবটির বিরোধিতা করলেও ওএফসির প্রতিক্রিয়া ছিল নিরপেক্ষ। ওশেনিয়ার অন্যান্য ফেডারেশনগুলোতে ইনফান্তিনোর সমর্থন এখনো আছে।
২) ইনফান্তিনোর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?
• উয়েফা: ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ইনফান্তিনো উয়েফার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং ফিফা সভাপতি নির্বাচনে উয়েফা তাকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে দুই পক্ষের সম্পর্ক বেশ খারাপ হয়েছে। দুই বছর পর বিশ্বকাপ আয়োজন ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রস্তাব উয়েফা প্রতিহত করেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ফিফা কংগ্রেসে ইনফান্তিনো দেরিতে পৌঁছালে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা প্রতিবাদ হিসেবে সভাকক্ষ ত্যাগ করেন।
• এএফসি: ২০১৬ সালের নির্বাচনে এএফসি সভাপতি শেখ সালমানকে হারিয়ে ইনফান্তিনো সভাপতি হওয়ার পর থেকেই তাদের সম্পর্ক ভালো। ইনফান্তিনোকে একজন উন্মুক্ত নেতা হিসেবে দেখা হয়, যিনি ইউরোপের বাইরেও সমান গুরুত্ব দেন। বিশ্বকাপ সম্প্রসারণ এবং এশিয়ায় নতুন নতুন টুর্নামেন্ট আয়োজন এশীয় দেশগুলো বেশ ইতিবাচকভাবে নিয়েছে।
• কনকাকাফ: আমেরিকা, মেক্সিকো ও কানাডায় ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার সময় ইনফান্তিনোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়। এছাড়া ঐতিহাসিকভাবে তাদের মধ্যে খুব গভীর সম্পর্ক ছিল না।
• সিএএফ: ২০১৭ সালে সিএএফ সভাপতি নির্বাচনে আহমেদ আহমেদকে সমর্থন দিয়ে তার যাত্রা শুরু। তৎকালীন সভাপতি ইসা হায়াতু এতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। পরে সিএএফের প্রশাসনে ফিফার হস্তক্ষেপকে আফ্রিকার অনেকে নব্য-উপনিবেশবাদী পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিলেন। ২০২১ সালে প্যাট্রিস মোতসেপে সভাপতি হওয়ার পেছনেও ইনফান্তিনোর ভূমিকা ছিল।
• কনমেবল: আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) এবং দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে ইনফান্তিনো শুরু থেকেই একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। আর্জেন্টিনার রাজনীতি ও ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্যের দুই মেরু—মাউরিসিও মাক্রি এবং 'চিকি' তাপিয়া-দুজনের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষমতা দেখিয়েছেন তিনি।
• ওএফসি: ছোট ছোট দেশগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া এবং বিশ্বকাপে ওশেনিয়া অঞ্চলের জন্য সরাসরি একটি কোটা নির্ধারণ করায় এই অঞ্চলের সঙ্গে ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত ও আর্থিক সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ।
৩) কনফেডারেশনগুলো ইনফান্তিনো ও ফিফার ওপর কতটা আর্থিকভাবে নির্ভরশীল?
• উয়েফা (একদমই নয়): উয়েফার চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো লাভজনক টুর্নামেন্ট রয়েছে। উয়েফার বার্ষিক আয় ফিফার আয়ের প্রায় দ্বিগুণ। ফলে আর্থিক দিক থেকে ফিফার ওপর উয়েফা মোটেও নির্ভরশীল নয়।
• এএফসি (মিশ্র অবস্থা): এশিয়ার ধনী দেশগুলোর জন্য সমস্যা না হলেও ভুটানের মতো ছোট দেশের বাজেটের বড় অংশ আসে ফিফার অনুদান থেকে (১.৫ মিলিয়ন ডলার)। এমনকি অস্ট্রেলিয়াও আর্থিক লোকসানের কারণে সিদ্ধান্ত নিতে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।
• কনকাকাফ (ছোট দেশের নির্ভরতা বেশি): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মতো বড় দেশগুলো আর্থিক দিক থেকে স্বাবলম্বী হলেও কনকাকাফের বাকি ছোট দেশ ফিফার ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামের অনুদানের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
• সিএএফ (খুবই বেশি): সিএএফ নিজস্ব অর্থায়নে চললেও তাদের ৫৪টি সদস্য দেশের প্রায় সবাই পরিচালনা ব্যয়ের জন্য ফিফার বার্ষিক অনুদানের প্রয়োজন হয়।
• কনমেবল (কম নির্ভরতা): কনমেবলের ১০টি দেশ ও ক্লাব ফুটবলের বাণিজ্যিক মূল্য অনেক বেশি। শীর্ষ খেলোয়াড়দের ইউরোপীয় লিগে বিক্রি করে এবং স্থানীয় টুর্নামেন্ট থেকে আসা আয়েই তারা স্বাবলম্বী।
• ওএফসি (খুবই বেশি): ওশেনিয়ার ক্ষুদ্র দেশগুলো পরিচালনার জন্য প্রায় পুরোপুরি ফিফার অনুদানের ওপর নির্ভর করে।
৪) ফিফা থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া কি অস্তিত্বের জন্য হুমকি হতে পারে?
• উয়েফা: কোনো হুমকি নয়। ইউরোপে বিশ্বের সেরা ক্লাব ও জাতীয় দলগুলো রয়েছে। উয়েফা চাইলে এককভাবেই নিজস্ব প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে পারবে এবং অন্যান্য মহাদেশের বড় ক্লাবগুলোও এতে যোগ দিতে আগ্রহী হতে পারে।
• এএফসি: আলাদা হয়ে যাওয়াটা এশিয়ার জন্য বড় কোনো হুমকি নয়, তবে তারা চায় না ফিফা আবার পুরোপুরি ইউরোপ-কেন্দ্রিক হয়ে উঠুক।
• কনকাকাফ: আলাদা হওয়ার হুমকি এখানে বেশ প্রকট, তবে এটি মূলত নেতৃত্বের ক্ষমতার লড়াই।
• সিএএফ: আফ্রিকার সঙ্গে ফিফার সম্পর্ককে অনেক সময় ‘প্রভু ও ভৃত্য’-এর সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়। ফিফার রাজনৈতিক লাইনের বিপক্ষে গেলে এথিক্স কমিটির তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার ভয় থাকে।
• কনমেবল: দক্ষিণ আমেরিকার কাছে এটি কেবল নৈতিকতার বিষয় নয়, ক্ষমতার লড়াই। তারা বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক জায়গা ধরে রাখতে চায়।
• ওএফসি: ইনফান্তিনোর বিশ্বব্যাপী মনোভাব ও ছোট দেশকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতি ওএফসির পছন্দ। তারা এমন একটি ব্যবস্থার বিরোধী যেখানে ছোট অঞ্চলগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
৫) বর্তমান ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের গুরুত্ব কতটা?
• উয়েফা: উয়েফা ও ফিফার দূরত্ব বিশ্ব ফুটবলের স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর, তবে ইনফান্তিনোকে নিয়ে এই সম্পর্ক পুনর্গঠন করা বেশ কঠিন।
এএফসি : ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ হয়েছে কাতারে। ২০৩৪ সালের আয়োজকও সৌদি আরব। দুই পক্ষের সম্পর্কটা তাই গুরুত্বপূর্ণ।
• কনকাকাফ: বিশ্বকাপের গুরুত্বের কারণে ফিফার সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা তাদের জন্য জরুরি।
• সিএএফ: ১৯৭৪ সাল থেকে ফিফা রাজনীতিতে আফ্রিকার ভোটব্যাংক বড় ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু গত এক দশকে ফিফার অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে আফ্রিকার অনেকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
• কনমেবল: কনমেবল ও ফিফার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ঐতিহাসিক সাফল্য এবং বিশ্ব ফুটবলে দক্ষিণ আমেরিকার প্রভাবের কারণে তাদের সঙ্গে ফিফার কৌশলগত মূল্য গুরুত্বপূর্ণ। ফিফার নির্বাচন তাই কার্যত ইউরোপীয় ফুটবল বনাম বিশ্ব ফুটবলের অন্যান্য অংশের ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে।






